লিভারপুলের জিমে ঢুকেই নাকি একটা প্রশ্ন করতেন তিনি, ‘মো, তুমি ঘুমাও কখন?’ প্রশ্নকর্তা আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার। জিজ্ঞেস করতেন বন্ধুকে, ভোরবেলা জিমে ঢুকে যাঁকে প্রতিদিনই আগে থেকে ঘামতে দেখতেন। উত্তরটা ছিল প্রায় তপস্বীর মতো—সাড়ে ছয় ঘণ্টার বেশি ঘুমালে নাকি ক্লান্ত লাগে তাঁর। সেই মানুষটার নাম মোহাম্মদ সালাহ।
আজ রাতে আটলান্টায় সেই দুই বন্ধু প্রতিপক্ষ। লিভারপুলের সেই জিম থেকে মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের সবুজ মাঠ, দূরত্বটা কেবল মানচিত্রে নয়, আবেগেও। বন্ধুর মুখোমুখি হওয়ার আগে ম্যাক আলিস্টারও তাই বন্ধুত্বের সুরে প্রতিপক্ষের ভাষায় বলেছেন, ‘এই ম্যাচের পর হয়তো ওর সঙ্গে আর দেখাই হবে না অনেক দিন। আমি ওকে মেসেজ দিয়েছি, এই ম্যাচের আগে যেন কম পরিশ্রম করে।’ দুজনের আজকের পর আর দেখা হওয়ার সুযোগ কম, সালাহ লিভারপুল ছেড়ে দিয়েছেন মৌসুম শেষেই, বিশ্বকাপের আগে।
তবে এই ম্যাচটা স্রেফ দুই বন্ধুর বিচ্ছেদের আগে প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠার গল্প নয়। আর্জেন্টিনার অন্য যেকোনো ম্যাচের মতো এখানেও সবকিছুর শুরুতে একজনের নাম লিখতে হয়। লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সে যাঁর পা এখনো কবিতা লেখে, যাঁর প্রতিটি স্পর্শে বিশ্বকাপের ইতিহাস একটু একটু নড়েচড়ে বসে।
এই আসরে ৭ গোল করে ফেলেছেন, দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে সাত বা তার বেশি গোল করা প্রথম ফুটবলারও তিনিই। পরে অবশ্য মেসির সেই কীর্তিতে ভাগ বসিয়েছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পেও। এই বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এই দুজনের সঙ্গে আছেন নরওয়ের আর্লিং হলান্ডও। তাঁরও গোল হয়ে গেছে ৭টি। হিসাবটা গতকাল পর্যন্ত।
মিসরের বিপক্ষে মেসির আর একটা গোল মানেই ১৯৩০ সালের গিয়ের্মো স্তাবিলের পাশে বসে যাওয়া, এক বিশ্বকাপে আটটি গোল, আর্জেন্টিনার হয়ে যা এরপর কারও করা হয়নি। কিন্তু ইতিহাস লেখার জন্য শরীরটাকেও সায় দিতে হবে তো!
কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময় গড়ানো লড়াইয়ের পর মেসি নিজেই স্বীকার করেছেন ক্লান্তির কথা। বলেছেন তাঁর সতীর্থরাও, বলেছেন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিও। সেই ম্যাচটা একই সঙ্গে সন্দেহের বীজও বুনে দিয়েছে, চ্যাম্পিয়নদের জয়যাত্রা কাগজে–কলমে যেমন দেখাচ্ছে, আসলেই কি ততটা নিখুঁত?
মিসরও এসেছে ভুগতে ভুগতে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১-১ থেকে টাইব্রেকারে ৪-২ জিতেছে তারা, খেলেছে পুরো ১২০ মিনিট। সালাহর ছিল হ্যামস্ট্রিংয়ের শঙ্কা, তবু মাঠ ছাড়েননি, টাইব্রেকারে গোলও করেছেন। এই ম্যাচের তাই আরেক ট্যাগলাইন: মেসি বনাম সালাহ।
মিসরের টিম ডিরেক্টর ইব্রাহিম হাসান অবশ্য মেসির নাম শুনতেই বলেছেন, ‘ওদের মেসি আছে, আমাদের আছে সালাহ, আর আমাদের আছে নিজেদের ২৬ জন মেসি।’ গর্বের ভাষা, তবে অহংকারের নয়। যে দল এই প্রথম নিজেদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে টানা চার ম্যাচে অপরাজিত থেকে শেষ ষোলোয়, তাদের মুখে এমন কথাই তো মানায়।
সালাহর গল্পটা সংখ্যায় কম চকচকে, কিন্তু সমান গভীর। চার ম্যাচে ২ গোল, এক অ্যাসিস্ট, সুযোগ তৈরি করেছেন ১৬টি। বয়স মেসির চেয়ে ৫ বছর কম, কিন্তু এটা তাঁরও শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে। আর শেষটা কে না মনে রাখার মতো করতে চায়! মিসরের সামনেও সুযোগ, ক্যামেরুন-সেনেগাল-ঘানা-মরক্কোর পর পঞ্চম আফ্রিকান দেশ হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখার।
আর্জেন্টিনা-মিসর বিশ্বকাপে কখনো মুখোমুখি হয়নি। সবশেষ দেখা হয়েছিল ২০০৮ সালে কায়রোয়, প্রীতি ম্যাচে, ২-০ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। আফ্রিকান প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বিশ্বকাপে টানা আট ম্যাচ অপরাজিত তারা, যার মধ্যে এই আসরেই হারিয়েছে আলজেরিয়া আর কেপ ভার্দেকে। কিন্তু ইতিহাস কখনো ভবিষ্যতের জামিন দেয় না।
জয়ী দলের জন্য অপেক্ষায় কানসাস সিটিতে সুইজারল্যান্ড অথবা কলম্বিয়া। তার আগে আটলান্টায় আজকের লড়াইটা শুধু দুটি দলের নয়, দুটি মানুষেরও।
একজন মেসি, যিনি খুঁজবেন ইতিহাসের নতুন পাতা।
অন্যজন সালাহ, যিনি প্রমাণ করতে চাইবেন—মহাতারকার পাশে দাঁড়িয়েও নিজের আলো ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats