Tuesday, 30 June 2026
The News Diplomats
দুলাল আহমদ চৌধুরী :
Publish : 02:28 PM, 29 June 2026.
Digital Solutions Ltd

ইতিহাসের দায় নিয়ে হঠাৎ বিএনপির হার্ডলাইন বনাম জামায়াতের কৌশল

ইতিহাসের দায় নিয়ে হঠাৎ বিএনপির হার্ডলাইন বনাম জামায়াতের কৌশল

Publish : 02:28 PM, 29 June 2026.
দুলাল আহমদ চৌধুরী :

জামায়াতে ইসলামীর অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে জাতীয় সংসদে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। সেই বিতর্ক হলো—মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির রাজনৈতিক দায় এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি। অপরদিকে জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের সংসদে বক্তব্যে ‘জামায়াত নিষিদ্ধ’ এবং ‘শূন্যস্থান পূরণ’  নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনে রাজনৈতিক মহলে অনেক প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীর জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল। তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে দলটির অবস্থান স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এই বক্তব্য নিছক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ নয়; বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের একটি জাতীয় প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি।

একইভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ১৯৭১ সালে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল—এ বিষয়ে ইতিহাস, গবেষণা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় বহু তথ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইতিহাসের যে অংশ সুবিধাজনক নয়, তা ভুলে গেলে ইতিহাস পরিবর্তন হয় না।

হঠাৎ করে বিএনপি তার দীর্ঘদিনের আন্দোলন, সংগ্রাম ও সরকারের সঙ্গী জামায়াতে ইসলামের বিরুদ্ধে কেন হার্ডলাইনে, এই প্রশ্ন রাজনৈতিক মহলে এখন আলোচনার খোরাক। অবশ্য সোমবার জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষের মাঝখানে জামায়াত এবং এনসিপি প্রধানসহ জামায়াতের নেতারা এগিয়ে এসে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনির্ধারিত কথা বলার সময় ‘বডি লেঙ্গুয়েজ’ বিএনপি মহাসচিব এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিফলন হিসাবে দেখছেন অনেকেই।  

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি জাতির অস্তিত্বের সংগ্রাম। সেই যুদ্ধে একদিকে ছিল স্বাধীনতার পক্ষের জনগণ, অন্যদিকে ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের সহযোগী বাহিনী—রাজাকার, আলবদর ও আলশামস। এই অধ্যায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি। ফলে এই ইতিহাসকে অস্বীকার বা অস্পষ্ট করার যেকোনো প্রচেষ্টা নতুন প্রজন্মের সামনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে বলা হয়, তারা বর্তমান রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ধারায় বিশ্বাসী। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন হলো—দলটি কি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭১ সালের অবস্থানের জন্য জাতির কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে? যদি না করে থাকে, তাহলে সেই নৈতিক দায় থেকে মুক্তি কীভাবে সম্ভব? পৃথিবীর বহু দেশে অতীতের ভুলের জন্য রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দল ক্ষমা চেয়ে নতুন আস্থা তৈরি করেছে। বাংলাদেশেও এমন একটি উদ্যোগ জাতীয় পুনর্মিলনের পথে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারত।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে জামায়াত ও এনসিপির এগ্রেসিভ ভুমিকায় উদ্বেগের কিছু দিক স্পষ্ট হয়েছে। বিএনপি সরকার গঠন করে কার্যক্রম শুরু করতে না করতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুরুচিপূর্ণ ভাষা, গুজব ও অপপ্রচার এখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার, বিরোধী দল কিংবা যে-ই হোক—গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মতবিরোধ থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করা বা বিদ্বেষ ছড়িয়ে জনগণকে বিভক্ত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী সময়েও দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, ভাস্কর্য কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনা ভাঙচুর ও গুড়িয়ে দেয়া নিয়ে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশ। তাই এ ইতিহাস সংরক্ষণ করা রাষ্ট্র, সমাজ এবং সব রাজনৈতিক শক্তির যৌথ দায়িত্ব।

বর্তমান সময়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব। নতুন দল বা নতুন নেতৃত্ব গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে কোনো রাজনৈতিক জোট বা সমঝোতা যেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সংবিধানের মৌলিক চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে অস্পষ্টতা সৃষ্টি না করে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন রাজনীতির অর্থ অতীতের ইতিহাসকে অস্বীকার করা নয়; বরং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও দায়িত্বশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা।

বিএনপি বর্তমানে জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব শুধু অর্থনীতি বা প্রশাসন পরিচালনা নয়; একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা, জাতীয় ঐক্য এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করা। সরকারের সমালোচনা থাকবে, বিরোধী দলও থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রের ভিত্তি নিয়ে কোনো দ্ব্যর্থতা থাকা উচিত নয়।

আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, বরং সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চা, গণতান্ত্রিক সহনশীলতা এবং জাতীয় স্বার্থে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ। ইতিহাসের দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। রাজনৈতিক দল বদলাতে পারে, নেতৃত্ব বদলাতে পারে, কিন্তু ১৯৭১-এর সত্য বদলায় না। যারা বাংলাদেশের রাজনীতি করবে, তাদের সবারই উচিত স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম অস্তিত্বের প্রশ্নে স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন ও দায়িত্বশীল অবস্থান গ্রহণ করা। সেটিই হবে জাতির প্রতি প্রকৃত সম্মান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, রাষ্ট্রীয় পরিচয় এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য কতটা সুরক্ষিত ছিলো—এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন মহলে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ, সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত ও অবস্থান এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যেখানে স্বাধীনতাবিরোধী অতীত নিয়ে বিতর্কিত শক্তিগুলো আগের তুলনায় অধিক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিসরে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। অন্যদিকে সরকারের সমর্থকদের বক্তব্য, তারা একটি প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। এই দুই বিপরীত অবস্থানের মধ্যে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আওয়ামী লীগকে ঘিরে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে আওয়ামী লীগের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, দীর্ঘ শাসনামলে দলটির বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম-খুন, দুর্নীতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার মতো গুরুতর অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। এসব অভিযোগের বিচার ও রাজনৈতিক জবাবদিহি হওয়া উচিত আইনের শাসনের ভিত্তিতে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জনগণের উপর বিচারের ভার না ছেড়ে আইন করে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে  নিষিদ্ধ করার সমালোচনাও এখন বেশ প্রখর হচ্ছে।

একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই কি দলটিকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে রাজনীতি ও নির্বাচন থেকে দূরে রাখা গণতান্ত্রিক সমাধান? নাকি আইন অনুযায়ী অপরাধের দায় ব্যক্তির ওপর নির্ধারণ করে জনগণের রায়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সুযোগ অব্যাহত রাখা অধিকতর গ্রহণযোগ্য পথ? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি দলের ভবিষ্যৎ নয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা বলে, শক্তিশালী রাজনৈতিক দলকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দীর্ঘ সময়ের জন্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার চেষ্টা প্রায়ই রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও তীব্র করে। অন্যদিকে, আইনের শাসন নিশ্চিত করে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া গণতন্ত্রকে অধিকতর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়।

বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎও সম্ভবত সেই পথেই অধিক নিরাপদ, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হবে না, স্বাধীনতার মৌলিক চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ হবে না, আবার কোনো রাজনৈতিক দল আইনের ঊর্ধ্বেও থাকবে না। ইতিহাসের বিচার আদালত করবে, রাজনৈতিক বিচারের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকবে জনগণের হাতে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভ্রান্তির রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে রাজনৈতিক সংঘাতের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হলেও, সেই স্বাধীনতার আড়ালে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, কুরুচিপূর্ণ ভাষা, চরিত্রহনন এবং যাচাইহীন তথ্য প্রচারের সংস্কৃতি কোনো গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য ইতিবাচক হতে পারে না।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্রূপাত্মক উপস্থাপন এবং অশালীন ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ জনপরিসরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত এবং সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে যাচাইহীন তথ্য, গুজব কিংবা বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা ছড়িয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ানোর অভিযোগও বিভিন্ন মহল থেকে উত্থাপিত হয়েছে। জামায়াতের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের নেতাদের নির্বাচন নিয়ে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বক্তব্য এমনকি সামজিক মাধ্যমে নাম-পরিচয়হীন একাউন্ট থেকে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে নোংরা ভাষায় অপপ্রচার করা হয়।   

গণতন্ত্রে সরকারের সমালোচনা অবশ্যই থাকবে; বিরোধী দলের দায়িত্বই হলো সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা। কিন্তু সমালোচনা ও অপপ্রচারের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি করা হয়, তাহলে তার ক্ষতি কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়; বরং পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপরই পড়ে। নির্বাচন নিয়ে মতবিরোধ থাকতে পারে, নির্বাচন কমিশনের সমালোচনাও হতে পারে, কিন্তু সেই সমালোচনা হওয়া উচিত তথ্য, প্রমাণ এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভাষার ভিত্তিতে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু ক্ষমতায় যাওয়া নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ভিন্নমত থাকবে কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না, প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু শত্রুতা নয়, সমালোচনা থাকবে কিন্তু অসত্য প্রচারণা নয়। কারণ রাজনৈতিক ভাষা যত বিষাক্ত হবে, গণতন্ত্রের পরিবেশও তত সংকুচিত হবে। আর গণতন্ত্র দুর্বল হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র, জনগণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

ঐক্যের আহ্বান নাকি অতীতের দায় এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল?

জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য ছিল পরিমিত, সংযত এবং আপাতদৃষ্টিতে সমঝোতামূলক। তিনি সরকারি ও বিরোধী দলকে সংসদের "দুই চাকা" হিসেবে অভিহিত করে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। রাজনৈতিক সৌজন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বক্তব্য ইতিবাচক বলেই বিবেচিত হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঐক্যের এই আহ্বান কি অতীতের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি সৎ মূল্যায়নের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, নাকি সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের কৌশল?

লক্ষ করার বিষয়, সংসদে সরকারি দলের পক্ষ থেকে যে মূল প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হয়েছিল—১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা, স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান, রাজাকার-আলবদর বাহিনীর সঙ্গে দলটির ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং এ বিষয়ে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন—সেসব বিষয়ে জামায়াত আমির সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। বরং তিনি রাজনৈতিক সৌহার্দ্য, পারস্পরিক সম্মান এবং সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। ফলে সমালোচকদের কাছে প্রশ্ন থেকেই যায়, ইতিহাসের মূল বিতর্ক অমীমাংসিত রেখে কেবল ঐক্যের আহ্বান কতটা কার্যকর হতে পারে?

অবশ্য এক্ষেত্রে বিএনপি প্রশংসার দাবিদার, তারা জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইনে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী বা দেশীয় রাজাকার হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নাম সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছে। জামুকা আইনটি পাসের সময় জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রথমে আপত্তি, পরে অনেকটা আবদারের সুরেও নামটা বাদ দিতে অনুরোধ করা হয়েছিলো। কিন্তু ইতিহাস বিকৃতির দায় নিতে চায়নি সরকার। পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলগুলোর নাম বহাল রেখেই তারা সংসদে আইনটি করে।

আরও একটি বিষয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ডা. শফিকুর রহমান তাঁর বক্তব্যে বহু মুক্তিযোদ্ধা, জাতীয় নেতা ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্ব, স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম তাঁর বক্তব্যে অনুপস্থিত ছিল। এটি নিছক একটি রাজনৈতিক পছন্দের বিষয় হতে পারে, আবার সমালোচকদের দৃষ্টিতে এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার একটি প্রচেষ্টার অংশ বলেও বিবেচিত হতে পারে। তারা মনে করেন, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার অপশাসন, গুম-খুন নিয়ে বিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্ঠা গ্রহণযোগ্য হবে না।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে নানা রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব—সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিল তাঁর ভূমিকা। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যান্য অধ্যায় তুলে ধরা হলেও এই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বসহ ১১ জন সেক্টর কমান্ডারকে উপেক্ষা করা হলে ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ চিত্র উপস্থাপিত হয় না।

লক্ষণীয় যে, সংসদের ভেতরে সংযত ও সমঝোতামূলক ভাষা ব্যবহার করা হলেও সংসদের বাইরে রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই তীব্র সংঘাতমুখী বক্তব্য, সিনিয়র রাজনৈতিক নের্তৃবৃন্দ সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ আক্রমণাত্মক, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং কঠোর ভাষার ব্যবহার দেখা যায়। ফলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশের প্রশ্ন—সংসদে উচ্চারিত ঐক্যের ভাষা এবং মাঠের রাজনীতির ভাষার মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যায়, সেটি কি কৌশলগত, নাকি রাজনৈতিক অবস্থানের প্রকৃত পরিবর্তনের প্রতিফলন?গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ঐক্য অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই ঐক্য হতে হবে সত্য, ইতিহাস ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। অতীতের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকে এড়িয়ে গিয়ে নয়, বরং সেগুলোর মুখোমুখি হয়ে সৎ মূল্যায়নের মাধ্যমেই একটি টেকসই জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব। অন্যথায় ঐক্যের আহ্বান রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় শোনালেও তা জাতীয় আস্থার সংকট দূর করতে সক্ষম নাও হতে পারে।

OPINION বিভাগের অন্যান্য খবর

News Diplomats Icon

Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com

The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.

©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats

Develop by _ DigitalSolutions.Ltd
শিরোনাম ইরানের বিদায়ে ‘হ্যাপি ড্যান্স’ করে আলোচনায় মার্কিন মন্ত্রী মুলিন শিরোনাম অ্যান্ডি বার্নহাম যুক্তরাজ্যের মুসলিমদের আস্থা কি ফিরিয়ে আনতে পারবেন? শিরোনাম ইরান যুদ্ধ যেসব কারণে আমেরিকা-ইসরায়েলের কৌশলগত বিপর্যয় শিরোনাম সহযোগিতা ও কাঠামোগত উন্নয়ন অংশীদারত্বকে আরও গভীর করেছে শিরোনাম হাসিনার সাক্ষাতকার রিপ্রিন্টে সংবাদ মাধ্যমকে সতর্ক করবেন জাহেদ শিরোনাম প্যারাগুয়ের বিপক্ষে জার্মানির বাতিল হওয়া গোল নিয়ে তীব্র বিতর্ক