ঢাকা থেকে কলম্বোগামী ফিটস এয়ারের ফ্লাইটের (৮ডি ০৯১২) একজন যাত্রীর তোলা ছবি। ১১
ফ্লাইট ছাড়ার কথা ছিল রাত ২টা ১৫ মিনিটে, কিন্তু কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় তা ছাড়ে সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে। এই সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা সময় ১৮২ জন যাত্রীকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল বদ্ধ উড়োজাহাজে। ১১ জুলাই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার মুখে পড়েন ঢাকা থেকে কলম্বোগামী ফিটস এয়ারের (৮ডি ০৯১২) ফ্লাইটের যাত্রীরা। দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকায় শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন এই যাত্রীরা। তাঁদের অভিযোগ, এতক্ষণ এক জায়গায় থাকায় অনেক যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই সময়ে তাঁদের খাবার বা প্রয়োজনীয় কোনো সহায়তা দেওয়া হয়নি। করা হয়েছে দুর্ব্যবহার।
ফ্লাইটটি ছাড়তে দেরি হওয়ার কথা জানালেও শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, যাত্রী ভোগান্তির কোনো অভিযোগ তারা পায়নি। এদিকে ফিটস এয়ারের একজন মুখপাত্র দেরির জন্য নিজেদের দায় অস্বীকারের পাশাপাশি যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের বিষয়টি এড়িয়ে যান।
কোনো ফ্লাইটে ত্রুটি দেখা দিলে মেরামতের জন্য যাত্রীদের নামিয়ে আনতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে দেরি বেশি হলে সাধারণত যাত্রীদের নামিয়ে আনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব ট্রান্সপোর্টেশনের নিয়ম অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে সাধারণত তিন ঘণ্টার বেশি এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে চার ঘণ্টার বেশি যাত্রীদের টারমাকে আটকে রাখা যায় না।
যাত্রীর বর্ণনায় দুঃসহ অভিজ্ঞতা
ফিটস এয়ারের ফ্লাইটটিতে শ্রীলঙ্কাগামী একজন যাত্রী ছিলেন সোনিয়া রিফাত। তিনি গো গার্লস নামের একটি নারী পর্যটক দলের সহপ্রতিষ্ঠাতা। কলম্বোয় পৌঁছানোর পর গতকাল শনিবার সোনিয়ার সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর।
সোনিয়া বলেন, চেক-ইন কাউন্টার থেকে শুরু করে বিমানে ওঠা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল চরম বিশৃঙ্খলতায় ভরা। এয়ারলাইনসের কর্মীদের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত অপেশাদার।
সোনিয়া বলেন, ‘ফ্লাইটে ওঠার পরপরই জানানো হয় কারিগরি ত্রুটি আছে। কিন্তু সমস্যা দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও যাত্রীদের বিমানের ভেতরেই জিম্মি করে রাখা হয়। আমি তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগতে শুরু করি, বারবার শারীরিক অসুস্থতার কথা জানিয়েও বিমান থেকে নামার অনুমতি দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে দরজার সামনে গিয়ে একটু শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতে হয়।’
সকাল সাড়ে সাতটার আগে কোনো খাবার সরবরাহ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন সোনিয়া। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় খাবারহীন অবস্থায় শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা চরম সংকটে পড়েছিলেন।
‘যাঁরা যাত্রা বাতিলের কথা ভেবেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। আমার এক টিম মেম্বার অফলোড নিতে চাইলে তাঁর সঙ্গে প্রচণ্ড দুর্ব্যবহার করা হয় এবং অন্য এক সদস্যের মুখের ওপর জোর করে ব্যাগ ছুড়ে মারা হয়।’
শ্রীলঙ্কায় পৌঁছানোর পর সোনিয়াকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। অসুস্থতার প্রমাণ হিসেবে শ্রীলঙ্কার একটি হাসপাতালের ব্যবস্থাপত্রও প্রথম আলোকে দেখান তিনি।
এই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর তাঁদের সংগঠন গো-গার্লস ভবিষ্যতে ফিটস এয়ারের সঙ্গে কোনো ট্যুর পরিচালনা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মেহরীন রহমান নামের আরেক যাত্রীর এটা ছিল তাঁর জীবনের প্রথম ‘সোলো ট্রিপ’। বিমান কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে তা ‘বিভীষিকায়’ রূপ নিয়েছিল বলে কলম্বো না গিয়েই বিমান থেকে নেমে যান।
মেহরীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্লেনে কোনো খাবার বা রিফ্রেশমেন্টের ব্যবস্থা ছিল না। এত দীর্ঘ সময় বসে থাকাটা অনেকের জন্যই অসহ্য হয়ে পড়েছিল। অনেক ডায়াবেটিক পেশেন্ট প্লেনে ছিলেন, যাঁদের নির্দিষ্ট সময় অন্তর খাবার প্রয়োজন হয়। ফিটস এয়ারে কোনো ধরনের মানবিক সহায়তা না থাকায় এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা এয়ারক্রাফটের ভেতরে বসিয়ে রাখায় তাঁরাও ভুক্তভোগী হয়েছেন।’
দায় অস্বীকার ফিটস এয়ারের মুখপাত্রের
কলম্বোভিত্তিক বাজেট (সাশ্রয়ী) এয়ারলাইনস ফিটস এয়ার নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হটলাইনে ফোন করা হলে ‘মাহদী’ নামের একজন ফিটস এয়ার ও এভিয়েশন সিকিউরিটির দুটি নম্বরে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
সেই নম্বর ধরে ফোন করা হলে এভিয়েশন সিকিউরিটির ডিউটি অফিসার ‘সজীব’ নামে একজন বলেন, এ বিষয়টি তাঁদের জানা নেই। তিনি বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
এদিকে হটলাইন থেকে দেওয়া ফিটস এয়ারের নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের পরও কেউ ফোন ধরেননি। পরে হটলাইনে আবারও যোগাযোগ করে এয়ারলাইনসটির সঙ্গে যোগাযোগের দ্বিতীয় কোনো নম্বর আছে কি না জানতে চাইলে মাহদী নামের ওই কর্মকর্তাই ফোন ধরেন এবং আরেকটি নম্বর দেন।
নতুন নম্বরটিতে একাধিকবার কল করার পর একজন ফোন ধরেন। তিনি নিজেকে ফিটস এয়ারের মুখপাত্র পরিচয় দেন এবং তাঁর নাম ‘রানা’ বলে জানান। তবে তিনি পুরো নাম বলেননি বা তাঁর পদবিও উল্লেখ করেননি।
রানা নামের ওই ব্যক্তি বলেন, তাঁদের ফ্লাইটটি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ‘মাত্র ৪৫ মিনিট’ বিলম্বিত ছিল। কিন্তু ওই সময় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রানওয়ে সংস্কারের কাজ চলায় কোনো ফ্লাইট ওঠানামা করতে পারছিল না। পরে রানওয়ে খুললেও বৈরী আবহাওয়া ও এভিয়েশন ওয়ার্নিংয়ের কারণে ফ্লাইটটি উড্ডয়ন করা সম্ভব হয়নি।
রানা আরও বলেন, রানওয়েতে লাইটিংয়ের কাজ চলায় এবং ভারী বৃষ্টির কারণে ওই সময় বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থবির ছিল। যাত্রীদের নিরাপত্তা ও রানওয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে ফ্লাইট ছাড়তে দেরি হয়েছে, তবে তা কোনোভাবেই পাঁচ–ছয় ঘণ্টা নয়।
রানা এমন দাবি করলেও ওই ফ্লাইটের যাত্রীদের তোলা ছবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২টা ১৫ মিনিটের ফ্লাইটটি কলম্বোর উদ্দেশে সকাল ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে উড্ডয়ন করে। অর্থাৎ দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের বেশি সময় যাত্রীরা বিমানেই বসে ছিলেন।
রানা বলেন, যাত্রী অফলোড করা এবং তাঁদের মালামাল নামানোর ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের লজিস্টিক সাপোর্টের সীমাবদ্ধতা ছিল।
রানার বিস্তারিত পরিচয় জানতে পরে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি, এসএমএস পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ ই–মেইলে বিস্তারিত জানান।
রাগীব সামাদ বলেন, ফিটস এয়ারের ৮ডি ৯১১/৯১২ ফ্লাইটটি নির্ধারিত সময়ের ৪৫ মিনিট দেরিতে রাত ২টায় ঢাকায় পৌঁছায়। এটির রাত ১টা ১৫ মিনিটে অবতরণের কথা ছিল। রাত ২টা ১৫ মিনিটে ফ্লাইটটির কলম্বো রওনা হওয়ার কথা ছিল।
নির্বাহী পরিচালক জানান, উড্ডয়নের ঠিক আগমুহূর্তে প্রকৌশলীরা বিমানটি পরীক্ষা করেন। তখন একটি কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ে। তাঁরা দেখেন, বিমানের হাইড্রোলিক ফ্লুইড লেভেল কমে গেছে। ত্রুটি মেরামত না হওয়া পর্যন্ত প্রকৌশলীরা বিমানটিকে উড্ডয়নের অনুপযুক্ত ঘোষণা করেন। এই সমস্যার কারণে উড্ডয়নে বিলম্ব ঘটে।
যাত্রীরা রাত ২টা ৪৫ মিনিট থেকে সকাল ৭টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত বিমানের ভেতরেই অবস্থান করেন জানিয়ে রাগীব সামাদ বলেন, সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা যাত্রীদের বিমানের ভেতরে থাকতে হয়েছে। যাত্রীদের সুবিধার কথা ভেবে তাঁরা সকাল ৬টার দিকে হালকা নাশতার ব্যবস্থা করেছিলেন।
যাত্রীদের সঙ্গে ফিটস এয়ারের কর্মীদের অপেশাদার আচরণ বা দুর্ব্যবহার নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ আসেনি বলে জানান শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats