প্রায় ১০৯ বছর আগে মাত্র ৬৭ শব্দ দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল পুরো মধ্যপ্রাচ্য। সেই ৬৭ শব্দের ‘বেলফোর ঘোষণা’ পরবর্তীতে বৈশ্বিক মহাবিপর্যয় ডেকে আনে। এত বছর পরও সেই ঘোষণার খেসারত মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্ববাসীকে দিয়ে যেতে হচ্ছে বেশ চড়া দরে। দীর্ঘ সময় পর ৮০০ শব্দের এক সমঝোতার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের আগুন নেভানোর চেষ্টা হচ্ছে।
১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর মহাপ্রতাপশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আর্থার জেমস বেলফোর একতরফাভাবে স্থানীয়দের মতামতের তোয়াক্কা না করে ওসমানীয় তুর্কিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন অঞ্চলে ‘ইহুদিদের জাতীয় আবাসভূমি’ স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে, ১৯৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ শীর্ষ ক্ষমতাধর দেশগুলোর সহায়তায় আদিবাসী ফিলিস্তিনিদের জমির ওপর বিদেশি ইহুদিদের জন্য ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।
জাতিসংঘে ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণার সময় এর ভৌগোলিক সীমা উল্লেখ করা হয়নি। সেই সুবাদে গত ৭৮ বছর ধরে ইসরায়েল বিশ্বশক্তিগুলোর প্রকাশ্য সমর্থনে প্রতিবেশী দেশগুলোয় হামলা চালিয়ে তাদের জমি দখল করে চলেছে।
এখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের বেপরোয়া আচরণের রাশ টানতে হচ্ছে। কেননা, দেশটি আন্তর্জাতিক আইনের অবজ্ঞা করে দখল করা জমিতে অবৈধ বসতি বাড়িয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি, চালিয়ে যাচ্ছে ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নির্মূল অভিযান।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাসের রক্তক্ষয়ী হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালায়। শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে কাতারে আসা হামাস নেতাদের হত্যার জন্য দোহায় হামলা করে।
এর পরের বছর জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে আচমকা ইরান আক্রমণ করেছিল ইসরায়েল। সেবার সেই যুদ্ধ চলেছিল ১২ দিন। ইরান হামলার ভয় কেটে যাওয়ার পর নিজেকে অপ্রতিরোধ্য হিসেবে তুলে ধরতে আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে সব আন্তর্জাতিক আইন অবজ্ঞা করে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরে তেহরান আক্রমণ করে বসে ইসরায়েল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুগপৎ হামলায় হত্যা করা হয় পারস্য উপসাগরীয় দেশটির শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ সরকারি ও সামরিক কর্তাব্যক্তিদের।
এই দুই শক্তিশালী দেশের হামলায় নিহত হয়েছে স্কুলের শিশু ও নারীসহ কয়েক হাজার সাধারণ মানুষও।
এমন অপ্রত্যাশিত হামলায় ইসরায়েল সঙ্গে নেয় সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও বিশ্বের শীর্ষ সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে। অথচ জেনেভায় সে সময় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনা চলছিল।
ইসরায়েলের দখলদারিত্বের কারণে যে আগুন জ্বলেছিল ভূমধ্যসাগর তীরে, তা লোহিত সাগর ছুঁয়ে ছড়িয়ে পড়ে পারস্য উপসাগরের উপকূলেও। চার মাসের বেশি সময় ধরে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের চলতে থাকায় সেই আগুনের আঁচ সারা পৃথিবীকে সহ্য করতে হচ্ছে।
গত ১৭ জুন ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ভার্সাই নগরীতে সফররত মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প আচমকা ইরান শান্তি চুক্তি সংক্রান্ত ১৪-দফা সমঝোতাপত্রে সই করে বিশ্ববাসীকে অবাক করে দেন।
প্রসঙ্গত মনে করা যেতে পারে—১৯১৯ সালের ২৮ জুন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অদূরে ভার্সাইয়ে এক ঐতিহাসিক চুক্তির মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল। এই মহাযুদ্ধের পটভূমিতে ভবিষ্যৎ ইসরায়েল রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর গড়ে তোলা হয়েছিল ‘বেলফোর ঘোষণা’র মাধ্যমে।
ইতিহাসের এমন পটভূমিতে অনেকের মনে হতে পারে—ইউরোপ ও আমেরিকার জায়নবাদী ইহুদিদের তুষ্ট করতে সেই বিতর্কিত ঘোষণার মাধ্যমে স্যার আর্থার জেমস বেলফোর মধ্যপ্রাচ্যে যে আগুন জ্বেলেছিলেন তা যেন নেভানোর দায় পড়েছে সেই দুই মহাদেশের শীর্ষ নেতাদের ওপর।

বিধি চিরকালই বাম?
ভাষাবিদদের অনেকে বলেন—ফারসি ‘শাহ-মাত’ থেকে আরবি ‘শেখ-মাত’ হয়ে ইংরেজিতে ‘চেকমেট’ শব্দটি এসেছে। ‘শাহ মাত’-এর শাব্দিক অর্থ ‘রাজা মৃত’ বা ‘রাজা অসহায়’। ব্রিটানিকা বলছে—প্রাচীন ভারতের ‘চতুরঙ্গ’ বা ‘শতরঞ্জ’ খেলার একটি রূপ ‘দাবা’ পারস্যভূমি হয়ে ইউরোপে ঢুকেছে।
বিশ্বকোষটি আরও বলছে—বাগদাদের ঐতিহাসিক আল সুলি এই খেলা তার শিষ্য আল লাজলাজসহ অনেকের সঙ্গে খেলেছেন। দশম শতাব্দীর এক পাণ্ডুলিপিতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই খেলা সম্পর্কে এটিই সবচেয়ে পুরোনো তথ্য। ‘চতুরঙ্গ’ শব্দটির উপস্থিতি আছে ‘মহাভারত’-এ। এই ‘চতুরঙ্গ’ খানিকটা বিবর্তিত হয়ে ‘শতরঞ্জ’ নাম নিয়েছে।
সপ্তম শতাব্দীতে ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ‘শতরঞ্জ’ খেলা বেশি জনপ্রিয় ছিল। তবে ষষ্ঠ শতাব্দীর আগে এই খেলার অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছু জানা যায় না বলে ব্রিটানিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, আজকের দাবায় তদানীন্তন পারস্য তথা আজকের ইরানের অবদান আছে।
বিশেষজ্ঞদের অনেকের প্রশ্ন—এ কারণেই কি ট্রাম্পের ইরান সমঝোতাপত্র তৈরিতে তেহরানের কূটনীতিকরা এত যোগ্যতার পরিচয় দিলেন? প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে মধ্যপ্রাচ্য নিরন্তর জ্বলছে সেই আগুন নেভাতেই কি তৈরি হয়েছে ‘৮০০ শব্দের’ শান্তি প্রস্তাব?
মহাক্ষমতাধর মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতে, যারা ইরানকে নিয়ে সমঝোতার সমালোচনা করছে তারা হয় ‘বোকা’ নয়ত ‘ঈর্ষান্বিত, খারাপ লোক অথবা বদমায়েশ’।
শুধু তাই নয়—এই সমঝোতাপত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এতটাই উৎফুল্ল যে তারা পরিকল্পিত সময়ের দুইদিন তথা ১৯ জুনের আগেই সমঝোতা চুক্তি কার্যকরের ঘোষণা দেয়। তবে ঘোষণাটি প্রথম আসে চুক্তির মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের এক্স বার্তা থেকে।
এ ঘটনার পরদিন ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুসালেম পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ইসরায়েলের সংবিধান বদলানোর দাবি তুলেছেন। তিনি এর মাধ্যমে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ দেখার চেষ্টা করছেন। তার মতে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার আলোকে’ সেই সংবিধান তৈরি করতে হবে।
এই ইসরায়েলি নেতার ভাষ্যে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে যে নীতি নিয়ে চলছে তা আখেরে রাষ্ট্রটির জন্যই ক্ষতিকর। কেননা, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে একটি রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না।
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েল বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে ‘ঘৃণিত’ রাষ্ট্র। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায়: যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইসরায়েলের কোনো বন্ধু নেই। এমনকি, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে এই দেশটির টিকে থাকার যোগ্যতাও নেই।
অর্থাৎ, যে আগ্রাসী সম্প্রসারণ নীতি গ্রহণ করে ইসরায়েল মিশরের নীল নদ থেকে ইরাকের ফোরাত নদী পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে পৌরাণিক যুগের ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গড়ে তোলার প্রচার চালাচ্ছে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, পুরো পৃথিবীতে অরাজকতা সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন অনেকে।
এসব কথা হচ্ছে মূলত তেহরানের ক্ষমতাসীন বিপ্লবী শাসকদের সঙ্গে ট্রাম্পের সমঝোতা চুক্তির কারণেই। কেননা, এই মহাক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতি ইরানের বর্তমান শাসকদের হটানোর জন্য তেহরানে হামলা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
সমালোচকদের ভাষ্য: শুধু তাই নয়, যেসব লক্ষ্য পূরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে তুলনামূলক দুর্বল ইরানের ওপর ধ্বংসাত্মক হামলা চালালো সেসব লক্ষ্য ‘পূরণ’ হয়নি।
গত ১৯ জুন প্রকাশিত মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি-এনওআরসির জরিপে দেখা যায়—ইরানের সঙ্গে শান্তির বিষয়ে ট্রাম্পের ব্যবস্থাপত্রের প্রতি নাখোশ প্রায় ৬৫ শতাংশ মার্কিনি।
তাদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সমর্থক ও স্বাধীন ভাবনার মানুষের সংখ্যা বেশি এবং মাত্র ২৮ শতাংশ ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক।
অথচ এর আগের দিন হোয়াইট হাউসের এক এক্স পোস্টে বলা হয়—‘ইরান কখনোই পরমাণু বোমা পাবে না। (হরমুজ প্রণালী দিয়ে) তেলের ট্যাংকার চলাচল করছে। (যুক্তরাষ্ট্রে) গ্যাসের দাম কমছে। পুঁজিবাজারে চাঙা ভাব। (এই সমঝোতাপত্র) আমেরিকার ও বিশ্বের জন্য এক বিজয়।’
একই দিনে, ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-কে এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন—ইরান চুক্তি হচ্ছে তেহরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের’ শামিল।
তবে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রয় কাসাগ্রান্ডা সেই চুক্তিকে ট্রাম্পের ‘আত্মসমর্পণ’ বলে মনে করেন।
‘অফিস আওয়ার’ পডকাস্টে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, ‘পশ্চিমের অনবরত নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। জনতার জোরালো আন্দোলনে দেশটির শাসকদের মনে ভয় ঢুকেছে।’
‘এমনকি, শাসক গোষ্ঠীর মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব যখন ঊর্ধ্বমুখী ঠিক তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানে হামলা চালিয়ে সেখানকার শাসকদের পতন তো ঘটাতে পারেইনি, উল্টো বিশ্বমঞ্চে তাদেরকে আরও শক্তিশালী করেছে,’ যোগ করেন তিনি।

দুনিয়া কাঁপানো ১০৮ দিন?
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে জেনেভায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের কর্মকর্তাদের শান্তি আলোচনার প্রেক্ষাপটে আক্রান্ত হয় পারস্য উপসাগরীয় দেশটি।
সম্প্রতি প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদক ম্যাগি হাবেরম্যান ও জনাথন সোয়ানের ‘রেজিম চেঞ্জ’ বইয়ের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান জানায়, গত বছর ট্রাম্প তার একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইলন মাস্ক ও টাকার কার্লসনকে ওভাল অফিসে বলেছিলেন যে তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চান না।
এর আগে নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প তার পূর্বসূরিদের মতো বিদেশের মাটিতে যুদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মার্কিনিদের কল্যাণের ওপর জোর দিয়েছিলেন। বাস্তবে দেখা গেল ইরান যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের দেশের অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত তিন বছরে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মার্কিনিরা বিরক্ত তাদের রাষ্ট্রপতির ওপর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য—যুক্তরাষ্ট্রে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচন হিসেবে পরিচিত পার্লামেন্ট বা কংগ্রেস নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীদের হেরে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। এর অন্যতম কারণ ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ইরান যুদ্ধ। তাই ট্রাম্প চাচ্ছিলেন দ্রুত এই যুদ্ধ শেষ করতে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সেই অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধ চলেছে ১৫ জুন পর্যন্ত। গত ১৪ জুন ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ৮০তম জন্মদিনে যুক্তরাষ্ট্রবাসীকে উপহার হিসেবে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানের ঘোষণা দেন।
ঘড়ির হিসাবে তখন ইরানে ছিল ১৫ জুন। সেই হিসাবে টানা ১০৮ দিন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তির দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও প্রধান মিত্র ইসরায়েলকে মোকাবিলা করেছে সামরিক দিক থেকে তুলনামূলক কম শক্তিশালী ইরান।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রয় কাসাগ্রান্ডা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা সবসময়ই নিজেদের বিজয়ী হিসেবে প্রচার করে থাকেন। গত শতকের সত্তরের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হওয়ার পরও নিজেদের বিজয়ী হিসেবে প্রচার করেছে।’
‘চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে শুরু হওয়া ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিজয়ী হিসেবে প্রচার করেছে। অথচ বিশ্ববাসী জানেন, আসলে এসব দেশে মার্কিন সেনাদের কী পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে।’
ইরানের কাছে ট্রাম্প বারবার অপমানিত হওয়ার পরও নিজেকে বিজয়ী দাবি করছেন, বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ কথা সবাই জানেন—যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীতে সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হয়। সেই সংকট বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রকেও চিন্তায় ফেলে দেয়।
পরবর্তীতে ইরানকে অর্থের বিনিময়ে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চরম অপমানের হয়ে উঠে।
ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে নিখুঁত হামলা চালানো ও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়ে ইরান বিশ্বমঞ্চে বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করে।
প্রায় সাড়ে চার হাজার বছরের সভ্যতার দেশ ইরানকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েও ট্রাম্পকে বারবার পিছু হটতে দেখেছে বিশ্ববাসী।
গত ২১ জুন ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল এক প্রতিবেদনে জানায়—সম্প্রতি হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুসালেম ও অ্যাগাম ইনস্টিটিউটের যৌথ জরিপে দেখা গেছে—ইসরায়েলের ৯২ শতাংশের মানুষ বিশ্বাস করে যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বিজয়ী হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়—যারা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সমর্থন করেন তাদের মধ্যে ৯৩ শতাংশের বেশি মানুষ বিশ্বাস করেন যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা যুদ্ধে ইরান বিজয়ী হয়েছে।
এমন সংবাদ প্রকাশের পর ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান কটাক্ষ করে বলেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলিদের মনোভাব প্রকাশ করে দিয়েছে যে এই যুদ্ধে আসলে কে বিজয়ী হয়েছে।
শুধু ইসরায়েল নয়, গত ১৭ জুন খোদ যুক্তরাষ্ট্রে সিবিএস নিউজ ও ইউগভ পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে ৩৭ শতাংশ মার্কিনির বিশ্বাস ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে সমঝোতা চুক্তি করেছে তা তেহরানের পক্ষে গিয়েছে এবং ২২ শতাংশ বিশ্বাস করে তা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে গেছে।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রেও তুলনামূলকভাবে বেশিরভাগ মানুষ চুক্তিটি ইরানের পক্ষে গেছে বলে মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন—ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিবেশী আরবদের ছয় দিনের যুদ্ধের যে লজ্জাজনক হার সে দিক থেকে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের এমন কৌশলগত যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয় পুরো বিশ্বকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়।
তাদের মতে, আর এ কারণে ইরানকে ‘ছাড়’ দিয়ে হলেও আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের পথে হাঁটতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
ভার্সাইয়ে এবার কার ভাগ্যের ভরাডুবি?
ইতিহাস বলছে—ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্য চুক্তি হয়ে আসছে ১৭৫৬ সাল থেকে। সে বছর ১ মে ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়া প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি করেছিল। সে ঘটনা ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের ইউরোপের তৎকালীন শীর্ষ শক্তির দেশগুলোর মধ্যে ‘সাত বছরের যুদ্ধের’ ঘটনা মনে করিয়ে দেয়।
সেই শতাব্দীতে আরও বেশি কয়েকটি চুক্তির জন্য ভার্সাই নগরী ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে।
পরবর্তী শতাব্দীর শেষের দিকে অর্থাৎ, ১৮৭০ সালের ফ্রাঙ্কো-জার্মান যুদ্ধের কথা ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সেই যুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয় হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে ইউরোপে ফ্রান্সের একাধিপত্য কমে যায় এবং সংযুক্ত জার্মানি গঠিত হয়।
পরের বছর ভার্সাইয়ে চুক্তির মাধ্যমে সেই যুদ্ধ শেষ হয়।
এর পরের শতাব্দীতে ফ্রান্সের এই ঐতিহাসিক নগরী বিশেষ খ্যাতি পায় ১৯১৯ সালের চুক্তির কারণে। সেই চুক্তির মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। সেই যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে ওসমানীয় খিলাফতের অবসান হয়। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন ও ফ্রান্স আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে।
ঐতিহাসিকরা এটাও বলেন যে, সেই চুক্তির মাধ্যমে মূলত জার্মানির এডলফ হিটলারের উত্থান হয়েছিল।
চলতি শতাব্দীতে অর্থাৎ, ২০২৬ সালের ১৭ জুন ভ�
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats