পূর্ব পাকিস্তানের মতো একটি দরিদ্র এবং অবহেলিত প্রদেশে জন্মেছিলাম বলে আমার কোনও দুঃখ নেই। বাংলাদেশের মতো একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে শৈশব কৈশোর কেটেছিল বলে আমার কোনও দুঃখ নেই। নতুন টালমাটাল গণতন্ত্রে যৌবন কাটিয়েছি বলে আমার কোনও দুঃখ নেই। দুঃখ নেই কারণ পূর্ব পাকিস্তানে আমরা বাঙালিরা, হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান নাস্তিক আস্তিক সবাই মিলে পাকিস্তানী শাসকের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন করেছি। তাদের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হয়েছি। আমরা জানতাম আমাদের শত্রু কে। আমরা যুদ্ধ করেছি। বাংলাদেশে যখন স্বাধীনতার শত্রুরা সবে উঁকি দিতে শুরু করেছে, ধর্মান্ধ মৌলবাদিরা যখন সবে রাস্তায় নামতে শুরু করেছে, আমরা সরব হয়েছি, মৌলবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। স্বাধীনতার পক্ষের মানুষই ছিল তখন শক্তিশালী। বাক স্বাধীনতা ছিল, সাহিত্যিক- সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে সমৃদ্ধ। একাত্তরের পরাজিত অপশক্তির বিরুদ্ধে, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, আমরা মূলধারার প্রচারমাধ্যমে বলিষ্ঠ লেখা লিখেছি, এমনকী ইসলামের সমালোচনাও তখন অবাধে লিখতে পারতাম।
আর বছর খানিক পর বাংলাদেশে যত বছর আমি কাটিয়েছি, তার চেয়ে বেশি বছর আমার কাটানো হবে বাংলাদেশের বাইরে। এ কারণেও আমার কোনও দুঃখ নেই। কারণ যে বাংলাদেশ আমি ফেলে এসেছিলাম তিরিশ বছর আগে, সেটিতে পচন ধরেছিল। আর আজ পুরো দেশটাই পচে গলে নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধ ছিটোচ্ছে। এই নষ্ট দেশে আমাকে বাস করতে হয়নি। নষ্ট দেশে দীর্ঘকাল বাস করলে মানুষও নষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষই দেখছি পচে যাওয়া, নষ্ট হয়ে যাওয়া, গলে যাওয়া। বেশির ভাগ মানুষের মন এবং মস্তিস্ক থেকে দুর্গন্ধ বেরোয়। সুজলা সুফলা সোনার বাংলাকে স্বাধীনতার শত্রুরা খেয়ে ছিবড়ে বানিয়ে দিয়েছে। এই ছিবড়ে হওয়া বাংলাদেশের জন্য আমার দুঃখ হয়।
সংখ্যালঘু নির্যাতন বনাম রাজনৈতিক অস্ত্র
সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রশ্নটি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দায়ী করে, আর ভুক্তভোগী মানুষের নিরাপত্তা সেই দোষারোপের নিচে চাপা পড়ে যায়।
বিএনপি–জামায়াত আমল (২০০১–২০০৬) ও শেখ হাসিনার আমল (২০০৯–২০২৪) তুলনা করলে দেখা যায়—দুই আমলই ব্যর্থ।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ছিল ব্যাপক ও প্রকাশ্য। এটি কেবল সামাজিক সহিংসতা ছিল না; এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক সহিংসতা।
সবচেয়ে গুরুতর বিষয় ছিল—
প্রশাসনের নীরবতা
পুলিশের মামলা নিতে অনীহা
অপরাধীদের প্রকাশ্য দায়মুক্তি
এখানে রাষ্ট্র তার মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে অর্থাৎ আইনের সামনে সমতা আনতে ব্যর্থ হয়।
শেখ হাসিনার সরকার নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবাধিকারবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছে। তুলনামূলকভাবে এই সময়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক নিধন হয়নি—এটি সত্য। কিন্তু সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়মিত ঘটেছে। ভূমি দখল, মন্দির ভাঙচুর, নারী নির্যাতন অব্যাহত থেকেছে। এই সময়ের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি।অপরাধীরা জানতো তারা রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত হলে শাস্তির ঝুঁকি কম।
বিএনপির আমলে রাষ্ট্র অনেক সময় চুপ ছিল। শেখ হাসিনার আমলে রাষ্ট্র কথা বলেছে, ক্ষতিপূরণ দিয়েছে, পুনর্নির্মাণ করেছে। কিন্তু মানবাধিকার কেবল পুনর্নির্মাণ নয়—মানবাধিকার মানে নিরাপত্তা, বিচার ও মর্যাদা। এই তিনটির মধ্যে বিচার ও প্রতিরোধ—দুই আমলেই দুর্বল ছিল।
সংখ্যালঘু নারী নির্যাতনের প্রশ্নটি দুই আমলেই প্রায় অদৃশ্য থেকেছে। ধর্ষণ, অপহরণ, জোরপূর্বক বিয়ে—এসবকে “সাম্প্রদায়িক” বা “পারিবারিক” সমস্যা বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এটি স্পষ্টতই নারীবিরোধী রাষ্ট্রীয় আচরণ।
এই তুলনার লক্ষ্য কোনো দলকে “ভালো” বা “খারাপ” প্রমাণ করা নয়। লক্ষ্য হলো এই সত্য তথ্য তুলে ধরা যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন দল বদলালেও থামেনি, কারণ রাষ্ট্র কখনোই মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়নি।
গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্র সেটিই, যেটি ---
ধর্ম দেখে নাগরিক বিচার করে না
রাজনৈতিক পরিচয় দেখে অপরাধ মাফ করে না
সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগের কাছে সংখ্যালঘুর অধিকার বিকিয়ে দেয় না
সেই রাষ্ট্র গড়ার লড়াই মানুষ কবে থেকে শুরু করবে?
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats