ট্রাম্পের এক ফোনে ফিফার ইউটার্ন, লালকার্ড ও নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলো যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোরালিন বালোগানের। আজ বালোগনকে নিয়েই বেলজিয়ামের মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার মরণপণ লড়াইয়ে আজ সিয়াটল স্টেডিয়ামে মুখোমুখি সহ-স্বাগতিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি বেলজিয়াম।
তবে মাঠের রণকৌশল কিংবা দুই দলের ফুটবলীয় শক্তি নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে এখন পুরো ফুটবলবিশ্ব বুঁদ হয়ে আছে হোয়াইট হাউসের ক্ষমতার দাপট আর ফিফার এক নজিরবিহীন ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ব্যবচ্ছেদে। সরাসরি লাল কার্ড দেখার পরও সব নাটকীয়তা পেছনে ফেলে আজ যুক্তরাষ্ট্রের একাদশে থাকছেন তারকা স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগান।

ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছেএএফপি
শেষ ৩২-এর ম্যাচে বসনিয়া-হার্জেগোভিনার তারিক মুহারোমোভিচকে ফাউল করায় সরাসরি লাল কার্ড দেখেছিলেন মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগান। ফিফার নিয়মানুযায়ী, শেষ ষোলোর এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তার মাঠের বাইরে বসে থাকার কথা ছিল। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের স্তব্ধ করে দিয়ে বালোগানের এক ম্যাচের স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ নজিরবিহীনভাবে স্থগিত করেছে ফিফা।
১৯৭০ বিশ্বকাপে লাল কার্ডের নিয়ম চালুর পর গত ৫৬ বছরের ইতিহাসে কোনো ফুটবলার সরাসরি লাল কার্ড দেখার পরও পরের ম্যাচে খেলার অনুমতি পাননি। ফিফার এমন অলৌকিক ও অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্তের পেছনে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপের খবর সামনে এসেছে।
সাবেক লিভারপুল কোচ ও জার্মানির কোচ হিসেবে নতুন দায়িত্বে ফিরতে যাওয়া ইয়ুর্গেন ক্লপ এ ঘটনায় নিজের ক্ষোভ লুকাননি। ম্যাজেন্টা টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্ষুব্ধ ক্লপ বলেছেন, ‘যদি সত্যিই এমনটা হয়ে থাকে, তবে সেটা পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। একটা কথা পরিষ্কার বলে দেওয়া ভালো—এটা আমাদের খেলা, ওদের নয়। ফুটবল নিয়ে কোনো ধারণা না থাকা এই দুই ব্যক্তির ফুটবলীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত থাকার কোনো অধিকার নেই। ওটা সরাসরি লাল কার্ড ছিল, এটা নিয়ে দুটি মত থাকার সুযোগ নেই। আমরা বালোগানের জন্য দুঃখিত, কারণ ও ইচ্ছে করে ফাউলটি করেনি। কিন্তু নিয়ম তো নিয়মই।’
বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ফিফার এই ‘ইউটার্ন’ ফুটবলে বিপজ্জনক এক নজির তৈরি করল বলে মনে করছেন বোদ্ধারা। ব্রাজিলের বিপক্ষে ২–১ ব্যবধানে নিজের দলের দুর্দান্ত জয়ের উদ্যাপন একপাশে সরিয়ে রেখে ফিফাকে একহাত নিয়েছেন নরওয়ের কোচ স্টেল সোলবাকেনও। রেফারির সিদ্ধান্ত এভাবে পাল্টে দিয়ে ফিফা নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনল বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

হতাশ সোলবাকেন বলেছেন, ‘আমি সত্যিটাই বলছি। ফিফা মস্ত বড় একটা ভুল করেছে। এটা মোটেও ভালো সিদ্ধান্ত নয়। সে লাল কার্ড পেয়েছিল এবং ভিএআর যাচাই করেই তা দেওয়া হয়েছিল। এরপর নিষেধাজ্ঞা থাকাটাই স্বাভাবিক। খারাপ লাগছে এটা ভেবে যে যুক্তরাষ্ট্র যদি বেলজিয়ামকে হারিয়ে দেয়, তবে এই বিতর্কটা আজীবন থেকে যাবে। বালোগান যদি গোল করে, তবে বেলজিয়ামের ফুটবলাররা ক্ষোভে ফেটে পড়বে। পরবর্তী লাল কার্ডের বেলায় কী হবে? পর্দার আড়ালে কি এমন কোনো কমিটি থাকবে যারা শাস্তি মওকুফ করে দেবে? এটা খুবই, খুবই, খুবই বাজে একটা সিদ্ধান্ত, যা বিশ্বকাপকে কলঙ্কিত করছে। আমি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি, কারণ ওরা জিতলেও এই অপবাদটা পিছু ছাড়বে না। ফুটবলের জন্য এটা মোটেও ভালো বিজ্ঞাপন নয়।’
বিতর্ক অবশ্য এখানেই থামছে না। শেষ মুহূর্তে ফিফা বেলজিয়ামকেও এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি দিয়েছে। ফলে সোমবারের বেলজিয়াম–যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচের আগে মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরের উত্তাপই এখন বাড়িয়ে দিচ্ছে ফুটবলপ্রেমীদের স্নায়ুচাপ। বিশ্বকাপের মাঠে ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর এই ‘পাসিং গেম’ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লাল কার্ড নিয়ে ফিফার সঙ্গে কথা বলেছিলাম, নিশ্চিত করলেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় ফোলারিন বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করার জন্য ফিফাকে অনুরোধ করেছিলেন বলে নিশ্চিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বালোগান বসনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তারিক মুহারোমোভিচকে ফাউল করায় সরাসরি লাল কার্ড দেখেছিলেন। নিয়মানুযায়ী শেষ ষোলোয় বেলজিয়ামের বিপক্ষে তাঁর বসে থাকার কথা থাকলেও নজিরবিহীনভাবে ফিফা তা স্থগিত করেছে।
স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্টই ফিফাকে সিদ্ধান্ত বদলাতে প্রভাবিত করেছেন—এমন অভিযোগের মধ্যে ট্রাম্প নিশ্চিত করলেন, তিনি লাল কার্ড নিয়ে ফিফাকে ভাবতে বলেছিলেন।
সোমবার হোয়াইট হাউসে তিনি বলেন, ‘আমি কেবল পুনর্বিবেচনা করার জন্য বলেছিলাম। কারণ, আমার মনে হয়নি ওটা কোনো ফাউল ছিল। আর সত্যি বলতে, এসব বিষয় আমি ভালোই বুঝি। আমার কাছে ওটা ফাউল মনে হয়নি। আমার মনে হয়েছে দুজন দুর্দান্ত খেলোয়াড় একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন।’
১৯৭০ বিশ্বকাপে লাল কার্ড চালুর পর এত দিন ধরে কোনো খেলোয়াড়ের স্বয়ংক্রিয় এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হয়নি। সরাসরি লাল কার্ডের ন্যূনতম শাস্তি এটি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অপরাধের ধরন বিবেচনায় নিয়ে নিষেধাজ্ঞাটি আরও বাড়বে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে এবার তিন গোল করা বালোগানের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ফিফার সমালোচনা করছেন অনেকে।
তবে ট্রাম্প মনে করছেন সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে ফিফা, তিনি উল্টো রেফারিদের সমালোচনা করেছেন, ‘আমার মনে হয় তারা (ফিফা) একটি চমৎকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রেফারির সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত বাজে, অথচ সেই বিষয়ে কেউ কথাই বলছে না। সবাই লাল কার্ড পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে এমনভাবে কথা বলছে, যেন ওটাই ঠিক ছিল; লাল কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে রেফারির সিদ্ধান্তটি কেমন ছিল, তা নিয়ে কেউ আলোচনা করছে না।’
বালোগান খেলতে না পারলে তা বিশ্বকাপের জন্য ক্ষত হয়ে থাকত বলেও মনে করেন ট্রাম্প, ‘এই নিষেধাজ্ঞা একটি বড় দাগ রেখে যেত। আমি তাদের কী করতে হবে, তা বলে দিতে পারি না। আমি বিশ্বাস করি না যে তারা (ইনফান্তিনো) এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমার বিশ্বাস এটি ডিসিপ্লিনারি কমিশন নিয়েছে। এবং এটি একটি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।’
নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়ায় বালোগান বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলতে পারবেন। তবে এ নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে ফিফায় আপিল করেছিল রয়্যাল বেলজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আরবিএফএ)। ফিফা সেটি খারিজ করে দেওয়ার পর আরবিএফএ যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশনের কাছে বালোগানের বিষয়ে নিজেদের ‘প্রতিবাদ’ জানিয়ে রেখেছে।
ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফাও ফিফার সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছে। এ ঘটনা ফুটবলের সততা ও নিরপেক্ষতাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
এ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বালোগানকে লাল কার্ড দেওয়া ব্রাজিলিয়ান রেফারি রাফায়েল ক্লাউসকে ‘কিছুটা সন্দেহজনক’ বলে যে মন্তব্য করেছেন, সেটির প্রতিবাদ জানিয়েছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ)। ক্লাউসের পক্ষে দাঁড়িয়ে সিবিএফের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘তাঁর ট্র্যাক রেকর্ডে এমন কিছু নেই, যা তাঁকে হেয় করে বা কোনো সন্দেহের অবকাশ রাখে। তিনি একজন অনুকরণীয় পেশাদার রেফারি।’
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বিবৃতিতে ইনফান্তিনো জানান, ট্রাম্পের ফোন পাওয়ার পর তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন যে ‘ফিফার স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সংস্থাগুলোর অধীনে একটি আইনি প্রক্রিয়া চলছে এবং যথাসময়ে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ এর সিদ্ধান্ত নেবে।’
ফিফার আপিল কমিটি মনে করছে এ ঘটনায় বেলজিয়াম কোনো সংশ্লিষ্ট পক্ষ নয়, কারণ তারা মূল সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত ছিল না এবং তারা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রতিপক্ষ।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats