সাংকেতিক ছবি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কেন সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন না—এ আলোচনা নতুন নয়। তবে তাঁর সাম্প্রতিক অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সফরে বিষয়টি আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে।
নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (এমইএ) সচিব (পূর্ব) রুদ্রেন্দ্র ট্যান্ডনকে সাংবাদিকেরা এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে রুদ্রেন্দ্র ট্যান্ডন বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে মন্তব্য করা তাঁর পক্ষে সমীচীন নয়। শুধু হাসিমুখে তিনি বলেন, ‘তিনি (মোদি) অত্যন্ত সফল একজন রাজনীতিক।’
এরপর বিষয়টির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ট্যান্ডন দাবি করেন, ভারতের বেশির ভাগ ভোটার সাধারণ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর হওয়ায় তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ পছন্দ করেন। তিনি বলেন, ‘ভারতের ভোটারদের বড় অংশই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর। তাঁরা সরাসরি যোগাযোগ চায়। তাঁরা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বা ওপর থেকে নির্দেশনা শুনতে পছন্দ করে না।’
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আইডি হারালেন মোদিকে প্রশ্ন করা সেই নরওয়েজীয় সাংবাদিকফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আইডি হারালেন মোদিকে প্রশ্ন করা সেই নরওয়েজীয় সাংবাদিক
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব রুদ্রেন্দ্র ট্যান্ডন আরও বলেন, ‘মোদি তাঁর ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কৌশল আয়ত্ত করেছেন এবং সেটি সফলভাবেই প্রয়োগ করছেন। তিনি ভারতে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রীদের একজন।’
এর কয়েক দিন আগে অস্ট্রেলিয়া সফরেও একই প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে। দেশটির টেলিভিশনে এক সাংবাদিক সরাসরি সম্প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এবারের সফরে নরেন্দ্র মোদির যতটা কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব, আমরা ততটাই যেতে পেরেছি। তিনি সাধারণত সংবাদ সম্মেলন এড়িয়ে চলার জন্য পরিচিত। তিনি নিয়ন্ত্রিত ও পূর্বপরিকল্পিত সূচিকেই প্রাধান্য দেন।’
এই মন্তব্যের পর ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী টানা তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করলেও দেশে বা বিদেশে একবারও সরাসরি প্রশ্নোত্তরভিত্তিক সংবাদ সম্মেলন করেননি। কিন্তু কেন?
ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনাতে অস্ট্রেলিয়ার ঘটনাকে ‘ভারতীয় গণমাধ্যমের জন্য একটি কৌতুক’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি দাবি করার পরিবর্তে দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম তাঁর ‘একমুখী বক্তব্য’ প্রচারেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
কংগ্রেস নেতা পবন খেরা বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা সরকারের হয়ে বক্তব্য দেবেন—এটা স্বাভাবিক। তবে এই ব্যাখ্যাকে তিনি ‘গণতান্ত্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেন।
গত মে মাসে নরওয়ে সফরেও একই প্রশ্নের মুখে পড়েন মোদি। সে সময় প্রধানমন্ত্রী জোনাস গোর স্তোরের সঙ্গে মোদির যৌথ সংবাদ সম্মেলন শেষে নরওয়ের সাংবাদিক হেলে লিং উচ্চস্বরে প্রশ্ন করে জানতে চান, ‘প্রধানমন্ত্রী মোদি, আপনি বিশ্বের সবচেয়ে স্বাধীন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের কাছ থেকে কিছু প্রশ্ন নিচ্ছেন না কেন?’
কিন্তু মোদি তাঁর প্রশ্ন না নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের স্থান ত্যাগ করেন।
পরে হেলে লিং এক্সে একটি ভিডিও পোস্ট করেন, যেখানে দেখা যায়, নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনের স্থান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন মোদি। ভিডিওর ক্যাপশনে লিং লেখেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমার প্রশ্ন নেননি। আমি অবশ্য সেটি প্রত্যাশাও করিনি। বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে নরওয়ে যেখানে শীর্ষ (প্রথম) অবস্থানে রয়েছে, সেখানে ভারত ১৫৪তম স্থান থেকে আরও পিছিয়ে ১৫৭তম স্থানে নেমে গেছে।’
সংবাদ সম্মেলন থেকে মোদির বেরিয়ে যাওয়ার এই ভিডিও ভারতে রাজনৈতিক মহলেও বিতর্কের জন্ম দেয়। ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোদিকে ‘কম্প্রোমাইজড পিএম’ (আপসকারী প্রধানমন্ত্রী) বলে কটাক্ষ করেন। এই ঘটনার পর হেলে লিং ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন এবং মোদির নরওয়ে সফর নিয়ে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
প্রসঙ্গত, বিতর্কিত ওই ঘটনার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় হেলে লিং অভিযোগ করেন, তাঁর ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে মেটা কর্তৃপক্ষ।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া
নরওয়ের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনেও বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। ওই সংবাদ সম্মেলনে হেলে লিং প্রশ্ন তোলেন—‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নরওয়ে কেন ভারতকে “বিশ্বাস” করবে?’
জবাবে ভারতীয় কূটনীতিক সিবি জর্জ ব্যাখ্যা দেন—কেন নয়াদিল্লি বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার এবং কেন ভারতকে বিশ্বাস করা যায়। তিনি ভারতের হাজার বছরের সভ্যতাগত ইতিহাসকে এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে লিংয়ের প্রশ্নের জবাব দেন।
এবারও অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সফরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পর একই উত্তর দিল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মোদি তাঁর ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন। তিনি সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন না। এটি মোদির নিজস্ব এবং অত্যন্ত সফল একটি রাজনৈতিক কৌশল, যা তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় টিকে থাকতে এবং জনগণের ব্যাপক সমর্থন ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats