এক সময় ফুটবলকে বলা হতো ‘গরিব মানুষের খেলা’। একটি বল, একটি খোলা মাঠ আর কয়েকজন খেলোয়াড় থাকলেই খেলা শুরু হয়ে যেত। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই ফুটবলই বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিনোদন শিল্পগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। আজ ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, যেখানে আবেগ, বিনোদন, ব্যবসা এবং পুঁজির স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
বিশ্বকাপ, মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নশিপ কিংবা বড় ক্লাব টুর্নামেন্টগুলোকে যদি আমরা শুধু খেলাধুলার দৃষ্টিতে দেখি, তাহলে ছবির একটি অংশই দেখা হবে। এর পেছনে রয়েছে টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব, ডিজিটাল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, বহুজাতিক স্পন্সর, ক্রীড়া সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, পর্যটন শিল্প, টিকিট বিক্রি, মার্চেন্ডাইজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গেমিং, বেটিং মার্কেট এবং অসংখ্য বাণিজ্যিক চুক্তি। সব মিলিয়ে ফুটবল এখন এমন একটি শিল্প, যেখানে প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হয়।
এই বিশাল অর্থনীতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কী? স্টেডিয়াম নয়, ট্রফিও নয়। সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো মানুষের মনোযোগ।
আজকের পৃথিবীতে মনোযোগই নতুন মুদ্রা। কোটি কোটি মানুষ যদি একটি ম্যাচ একসঙ্গে দেখে, তাহলে সেই ম্যাচের বিজ্ঞাপনের মূল্য বেড়ে যায়। সম্প্রচার স্বত্বের দাম বাড়ে। স্পন্সররা আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনগেজমেন্ট বাড়ে। ফলে ফুটবলে সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে ওঠে সেই ব্যক্তি, যিনি কোটি মানুষের মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন।
সেই কারণেই কিছু ফুটবলার কেবল খেলোয়াড় নন; তারা একেকটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড। তাদের নাম শুনেই টিকিট বিক্রি হয়, জার্সি বিক্রি হয়, স্টেডিয়াম পূর্ণ হয়, টেলিভিশনের দর্শকসংখ্যা বাড়ে এবং স্পন্সরদের বিনিয়োগের যৌক্তিকতা আরও শক্তিশালী হয়। একজন সুপারস্টারের উপস্থিতি কখনো কখনো একটি পুরো টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক মূল্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা এই বাস্তবতাকে অনেক সময় ‘স্টার ইকোনমি’ বলে ব্যাখ্যা করেন। অর্থাৎ এমন একটি বাজার, যেখানে একজন ব্যক্তির জনপ্রিয়তা পুরো শিল্পের আয় বাড়িয়ে দেয়। ফুটবলে এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট, কারণ এখানে আবেগ এবং ব্যবসা একসঙ্গে কাজ করে।
এখান থেকেই ‘ফুটবল ক্যাপিটালিজম’ ধারণার জন্ম। এই ধারণা বলে, আধুনিক ফুটবলের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের পেছনে কেবল খেলাধুলার যুক্তি নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করে। কোন শহরে টুর্নামেন্ট হবে, কোন সময়ে ম্যাচ হবে, কোন ব্র্যান্ড স্পন্সর হবে, কোন সম্প্রচার সংস্থা স্বত্ব পাবে, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোন বিষয়টি বেশি প্রচার পাবে—এসবের পেছনেও অর্থনৈতিক হিসাব থাকে।
অবশ্য এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। বড় তারকাদের উপস্থিতি বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান হওয়া আর কোনো নির্দিষ্ট ম্যাচে তাদের সুবিধা দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া—এই দুটি বিষয় এক নয়। প্রথমটি একটি স্বীকৃত অর্থনৈতিক বাস্তবতা; দ্বিতীয়টি প্রমাণের বিষয়। তাই কোনো নির্দিষ্ট ম্যাচের রেফারিং বা সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিযোগ তুলতে হলে তার পক্ষে শক্ত প্রমাণ থাকা জরুরি।
তবুও কেন বিতর্কের পর মানুষ ‘ফুটবল ক্যাপিটালিজম’ নিয়ে কথা বলে? কারণ মানুষ বুঝতে শিখেছে যে আধুনিক খেলাধুলা আর সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো জগৎ নয়। করপোরেট বিনিয়োগ, ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং বৈশ্বিক বাজার এখন ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে যখনই বড় কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হয়, অনেক সমর্থকের মনে প্রশ্ন জাগে—এটি কি শুধুই মানবিক ভুল, নাকি এর সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থও কোনোভাবে জড়িত?
এই প্রশ্নের উত্তর সব সময় সহজ নয়। তবে ইতিহাস বলে, ক্রীড়া জগতেও অর্থনৈতিক স্বার্থ বহু সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। সম্প্রচারের সুবিধার জন্য ম্যাচের সময় পরিবর্তন, নতুন টুর্নামেন্টের সূচনা, ক্লাব বিশ্বকাপের সম্প্রসারণ, প্রাক-মৌসুম সফরের গন্তব্য নির্বাচন কিংবা খেলোয়াড়দের বিপণন কৌশল—এসব ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক বিবেচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাই ফুটবলকে বুঝতে হলে শুধু মাঠের খেলা নয়, মাঠের বাইরের ব্যবসায়িক কাঠামোটিও বুঝতে হয়।
আধুনিক ফুটবলে একটি গোল যেমন স্কোরবোর্ড বদলে দেয়, তেমনি একটি সুপারস্টারের উপস্থিতি বদলে দিতে পারে সম্প্রচারের রেটিং, বিজ্ঞাপনের আয় এবং স্পন্সরদের বিনিয়োগের হিসাব। এখানেই ফুটবল ক্যাপিটালিজমের মূল দর্শন—খেলাটি আবেগ দিয়ে বেঁচে থাকে, কিন্তু সেই আবেগকে ঘিরেই গড়ে ওঠে বিশাল অর্থনীতি।
তাই আজ ফুটবল বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু ট্যাকটিকস, অফসাইড বা পেনাল্টির নিয়ম জানাই যথেষ্ট নয়। বুঝতে হয় ব্র্যান্ড ভ্যালু, মিডিয়া ইকোনমি, করপোরেট বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক পুঁজির গতিপ্রকৃতিও। কারণ আধুনিক ফুটবলে খেলা হয় দুটি মাঠে—একটি ঘাসের ওপর, আরেকটি অর্থনীতির বিশাল অঙ্গনে। প্রথম মাঠে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে খেলোয়াড়রা; দ্বিতীয় মাঠে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা চলে দর্শকের মনোযোগ, বাজারের অংশীদারত্ব এবং বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক মূল্য ধরে রাখার।
মো. আব্বাস, বর্তমানে কাজ করছেন করপোরেট কমিউনিকেশন্সে।
ইমেইল: [email protected]
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats