দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে ঢাকা মহানগর। জলাভূমি ভরাট করা হয়েছে, নিচু এলাকায় স্থাপনা গড়ে উঠেছে এবং এমন সব বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যেগুলো হয়তো বড় ভূমিকম্প সামলাতে পারবে না। দ্য ডেইলি স্টার-এর ছয় পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের তৃতীয় পর্বে আজ উঠে এসেছে, খোলা জায়গার সংকটে কীভাবে দুর্যোগঝুঁকি বাড়ছে ঢাকায়।
সম্প্রতি এক ভূমিকম্পে কেঁপে উঠে ঢাকা। কম্পন থেমে যাওয়ার পর চকবাজারের বাসিন্দা মোহাম্মদ মুস্তাকিম দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে দ্রুত নেমে প্রতিবেশীদের সঙ্গে রাস্তায় জড়ো হন। কিন্তু সম্ভাব্য পরাঘাতের সময় আশ্রয় নেওয়ার মতো নিরাপদ জায়গা তাদের ছিল না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে নেই কোনো খেলার মাঠ বা উন্মুক্ত স্থান। যে সড়কে বাসিন্দারা জড়ো হয়েছিলেন, তার চারপাশ ঘিরে ছিল বহুতল ভবন, যা তাদের আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছিল।
মুস্তাকিম বলেন, ‘ভূমিকম্পের সময় এবং পরে আমি অসহায় বোধ করেছি। নিরাপদ আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো জায়গা খুঁজে পাইনি।’
দুর্যোগের সময় উন্মুক্ত স্থান শুধু নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবেই নয়, উদ্ধারকাজ ও অস্থায়ী চিকিৎসা শিবির স্থাপনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাজধানীর অধিকাংশ এলাকাতেই এমন জায়গার ঘাটতি রয়েছে।
বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) অনুযায়ী, দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ১২৯টি ওয়ার্ডের অন্তত ৪১টিতে কোনো পার্ক বা খেলার মাঠ নেই। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৩১টি এবং ঢাকা উত্তর সিটিতে ১০টি ওয়ার্ড রয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার প্রাকৃতিক ও সবুজ এলাকা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। শহরের কেন্দ্রীয় অংশে জলাশয়ের পরিমাণ ১৯৯৫ সালে ছিল ২০ দশমিক ৫৭ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশে। একই সময়ে সবুজ এলাকার পরিমাণ ২২ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৯ শতাংশে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘পার্ক, খেলার মাঠ এমনকি অনানুষ্ঠানিক উন্মুক্ত স্থানগুলোকেও জরুরি আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘এসব স্থানকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগের সময় ব্যবহারের জন্য নিকটবর্তী জায়গাগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এটিই মূল উদ্দেশ্য।’
নগর পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতিটি বাসস্থান থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে একটি উন্মুক্ত স্থানে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আদিল বলেন, ‘ঢাকার প্রায় ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই মানদণ্ড প্রয়োগ করলে জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে প্রায় ৬০০টি উন্মুক্ত স্থানের প্রয়োজন হবে।’
তবে এটুকুও যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন তিনি।
‘একটি খেলার মাঠ পুরো ওয়ার্ডের মানুষের আশ্রয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। কোনো কোনো ওয়ার্ডে এক লাখের বেশি মানুষ বাস করলেও সেখানে একটি মাঠও নেই। এমনকি এক হাজার মানুষ একটি মাঠে জড়ো হলেও সেটি দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায়,’ বলেন তিনি।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির উদাহরণ টেনে আদিল বলেন, ‘উদ্ধারকাজ ও অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল হিসেবে সাভার অধরচন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ ব্যবহার করা হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘এ কারণেই প্রতিটি মহল্লায় হাঁটা দূরত্বের মধ্যে একটি উন্মুক্ত স্থান থাকা প্রয়োজন।’
‘সরকারের উচিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে উন্মুক্ত স্থান বাড়ানো এবং বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে প্রতি আধা বর্গকিলোমিটারে অন্তত একটি খেলার মাঠ রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা।’
‘প্রতিটি বাড়ি থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে যদি একটি উন্মুক্ত স্থান থাকে, তাহলে জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষ নিরাপদে জড়ো হওয়ার সুযোগ পাবে। তবে জনঘনত্ব বেশি এমন এলাকায় আরও বেশি জায়গার প্রয়োজন হবে,’ বলেন তিনি।
ড্যাপে আরও সুপারিশ করা হয়েছে, প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমন খেলার মাঠ নিশ্চিত করতে হবে, যা দুর্যোগের সময় জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
আদিল বলেন, ‘সরকারের উচিত এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া।’
ড্যাপ ২০২২ অনুযায়ী, ঢাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও খেলার মাঠের ঘাটতি রয়েছে। কেন্দ্রীয় এলাকায় প্রয়োজন ২৯৬টি মানসম্পন্ন বিদ্যালয়, কিন্তু রয়েছে মাত্র ২২৫টি। বিশদ পরিকল্পনা এলাকায় প্রয়োজন ১ হাজার ৩৮৯টি বিদ্যালয়, বিপরীতে রয়েছে ৮৬২টি। একইসঙ্গে কলেজের সংকটও চিহ্নিত করা হয়েছে এবং নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনের ক্ষেত্রে খেলার মাঠের ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর খেলার মাঠের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন, বিদ্যমান সুবিধার উন্নয়ন এবং মাঠবিহীন প্রায় ১১ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্পর্কে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
এ ছাড়া, ভবিষ্যতের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রকল্পে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘ভূমিকম্পের সময় মানুষের হুড়োহুড়ি করে বাইরে বের হওয়া উচিত নয়।’
তিনি বলেন, ‘আগুন লাগলে দ্রুত ভবন ত্যাগ করতে হয়। কিন্তু ভূমিকম্পের সময় ভবনের ভেতরে নির্ধারিত নিরাপদ স্থানে থেকে মাথা সুরক্ষিত রাখতে হবে।’
‘কম্পন থেমে গেলে শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে ভবন থেকে বের হয়ে নির্ধারিত খোলা জায়গায় যেতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।
তবে পুরান ঢাকার মতো এলাকায় এমন নির্ধারিত উন্মুক্ত স্থানের তীব্র অভাব রয়েছে।
আনসারী বলেন, ‘বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর মানুষকে কয়েক দিন তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকতে হতে পারে। তাই অতিরিক্ত অস্থায়ী স্থানও চিহ্নিত করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘খেলার মাঠ, পার্ক, কমিউনিটি সেন্টার, স্কুল ও হাসপাতালকে সম্ভাব্য জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত ও প্রস্তুত রাখতে হবে।’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, ‘উন্মুক্ত স্থানের অভাব উদ্ধারকাজেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পে কোনো ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হলে এবং আশপাশে খোলা জায়গা না থাকলে ফায়ার সার্ভিস টার্নটেবল ল্যাডারের মতো ভারী যন্ত্রপাতি মোতায়েনে সক্ষম নাও হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘ঢাকার উন্মুক্ত স্থানগুলো রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। এজন্য সরকারি সংস্থা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।’
সরকার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলেও জানান তিনি।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats