দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ১০০ দিনেই কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতির মুখে পড়েছে নতুন বিএনপি সরকার। একদিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ, অন্যদিকে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা—এর যাঁতাকলে পড়ে দেশের ভেতরে জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে।
ক্ষমতায় এসে বড় ধরনের সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হলেও বৈশ্বিক সংকটের কারণে সরকারকে শুরুতেই কূটনৈতিকভাবে সংকট সামাল দেওয়ার দিকে মনোযোগ দিতে হয়েছে।
যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অস্থিরতায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়ে। কারণ বাংলাদেশ জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সার আমদানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসীর মতে, সরকারের প্রথম কাজ ছিল বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি আমদানি স্থিতিশীল রাখা। স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিয়ে হলেও সরকার প্রাথমিক জ্বালানি সংকট সামাল দিতে পেরেছে।
একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের এই অস্থিরতা মধ্যপ্রাচ্যে থাকা লাখ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেক শ্রমিক চাকরি হারানোর কথা বলছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আমেনা মহসিন বলেন, বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক সংকটের সময় প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কোনো শক্ত পরিকল্পনা নেই—এই সংকট তা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এই যুদ্ধে কঠোর কোনো অবস্থান নেয়নি, বরং উদ্বেগ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সেই সম্পর্ক আবার জোড়া লাগে। বর্তমান বিএনপি সরকারও সেই ধারা বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের করা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (আরটিএ), ১৪টি বোয়িং বিমান কেনা এবং বড় একটি গ্যাস চুক্তির মতো সিদ্ধান্তগুলো বর্তমান সরকার বহাল রেখেছে। তবে বাণিজ্য চুক্তিটি (আরটিএ) নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত বাংলাদেশকে চাপে ফেলতে পারে বলে সমালোচকরা মনে করেন।
আমেনা মহসিনের মতে, চুক্তিটি বাংলাদেশকে কিছুটা ‘নির্ভরশীল অবস্থানে’ নিয়ে যেতে পারে। তাই এটি সংসদে আলোচনা ও পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
তবে পারভেজ করিম আব্বাসীর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় সরকারের এই অবস্থান বাস্তবসম্মত। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে বাংলাদেশের বড় উদ্বৃত্ত রয়েছে।
একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সম্পর্কও বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পর জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে ইইউর সমর্থন প্রয়োজন। ইউরোপের দেশগুলো বছরে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশি পণ্য আমদানি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ—উভয় পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। ইতোমধ্যে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ইউরোপের কিছু মহল প্রশ্ন তুলেছে, কারণ এয়ারবাসের প্রস্তাব এখনো ঝুলে আছে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে তাতে কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত মিলেছে। তবে উত্তেজনাও পুরোপুরি কমেনি।
লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম শফিউল্লাহ বর্তমান বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারতের প্রথম দিকের যোগাযোগকে উষ্ণ (ইতিবাচক) হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চীন সফরের আগে প্রথম বড় দ্বিপক্ষীয় সফর করেন ভারতে। তবে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারণায় বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়। এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানাতে ঢাকা ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার পবন ভাদেকে তলব করে। অন্যদিকে ভারত অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
এম শফিউল্লাহর মতে, তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি এবং গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কের বড় পরীক্ষা হবে।
আমেনা মহসিন মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে, কারণ এখন দিল্লি ও কলকাতা—দুই জায়গাতেই বিজেপি ক্ষমতায়।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ধরে রেখেছে বিএনপি সরকার। বাংলাদেশের অবকাঠামো ও উন্নয়ন খাতে সবচেয়ে বড় অংশীদার চীন।
তবে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প ভবিষ্যতে সংবেদনশীল ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সাবেক সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শফিউল্লাহ সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশ যদি চীনের সঙ্গে (এই প্রকল্পে) এগোয়, তবে ভারত উজানে আরও পানি সরিয়ে নিতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।
এ মুহূর্তে ঢাকা কোনো একক শক্তি বলয়ের দিকে ঝুঁকে না পড়ে সবার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকের প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য কতটা কার্যকরভাবে বিএনপি সরকার ধরে রাখতে পারবে তা এখনো অস্পষ্ট।
অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন
পররাষ্ট্রনীতির একটি দৃশ্যমান দিক হলো—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদের প্রচারণার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘন ঘন বিদেশ সফর। সমর্থকরা মনে করছেন, এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়বে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, দেশের এই অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে দ্বিপাক্ষিক ও অর্থনৈতিক কূটনীতি বাদ দিয়ে এমন 'মর্যাদার কূটনীতিতে' অতিরিক্ত সময় দেওয়া কতটা যৌক্তিক?
নীতি এখনো চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায়
বিশ্লেষকরা বলছেন, ১০০ দিন কোনো সরকারের পররাষ্ট্রনীতি মূল্যায়নের জন্য খুব অল্প সময়। তবে ইতোমধ্যে একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। সরকার এখন আন্তর্জাতিক মহলে আস্থা ফেরাতে, বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে এবং আদর্শগত রাজনীতির চেয়ে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
আমেনা মহসিনের ভাষায়, বাংলাদেশ এখন আঞ্চলিক রাজনীতিতে ‘দিল্লি নয়, রাওয়ালপিন্ডিও নয়’—এমন এক সমদূরত্বের নীতি অনুসরণ করার চেষ্টা করছে।
তবে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রবাসীদের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা এবং কূটনৈতিক ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মতো বড় বড় ইস্যুগুলো এখনো খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, রপ্তানি, প্রবাসী কল্যাণ, জলবায়ু কূটনীতি ও বিদেশি বিনিয়োগের স্বার্থ রক্ষায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরও দক্ষ, সমন্বিত ও পেশাদার করে তুলতে হবে।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats