বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান, সংস্কার, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ তাদের ওয়েবসাইটে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে। “বাংলাদেশ’স আনফিনিশড রেভোল্যুশন’’ শিরোনামে এই প্রবন্ধ লিখেছেন অবিনাশ পালিওয়াল। নিজউ ডিপ্লোমেটস পাঠকদের জন্য লেখাটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো। (নিউজের শেষ অংশ)
উপসাগরীয় যুদ্ধের ধাক্কা
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। এটি তাঁর সরকারের জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও গুরুতর সংকট তৈরি করে।
তেলের দাম বেড়ে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ঢাকা এখন সার আমদানির জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ব্রুনেইয়ের দিকে ঝুঁকছে, যাতে সম্পূর্ণ ফসলহানি এড়ানো যায়।
উচ্চ পরিবহন ব্যয়ের কারণে বছরের শেষের দিকে চালের দাম ৮ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদি জুলাইয়ের মধ্যে, অর্থাৎ ধান চাষের মৌসুম শুরু হওয়ার আগে সার মজুত আবার পূরণ না করা যায়, তাহলে বাংলাদেশে চাল উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ কমে যেতে পারে।
পরিস্থিতি এতটাই সংকটপূর্ণ যে গ্যাসের ঘাটতি কমাতে সরকার ২০২৬ সালের মার্চে কয়েকটি সার কারখানা বন্ধ করে দেয়। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশ জোগান দেয়। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বড় শিল্প খাত টেক্সটাইল উৎপাদন অনেক কমে গিয়ে মাত্র ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় চলতে থাকে।

অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা একটি দেশের জন্য এই পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে। ঢাকার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও এই যুদ্ধ বিএনপির অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও তারেক রহমানের হাতে একটি পূর্ণ মেয়াদ রয়েছে এবং তিনি পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য পুনর্নির্বাচন নিশ্চিত করতে চান।
এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ থাকা, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও শাসন পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিএনপির একক হাতে থাকা—সব মিলিয়ে দলটির আধিপত্য আরও শক্তিশালী করছে। যদি বিএনপি জ্বালানি ও সার সংকটকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শেষ না করে সামলাতে পারে, তাহলে তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু যদি তারা ব্যর্থ হয় এবং অর্থনৈতিক চাপ রাজনৈতিক অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে, তাহলে বিএনপি আরও কঠোর বা আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়ার দিকে ঝুঁকতে পারে।
১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর দলটি অবশ্যই এক মেয়াদেই ক্ষমতা হারাতে চাইবে না এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে সব ধরনের চেষ্টা করবে। যদিও বর্তমানে রাজনৈতিক ভুলের ঝুঁকি সীমিত, তবু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঝুঁকি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে।
নয়া দিল্লি, নয়া সম্পর্ক
বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি অনেক ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার নীতির মতোই, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলের ইঙ্গিত দেয়। দলটি এখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে এবং ভারতের সঙ্গে আবারও শক্তিশালী রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে। তবে হাসিনার বিপরীতে বিএনপি পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক বজায় রাখছে।
নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার মাধ্যমে বিএনপি তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তারা একসময় হাসিনা ও ভারতের ঘনিষ্ঠতার বিরোধিতা করত। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভারত হাসিনার ওপর অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশের অনেক মানুষ মনে করত, ভারত একজন বেসামরিক স্বৈরশাসককে সমর্থন করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ তাদের মধ্যে দলগত পর্যায়ে একটি বোঝাপড়া তৈরি করে। এই দলীয় বোঝাপড়া ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত করতে সাহায্য করে। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং আস্থা ব্যাপকভাবে ভেঙে পড়ে, যখন ভারতের দৃঢ়ভাবে হাসিনাকে সমর্থন করার বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলা যায়, বর্তমানে বিএনপি-বিজেপি সম্পর্ক অনেকটা আওয়ামী লীগ-ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (আইএনসি) সম্পর্কের মতোই গড়ে উঠছে। অর্থাৎ পারস্পরিক আস্থা ও ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগোচ্ছে। আসলে বিএনপি ভারতের বিজেপির শাসন মডেল অনুসরণ করতে চায়, যেখানে বিজেপি ২০১৪ সাল থেকে একক দল হিসেবে ক্ষমতায় আধিপত্য বজায় রেখেছে এবং বিরোধীদের দুর্বল ও বিভক্ত করে রেখেছে। এ কারণেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা দিনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এটি খুবই অস্বাভাবিক মনে হলেও নয়াদিল্লি জানিয়েছে যে তারা শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ঢাকার অনুরোধ বিবেচনা করছে। বিএনপি ও বিজেপি উভয়ই দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ভুল-বোঝাবুঝির সুযোগ কমাতে চায়। তারা যৌথভাবে নিশ্চিত করতে চায়, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতির অংশ হলেও নিয়ন্ত্রিত একটি শক্তি হিসেবে থাকুক।
আদর্শগতভাবে দেখলে, বিএনপির রক্ষণশীল সেক্যুলারিজম (যা বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুর অধিকার স্বীকার করে) বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদের সঙ্গে একটি গ্রহণযোগ্য সংযোগের ভিত্তি তৈরি করে। এই বিএনপি-বিজেপি বোঝাপড়াই ২০২৬ সালের এপ্রিলে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্যকে বাড়তে না দিয়ে সম্পর্ককে আবারও অস্থির হওয়া থেকে রক্ষা করে।
বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে এক অভূতপূর্ব জয় পায় এবং আসামে তাদের শক্ত ঘাঁটি বজায় রাখে। বর্তমানে মিজোরাম বাদে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী সব ভারতীয় রাজ্যে বিজেপি হয় সরকারে নেতৃত্ব দিচ্ছে, নয়তো সরকারে অংশীদার।
তবে দলগত পর্যায়ের এই বোঝাপড়া দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো (যেমন সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, আন্তরাজ্য যোগাযোগ, নদীর পানিবণ্টন এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যঘাটতি) সমাধান করতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
তবে এসব অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা দেখায় যে হাসিনার সময়কার কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি থেকে বাংলাদেশের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা আবার দেশের কাঠামোগত বাস্তবতার শক্তিশালী টানেও আংশিকভাবে ফিরে আসছে।
উপসংহার
২০২৪ সালের জুলাইয়ের অস্থিরতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন করেনি। বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই পুরোনো বৈশিষ্ট্যগুলো আবারও স্পষ্টভাবে ফিরে এসেছে। ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাই একটি ব্যতিক্রম ছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশকে আবারও তার পরিচিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভারসাম্যে ফিরিয়ে এনেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে, তা আগামী দিনে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও আন্দোলন ঘটাতে পারে। এটা তারেক রহমানের সরকারের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা। তিনি সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব অর্থনৈতিক উন্নতি আনতে পারেন কি না, সেটি তাঁকে প্রমাণ করতে হবে। এই চাপ তিনি কতটা ভালোভাবে সামলাতে পারেন, তাঁর ওপর শুধু বিএনপির ভবিষ্যৎই নয়; বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাও নির্ভর করবে। দেশটি বাইরের ধাক্কা মোকাবিলা করতে পারবে, নাকি সেই ধাক্কায় দুর্বল হয়ে পড়বে, তা-ও তাঁর ওপর নির্ভর করবে।
অবিনাশ পালিওয়াল, কার্নেগি সাউথ এশিয়া প্রোগ্রামের নন-রেসিডেন্ট স্কলার। তিনি লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রিডার। তাঁর গবেষণার বিষয় দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তানীতি ও কৌশলগত বিষয়াবলি।
*মতামত লেখকের নিজস্ব
**মূল ইংরেজি লেখার লিংক: https://carnegieendowment.org/research/2026/05/bangladeshs-unfinished-revolution
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats