ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং বিরোধী দলগুলোর ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে অবশেষে আজ শনিবার দুপুরের দিকে পদত্যাগ করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে ধর্মেন্দ্র নিজে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এক্সে দেওয়া পোস্টে ধর্মেন্দ্র লেখেন—‘প্রথম দিন থেকেই আমি এর দায় নিয়েছি এবং পরিস্থিতি থেকে কখনো মুখ ঘুরিয়ে নিইনি।’
এদিকে ভারতে চলমান আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘোষণার পরেই সিজেপি এই সিদ্ধান্ত জানালো। শনিবার (২৫ জুলাই) এনডিটিভির লাইভ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এনডিটিভি জানিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যায় নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে সরকার ও সিজেপির যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেয়া হয়।

এ সময় সিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়, অবিলম্বে কার্যকরভাবে আমাদের আন্দোলন প্রত্যাহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে যন্তর মন্তরে অবস্থানরত সমর্থকদের শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
পদত্যাগের পর শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ করে লেখা একটি চিঠি এক্সে পোস্ট করেছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। সেখানে তিনি লিখেছেন,‘যন্তর মন্তর এবং সারা দেশে সৃষ্ট পরিস্থিতিকে যেন কোনো রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি কাজে লাগাতে না পারে, জাতীয় ঐক্য যেন অটুট থাকে, কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেন আইনি জটিলতায় আটকে না যায় এবং আমাদের সন্তানেরা যেন পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার গড়ার কাজে তাদের সময় ব্যয় করতে পারে—এসব বিষয় বিবেচনা করে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।’
মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা নিট–এর প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রতিবাদে এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এক মাসের বেশি সময় ধরে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর ঘিরে শিক্ষার্থীরা তীব্র আন্দোলন করে আসছেন। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে এ আন্দোলন গড়ে উঠেছে। সারা দেশ থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনে সমর্থন জানান।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে সিজেপির প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠক করেন। সিজেপি তিনটি দাবি উত্থাপন করেছে। এগুলো হলো—শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা এবং ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্টের (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ।
গতকালের বৈঠকে আন্দোলনকারীদের দুটি প্রধান দাবিতে নীতিগতভাবে সম্মতি দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। সেগুলো হলো বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়া। তবে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকেন শিক্ষার্থীরা।
গতকাল সিজেপির নেতারা ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের জন্য ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। তবে বিজেপির কয়েকটি সূত্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি সরকার কোনোভাবেই মানবে না। আজ বিকেলে দুই পক্ষের মধ্যে তৃতীয় দফার বৈঠক হওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়। তবে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগেই পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
পদত্যাগপত্রে কী বার্তা দিয়ে গেলেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান
ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) নেতৃত্বে চলা টানা কয়েক সপ্তাহের প্রতিবাদের মুখে অবশেষে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। আজ শনিবার তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। পদত্যাগপত্রে বেশ কিছু বার্তা দিয়ে গেছেন তিনি।
ধর্মেন্দ্র প্রধান লেখেন, ‘নিট-ইউজি’ মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা নিয়ে চলমান বিতর্ক যাতে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কোনো ক্ষতি এবং ‘দেশবিরোধী শক্তি’ যেন এ উত্তপ্ত পরিস্থিতির অপব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই তিনি পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
দেশের তরুণ ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে হিন্দিতে লেখা এ চিঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে ধর্মেন্দ্র প্রধান তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানান।
ধর্মেন্দ্র প্রধান পরীক্ষা নিয়ে সাম্প্রতিক সব জটিলতার নৈতিক দায় নিজের ঘাড়ে নিয়েছেন। একই সঙ্গে এ সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর পক্ষে জোরালো সাফাই গেয়েছেন।
ধর্মেন্দ্র প্রধান লিখেছেন, ‘প্রথম দিন থেকেই আমি আমার দায়িত্ব স্বীকার করেছি এবং এ পরিস্থিতি থেকে কখনো মুখ ফিরিয়ে নিইনি।’
সদ্য সাবেক এই মন্ত্রী উল্লেখ করেন, গত ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি পরীক্ষায় অনিয়ম ও কারচুপি শনাক্ত হওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার তাৎক্ষণিকভাবে এর তদন্তের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করে। সেই সঙ্গে বিতর্কিত ওই পরীক্ষা বাতিল করে অতি দ্রুততার সঙ্গে একটি নতুন পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
ধর্মেন্দ্র প্রধান দাবি করেন, ২১ জুনের সেই পুনঃপরীক্ষা কেন্দ্র, রাজ্য সরকার ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে সরকারি সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা
পরীক্ষা সফল হওয়ার দাবি করার পাশাপাশি বিদায়ী এই শিক্ষামন্ত্রী অভিযোগ করেন, পুরো বিতর্ক চলাকালে ‘দায়িত্বশীল পদে আসীন কিছু ব্যক্তি’ সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালিয়েছেন। এটি তাঁকে ‘গভীরভাবে ব্যথিত’ করেছে।
অবশ্য চিঠিতে ধর্মেন্দ্র সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের নাম উল্লেখ করেননি। যদিও কয়েক দিন ধরে ভারতের লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে তিনি রাজনৈতিকভাবে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন।
ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, গত ১০ দিনের ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে ভীষণভাবে মর্মাহত করেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে পুরো বিষয়টি তাঁর ‘ব্যক্তিগত মর্যাদার লড়াই’ নয়; বরং শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা এবং দেশের ঐক্য বজায় রাখার তাগিদ থেকেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ধর্মেন্দ্র লিখেছেন, ‘দিল্লির যন্তর মন্তরসহ সারা দেশে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে এবং দেশবিরোধী কোনো শক্তি যেন এর সুবিধা নিতে না পারে, দেশের ঐক্য যেন অক্ষুণ্ন থাকে, একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎও যাতে আইনি জটিলতায় আটকে না যায় এবং আমাদের সন্তানেরা যেন পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার গড়ায় মনোযোগ দিতে পারে, সেসব নিশ্চিত করতেই আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।’
তরুণসমাজ যেন কোনোভাবেই ‘ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তির ফাঁদে’ পা না দেয়, সে আহ্বানও জানান পদত্যাগ করা এই মন্ত্রী।
এক দাবি পূরণ, রইল বাকি তিন: তেলাপোকার দল
ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘোষণার পর নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আন্দোলনকারীরা ‘চাক দে ইন্ডিয়া’ গান গেয়ে উল্লাস প্রকাশ করছেন বলে জানিয়েছে দ্য হিন্দু।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর যন্তর মন্তরে মানুষের উপস্থিতি আরও বাড়ছে। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের চার দফা দাবির মধ্যে একটি পূরণ হয়েছে। ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করলেও শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ এবং র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) ও দিল্লি পুলিশের ক্ষমা চাওয়াসহ বাকি দাবিগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। দলটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিজিৎ দীপকের পদত্যাগ-পরবর্তী উদযাপনের একটি ভিডিও প্রকাশ করে লিখেছে, ‘গণতন্ত্রের জয় হয়েছে।’
এর আগে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর প্রতিক্রিয়ায় সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। এটি প্রমাণ করে, আপনি যদি ভয় না পান, এই সরকারের সামনে মাথা নত না করেন, তাহলে যে কারও পদত্যাগ আদায় করা সম্ভব। গণতন্ত্রে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।’
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে আন্দোলনের ‘কেবল শুরু’ বলে মন্তব্য করেছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।
তিনি বলেন, ‘এটি প্রথম উইকেট। আমরা এখানেই থামব না। এটি কেবল শুরু।’
গত ৩৬ দিন ধরে যন্তর মন্তরে অবস্থানরত শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দীপকে বলেন, ‘আমি সব শিক্ষার্থী এবং গত ৩৬ দিন ধরে এখানে অবস্থান করা সব স্বেচ্ছাসেবককে স্যালুট জানাই।’
দ্য হিন্দু বলছে, তার এই মন্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পরও আন্দোলনকারীরা তাদের বাকি দাবিগুলো আদায়ের লক্ষ্যে কর্মসূচি চালিয়ে যেতে চান।

‘ভারতের তরুণদের বিজয়’
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) কে সি বেনুগোপাল ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে ভারতের তরুণদের বিজয় হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, ‘তরুণদের শক্তিই অযোগ্য, দুর্নীতিগ্রস্ত ও দায়ী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে। এটি জনগণের জয় এবং জবাবদিহির দাবিতে লড়াই করা সবার বিজয়।’
বেনুগোপাল বলেন, ‘নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনা সামনে আসার পর থেকেই কংগ্রেস, বিশেষ করে রাহুল গান্ধী, তার পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বিরোধীদলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে জবাবদিহির দাবিতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনকারীদের বাকি দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি এবং শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত নিপীড়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা প্রার্থনা।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats