শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি কফিনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন দেশি-
ইরানে ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন প্রক্রিয়ার প্রথম পর্বের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় (দেশটির সবচেয়ে বড় জুমার নামাজ আদায়ের স্থান) তাঁর মরদেহ রাখা হয়েছে। বিদেশি অতিথি ও বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তাঁর মরদেহের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।
আজ শুক্রবার ভোরে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তাঁর সঙ্গে নিহত হওয়া অন্য ব্যক্তিদের মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে নেওয়া হয়। সেখানকার প্রধান নামাজের কক্ষে মরদেহগুলো রাখা হয়। এরপর শুরু হয় শেষশ্রদ্ধা নিবেদনের আনুষ্ঠানিকতা।
খামেনিকে শ্রদ্ধা জানাতে আসা প্রথম বিদেশি অতিথিদের মধ্যে আছেন—ইন্দোনেশিয়া ও আফগানিস্তানের ইসলামি আলেম এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। ইরানে স্বীকৃত বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনে (২৮ ফেব্রুয়ারি) খামেনি নিহত হন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই আজ বলেছেন, খামেনির দাফনসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতায় প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধিদল, বিভিন্ন খ্যাতিমান ব্যক্তি ও নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
ইসমাইল বাঘাই বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আসছে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীসহ অন্তত ৮ জন সরকারপ্রধান এবং ১২টি দেশের পার্লামেন্টের স্পিকার আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেবেন। এ ছাড়া আরও অনেক দেশ তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী অথবা বিশেষ দূতের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল পাঠাবে।
বাঘাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও এই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

বাঘাই আরও বলেন, পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধিদল, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও পার্লামেন্টের সদস্যরা শেষবিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। তবে ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানানো ইউরোপের দেশগুলোকে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
সরকারিভাবে শেষশ্রদ্ধা নিবেদনের এই আয়োজনের আগে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একটি ব্যক্তিগত বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সাম্প্রতিক যুদ্ধে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য এবং সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের কর্মীদের স্বজনেরা সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রয়াত নেতাকে শেষবিদায় জানান।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সব শ্রেণি-পেশা ও মতের ইরানিদের শেষবিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘বীরত্বপূর্ণ ইরান যখন ইসলাম ও বিপ্লবের একনিষ্ঠ সেবককে শেষবিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আমি জাতিগত পরিচয়, রাজনৈতিক মত, আদর্শ বা ধর্মনির্বিশেষে দেশের সব মানুষকে স্বতঃস্ফূর্ত, মর্যাদাপূর্ণ এবং ইতিহাসে স্মরণীয় সংখ্যায় এই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। এর মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য ও ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার উচ্চ আদর্শের প্রতি আনুগত্যের এক স্থায়ী চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হবে।’
ইরানের কর্মকর্তাদের ধারণা, দাফন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কয়েক দিনের এ আনুষ্ঠানিকতায় ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন।
আগামীকাল শনিবার ও রোববার শোক অনুষ্ঠান চলবে। এ সময় তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ রাখা হবে। এরপর সোমবার তেহরানে একটি ধরনের শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।
এরপর পবিত্র শহর কুমে আরও কিছু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালিত হবে। পরে ইরাকের বাগদাদ, কারবালা ও নাজাফে স্মরণানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে ৯ জুলাই মাশহাদে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে দাফন করা হবে।
খামেনির শেষবিদায়ে কোন দেশের কারা থাকছেন
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন অনুষ্ঠানে বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি। আজ শুক্রবার তেহরানে শুরু হওয়া এই আয়োজনকে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় দাফন অনুষ্ঠানে হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৮৬ বছর বয়সী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন। ওই দিনই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল।
সাত দিনের শোকানুষ্ঠান
আল জাজিরা বলছে, প্রথমে মার্চ মাসে দাফনের পরিকল্পনা থাকলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় তা পিছিয়ে যায়। শুক্রবার তেহরানে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির মাধ্যমে শুরু হওয়া শোকানুষ্ঠান সাত দিন ধরে ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে চলবে।
সোমবার ও মঙ্গলবার শেষযাত্রা ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমের দিকে অগ্রসর হবে। বুধবার ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার পর নাজাফ ও কারবালায় জনসমাগম ও শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তী শুক্রবার খামেনির মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে এনে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের ইমাম রেজার মাজারে দাফন করা হবে। মাশহাদেই তার জন্ম হয়েছিল।

যেসব দেশের সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান যাচ্ছেন
পাকিস্তান: প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ইসলামাবাদ।
তাজিকিস্তান: দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।
আর্মেনিয়া: প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান তেহরানে যাচ্ছেন।
জর্জিয়া: প্রেসিডেন্ট মিখাইল কাভেলাশভিলির অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ সরকারি প্রতিনিধিদের পাঠাচ্ছে যেসব দেশ
তুরস্ক: ভাইস প্রেসিডেন্ট সেভদেত ইলমাজ খামেনির জানাজায় অংশ নেবেন।
ভারত: ভারতের প্রতিনিধিদলে রয়েছেন দেশটির প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্গারিটা এবং বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ ও কাশ্মীরি নেতা মেহবুবা মুফতিও ভারতীয় প্রতিনিধিদলে রয়েছেন।
চীন: চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হে ওয়েই তেহরানে উপস্থিত থাকবেন।
রাশিয়া: রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন বলে নিশ্চিত করেছে ক্রেমলিন।
আফগানিস্তান: তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকী ইতোমধ্যে তেহরানে পৌঁছেছেন। এ ছাড়া, উপপ্রধানমন্ত্রী আব্দুল গনি বারাদারেরও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ: বাংলাদেশি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তেহরানে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় এই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ শোকযাত্রা
পর্যবেক্ষকদের মতে, এ আয়োজন ১৯৮৯ সালে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির শেষযাত্রাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেসময় প্রায় এক কোটি মানুষ ওই শোকযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন।
নিরাপত্তার কারণে থাকছেন না মোজতবা খামেনি
ভারতে নিযুক্ত তার প্রতিনিধির বরাত দিয়ে জানা গেছে, ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নিরাপত্তাজনিত কারণে বাবার শোকানুষ্ঠানে অংশ নেবেন না। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হত্যার হুমকির পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সতর্কবার্তা
এদিকে খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষবিদায়ের প্রস্তুতির মধ্যেই ইরানের সামরিক বাহিনীর এক শীর্ষ কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের কমান্ডার আলী আবদুল্লাহি বলেন, ‘ইরানের শত্রুদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী শাসনব্যবস্থাকে (ইসরায়েল) যেকোনো ভুল হিসাব থেকে বিরত থাকতে হবে। আমাদের দেশের বিরুদ্ধে হুমকি বা আগ্রাসনের জবাবে সশস্ত্র বাহিনী কঠোর প্রতিশোধ নেবে।’
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats