Tuesday, 30 June 2026
The News Diplomats
মিডল ইস্ট আই :
Publish : 10:43 AM, 30 June 2026.
Digital Solutions Ltd

ইরান যুদ্ধ যেসব কারণে আমেরিকা-ইসরায়েলের কৌশলগত বিপর্যয়

ইরান যুদ্ধ যেসব কারণে আমেরিকা-ইসরায়েলের কৌশলগত বিপর্যয়

Publish : 10:43 AM, 30 June 2026.
মিডল ইস্ট আই :

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাত শুরুর আগে বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তহীন যুদ্ধনীতির অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত নব্য রক্ষণশীল লেখক রবার্ট কাগান সতর্ক করেছিলেন, ইরানের সঙ্গে এই মুখোমুখি অবস্থান আধুনিক আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কৌশলগত পরাজয়গুলোর একটিতে পরিণত হতে পারে। তখন অনেকে তাঁর এই মূল্যায়নকে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ও অতিরঞ্জিত বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

কারণ, পশ্চিমা বিশ্বে প্রচলিত ধারণা ছিল—ইরান ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশটির সামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হানা হয়েছে, তাঁদের শীর্ষ নেতৃত্ব, জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার ও বিজ্ঞানীদের হত্যা করা হয়েছে, অর্থনীতি চাপে পড়েছে আর বিভিন্ন ফ্রন্টজুড়ে অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধ অক্ষও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কীভাবে ইরানের বিজয়ের কথা বলতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে এমন এক প্রশ্নের ওপর, যা নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যুদ্ধবিশেষজ্ঞ ও সামরিক ইতিহাসবিদেরা বিতর্ক করেছেন—বিজয়কে কীভাবে মাপা হবে? যদি যুদ্ধের ফলাফল বিচার করা হয় কে কতটা ধ্বংস ডেকে এনেছে তার ভিত্তিতে, তাহলে যাদের সামরিক শক্তি তুলনামূলক অনেক বেশি, তাদেরই প্রায় সব সময় বিজয়ী বলে মনে হবে। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ধ্বংস আর বিজয় এক বিষয় নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের বিশাল অংশ ধ্বংস করেছিল, কিন্তু নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। একইভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েই সরে যেতে হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রও আফগানিস্তানে দুই দশক ও ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল। কিন্তু তাদের প্রস্থানের কয়েক দিনের মধ্যেই তারা যে সরকার গড়ে তুলেছিল, সেটি ভেঙে পড়েছে। ইরাকে তারা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করেছে, সামাজিক কাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তীব্র প্রতিরোধের মুখে এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর অপমানজনকভাবে সরে যেতে হয়েছে।

প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সামরিক শক্তি ধ্বংস ডেকে আনতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক ফলাফল নিজের ইচ্ছেমতো নির্ধারণ করতে পারে না। সাম্প্রতিক ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষের সংঘাত বুঝতে এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই যুদ্ধ মূলত কখনোই পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে ছিল না। এটি কেবল ক্ষেপণাস্ত্র, নিষেধাজ্ঞা বা আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি ইরানের সমর্থন নিয়েও ছিল না।

এর কেন্দ্রে ছিল পশ্চিম এশিয়ার ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে লড়াই। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব এমন একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা সুসংহত করতে চেয়েছিল, যা ইসরায়েলি প্রাধান্য ও মার্কিন আধিপত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে। একই সঙ্গে তারা ইরানকে এমন নীতি ও জোট ত্যাগে বাধ্য করতে চেয়েছিল, যেগুলো ওই প্রকল্পের প্রধান বাধা হিসেবে ইরানকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। সে মানদণ্ডে বিচার করলে যুদ্ধের সমাপ্তি ইরানের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে হয়নি; বরং আমেরিকান-জায়নবাদী প্রকল্পের গভীর ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে হয়েছে।

নতুন এক আঞ্চলিক ব্যবস্থা

ইরানের বিজয় বোঝার জন্য প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপেরও আগে ফিরে যেতে হবে। ২০২৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর কল্পিত ‘নিউ মিডল ইস্ট’ বা নয়া মধ্যপ্রাচ্যের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি যে মানচিত্র প্রদর্শন করেছিলেন, সেখানে ফিলিস্তিনকে মুছে ফেলা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চলের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল যেন সেটি ইতিমধ্যে সমাধান হয়ে গেছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে তথাকথিত আব্রাহাম অ্যাকর্ডস, অর্থনৈতিক করিডর, প্রযুক্তিগত একীভবন এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের ওপর, যা ইসরায়েলকে পারস্য উপসাগর বা আরব উপসাগর এবং তার বাইরের অঞ্চলগুলোর সঙ্গে যুক্ত করবে।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডস ছিল কেবল শুরু।

ইসরায়েলের যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড কাঠামোয় অন্তর্ভুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তার এবং প্রস্তাবিত ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডর (আইএমইসি) ইঙ্গিত দিচ্ছিল এমন এক আঞ্চলিক ব্যবস্থার দিকে, যেখানে ইসরায়েল সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে প্রধান শক্তিতে পরিণত হবে।

মার্কিন আধিপত্যের উত্থান ও পতনের ইতিহাসমার্কিন আধিপত্যের উত্থান ও পতনের ইতিহাস

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে জায়নবাদী রাষ্ট্র অঞ্চলের বাকি সবাইকে নিরাপত্তা দেবে, ইরানকে বিচ্ছিন্ন করা হবে, ফিলিস্তিনকে আলোচনা থেকে নাই করে দেওয়া হবে এবং প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকে দুর্বল অথবা নির্মূল করা হবে। পুরো অঞ্চলকে পুনর্গঠন করা হবে মার্কিন শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় ইসরায়েলি প্রাধান্যের চারপাশে।

কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনাগুলো সেই কল্পনাকে ভেঙে দেয়।

এরপর যা ঘটেছে, তা শুধু গাজাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ ছিল না। এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে একটি আঞ্চলিক সংঘাত। গাজা, লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক এবং পরবর্তী সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের পাশাপাশি পশ্চিম তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলের প্রচেষ্টাও এই বৃহত্তর লক্ষ্যটির সঙ্গে যুক্ত ছিল। যে ফলাফল নেতানিয়াহু ও তাঁর জায়নবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী মিত্ররা ঠেকাতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেটিই যুদ্ধের সবচেয়ে নির্ধারক পরিণতিতে পরিণত হয়। ফিলিস্তিন আবার বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসে, আর ইরান সেই আঘাতের মধ্যেও টিকে থাকে, যার উদ্দেশ্য ছিল দেশটিকে ভেঙে ফেলা।

মার্কিন ও ইসরায়েলি কৌশলের বড় একটি অংশ এমন ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল যে, দীর্ঘস্থায়ী সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক যুদ্ধ, বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা, সাইবার অভিযান, লক্ষ্যভিত্তিক হত্যা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পতন ঘটাতে পারে অথবা কৌশলগত আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে পারে। বহু বছর ধরে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবে বিভিন্ন ধরনের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন বা পতনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কখনো সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে, কখনো অভ্যন্তরীণ ভাঙন, ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিভাজন, অর্থনৈতিক ক্লান্তি কিংবা সামাজিক অস্থিরতার মাধ্যমে।

এর কোনোটিই সফল হয়নি। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছিল, বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামো অটুট ছিল। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ চালিয়ে গেছে, কমান্ড কাঠামো কার্যকর ছিল, নেতৃত্বের উত্তরাধিকারপ্রক্রিয়াও কোনো কাঠামোগত অস্থিরতা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে এবং সরকারি মন্ত্রণালয়গুলো তাদের কাজ অব্যাহত রেখেছে। বহু বছর ধরে পশ্চিমা প্রচারযন্ত্র এবং ইসরায়েলি ‘হাসবারা’র (হলো একটি হিব্রু পরিভাষা, যার আক্ষরিক অর্থ বর্ণনা করা বা বোঝানো। এটি মূলত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জনসংযোগ, গণকূটনীতি এবং ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার একটি সুসংগঠিত সরকারি প্রচারণা কৌশল।) মাধ্যমে ইরানকে একটি অযৌক্তিক ধর্মতান্ত্রিক ‘শাসনব্যবস্থা’ হিসেবে তুলে ধরার যে ধারণা ও স্টেরিওটাইপ গড়ে তোলা হয়েছিল, তা শুধু অতিরঞ্জিতই নয়, কৌশলগতভাবেও ব্যয়বহুল প্রমাণিত হয়েছে।

নেতানিয়াহুর পতনেও ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি নিধনযজ্ঞ থামবে নানেতানিয়াহুর পতনেও ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি নিধনযজ্ঞ থামবে না

ইরান তার সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখেছে। এ ধরনের যুদ্ধ মূলত ভূখণ্ড দখলের জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ আদায়ের জন্য পরিচালিত হয়। তবু সংঘাতের তীব্রতা সত্ত্বেও কোনো আত্মসমর্পণ হয়নি, বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সমঝোতা হয়নি, ইসরায়েলি আধিপত্য মেনে নেওয়া হয়নি এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও পরিত্যাগ করা হয়নি।

পরাজয়ের সূচক

যে লক্ষ্য সামনে রেখে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা যে রূপ নিয়েছে, এই দুইয়ের বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হওয়া সম্ভব নয়। যুদ্ধ শুরু হয়েছিল এমন সব দাবির মাধ্যমে, যা কার্যত কৌশলগত আত্মসমর্পণের সমতুল্য ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা গিয়ে দাঁড়ায় এমন আলোচনায়, যেখানে সংকটের শুরু থেকেই ইরান যে অবস্থান ধরে রেখেছিল, বাস্তবে তার অনেকটা মেনে নেওয়া হয়।

পুরো সংঘাতজুড়ে তেহরান একটি উল্লেখযোগ্যভাবে স্থিতিশীল অবস্থান বজায় রেখেছে—আগ্রাসন বন্ধ না হলে কূটনীতি এগোতে পারে না। জবরদস্তিমূলক কূটনীতির যুক্তি বলে, সামরিক চাপ আলোচনায় সুবিধা এনে দেয়। কিন্তু ইরান কার্যত সেই সমীকরণ উল্টে দেয় এবং জানিয়ে দেয়, অর্থবহ আলোচনা শুরু হওয়ার আগে চাপ প্রয়োগই বন্ধ করতে হবে। সংঘাত যত এগিয়েছে, ওয়াশিংটন ততই শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার বদলে কূটনৈতিক বেরিয়ে আসার পথ খুঁজেছে।

এই অবস্থান পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং আলোচনার টেবিলে দেখা যায়।

ইসলামাবাদে পৌঁছানো সমঝোতা স্মারক যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক সর্বোচ্চ চাপভিত্তিক অবস্থান থেকে কতটা সরে এসেছে, তা প্রকাশ করে। কোনো পরাজিত রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শর্তের মতো না হয়ে, এই নথিতে ইরানকে এমন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যার সহযোগিতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি।

ইরানসহ আঞ্চলিক জোটই কি ইসরায়েলকে ঠেকানোর একমাত্র পথইরানসহ আঞ্চলিক জোটই কি ইসরায়েলকে ঠেকানোর একমাত্র পথ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমঝোতা স্মারকের প্রধান অগ্রগতির অংশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্রদের সব ফ্রন্টে, লেবাননসহ, সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি। এটি সরাসরি রাজনৈতিকভাবে যুদ্ধের আঞ্চলিক চরিত্রকে স্বীকৃতি দেয় এবং পরোক্ষভাবে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’কে কৌশলগত সমীকরণের অংশ হিসেবে মেনে নেয়। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব দীর্ঘদিন ধরে প্রতিটি ফ্রন্টকে আলাদা করে দেখার চেষ্টা করেছে। গাজাকে লেবানন থেকে, লেবাননকে ইরান থেকে এবং ইরানকে বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিরোধ নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে। ইরান বিপরীত অবস্থান নেয়: যুদ্ধ শেষ করতে হলে সব ফ্রন্টেই তা শেষ হতে হবে, শুধু ইরানের বিরুদ্ধে নয়।

যদি এই ধারা কার্যকর থাকে, তাহলে এটি ইরানের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ, এটি লেবাননের নিরাপত্তা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক ফ্রন্টকে মার্কিন-জায়নবাদী আগ্রাসনের অবসানের সঙ্গে যুক্ত করছে। এই ব্যবস্থায় গাজা কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরান বলছে গাজাও এর অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা এখনো সেই ব্যাখ্যা মেনে নিতে অনীহা দেখাচ্ছে।

গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই নথিতে উভয় পক্ষ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছে।

ইরানে ১৯৫৩ সালে মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পর থেকে, বিশেষ করে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর, ওয়াশিংটন বারবার নিষেধাজ্ঞা, নাশকতা, গোপন অভিযান, রাজনৈতিক চাপ এবং অস্থিতিশীলতামুখী শক্তিকে সমর্থনের মাধ্যমে ইরানের অভ্যন্তরীণ গতিপথ প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। ফলে আন্তঃহস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি, যদি আন্তরিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা কয়েক দশকের ‘রেজিম চেঞ্জ’ নীতি থেকে নাটকীয় পশ্চাদপসরণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

এর অর্থ হলো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়া, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা দুর্বল করা বা রাষ্ট্রীয় পতন ঘটানোর চেষ্টা এই চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। একটি বড় সামুদ্রিক ছাড়ের অংশ হিসেবে, সমঝোতা স্মারকে ওয়াশিংটনকে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা সরানো এবং ধীরে ধীরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এই কাঠামো ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মাইন অপসারণ, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে ওমান ও অন্যান্য উপকূলীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা নিয়ে আলোচনা।

উল্টে যাওয়া বাস্তবতা

অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্লস বা শর্তগুলো এই পশ্চাদপসরণের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। ইরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করার বদলে, এই চুক্তিতে পুনর্গঠন সহায়তা, অর্থনৈতিক একীভূতকরণ, নিষেধাজ্ঞা শিথিল, পুনরায় তেল রপ্তানি, জব্দ করা সম্পদে প্রবেশাধিকার, ব্যাংকিং ও বীমা খাতে ছাড় এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সমঝোতা স্মারকে ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে ফেলতে বা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করতে বলা হয়নি।

ট্রাম্পের ইউ-টার্নে নেতানিয়াহুর অজেয় ও গ্রেটার ইসরায়েলের স্বপ্নে ফাটলট্রাম্পের ইউ-টার্নে নেতানিয়াহুর অজেয় ও গ্রেটার ইসরায়েলের স্বপ্নে ফাটল

ইরান দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র চায় না। তবে সমৃদ্ধকরণ এবং পারমাণবিক উপাদানসংক্রান্ত প্রশ্নগুলো আত্মসমর্পণমূলক শর্ত নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। ইরানকে লিবীয় মডেল গ্রহণে, অবকাঠামো ধ্বংসে বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ত্যাগে বাধ্য করা হয়নি।

এই চুক্তিতে আলোচনার সময় নতুন নিষেধাজ্ঞা ও অতিরিক্ত সামরিক মোতায়েনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে আলোচনা চলাকালে ওয়াশিংটনের উত্তেজনা বাড়ানোর সক্ষমতা সীমিত হয়েছে। জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্তির সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদনের সম্ভাবনা পুরোনো ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকেও সীমিত করতে পারে।

যদি লিখিতভাবে এটি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি ইরানের প্রতি সাম্প্রতিক মার্কিন নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পশ্চাদপসরণগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হবে। অতএব, এই সমঝোতা স্মারক কেবল একটি কূটনৈতিক নথি নয়। এটি মার্কিন-জায়নবাদী কৌশলের পরাজয়ের সূচক।

যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ইরানের আত্মসমর্পণের দাবি দিয়ে। আর শেষ হয়েছে যুদ্ধ বন্ধ করা, সার্বভৌমত্বকে সম্মান করা, অবরোধ তুলে নেওয়া, বাহিনী প্রত্যাহার করা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল নিয়ে আলোচনা, তেল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া, সম্পদ মুক্ত করা এবং রাষ্ট্রকে খণ্ডিত না করে পারমাণবিক প্রশ্নে আলোচনার মার্কিন প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে।

আর ঠিক এ কারণেই জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা এবং তাদের সমর্থকেরা এর বিরোধিতা এত তীব্রভাবে করেছে। নেতানিয়াহুর জন্য এই সমঝোতা স্মারক এক কৌশলগত বিপর্যয়। তিনি বারবার সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে চেয়েছেন এবং আলোচনাকে ভেস্তে দিতে লেবাননকে কার্যকর উপায় হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই কৌশল গিয়ে ধাক্কা খায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে।

আলোচনা যখন এগোতে থাকে, তখন ইরান দেখিয়ে দেয় যে তারা আলোচনাকে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তারা ইঙ্গিত দেয়, লেবাননে নতুন করে উত্তেজনা বাড়লে তা আরও বিস্তৃত প্রতিশোধমূলক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে, বিশেষ করে উত্তর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। সেই মুহূর্তে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে কঠিন এক সিদ্ধান্ত এসে দাঁড়ায়। তারা হয় নেতানিয়াহুর সংঘাত �

USA/CANADA বিভাগের অন্যান্য খবর

News Diplomats Icon

Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com

The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.

©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats

Develop by _ DigitalSolutions.Ltd
শিরোনাম ইরানের বিদায়ে ‘হ্যাপি ড্যান্স’ করে আলোচনায় মার্কিন মন্ত্রী মুলিন শিরোনাম অ্যান্ডি বার্নহাম যুক্তরাজ্যের মুসলিমদের আস্থা কি ফিরিয়ে আনতে পারবেন? শিরোনাম ইরান যুদ্ধ যেসব কারণে আমেরিকা-ইসরায়েলের কৌশলগত বিপর্যয় শিরোনাম সহযোগিতা ও কাঠামোগত উন্নয়ন অংশীদারত্বকে আরও গভীর করেছে শিরোনাম হাসিনার সাক্ষাতকার রিপ্রিন্টে সংবাদ মাধ্যমকে সতর্ক করবেন জাহেদ শিরোনাম প্যারাগুয়ের বিপক্ষে জার্মানির বাতিল হওয়া গোল নিয়ে তীব্র বিতর্ক