অবিশ্বাস্য এক আইপিএল মৌসুম কাটিয়েছেন বৈভব সূর্যবংশী: রয়টার্স
১৫ বছর বয়সী এক কিশোর কাঁদছে। এই বয়সী কারও কান্নার নানা কারণ থাকতে পারে। কেউ পরীক্ষায় অঙ্কে কম নম্বর পেয়ে কাঁদতে পারে, কেউ কাঁদতে পারে প্রথমবারের মতো কাউকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে কিংবা কেউ বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া করেও কাঁদতে পারে। গতকাল রাতেও এক কিশোর কেঁদেছে। যদিও বাকিদের কান্নার চেয়ে এই কিশোরের কান্নার পার্থক্যটা বিশাল। তাঁর কান্না গতকাল রাতে ছুঁয়ে গেছে লাখো ক্রিকেটপ্রেমীর মন।
সেই কান্নার দৃশ্য টেলিভিশন পর্দা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখানোর পরপর ভাইরাল হয়েছে। অনেককে আফসোসও করতে দেখা গেছে। ব্যাট হাতে রুদ্রমূর্তি ধারণ করা ছেলেটির হাতে এবারের আইপিএল ট্রফিটা উঠতে পারত। শিরোপা জিততে না পারার আফসোস থাকবে, কিন্তু এই কান্নার দৃশ্য জন্ম দেওয়ার আগে বৈভব সূর্যবংশী নামের এই কিশোর যা করেছেন, তা অবিশ্বাস্য।
ব্যাট হাতে তাঁকে তাণ্ডব করতে দেখে বারবার প্রশ্ন জেগেছে, এটা কি সত্যিকারের খেলা নাকি কোনো ভিডিও গেম। ক্রিকেটে ব্যাটিং কি তবে এতই যে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরও এমন বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারেন!
ব্যাটিং মোটেই সহজ কোনো কাজ নয়। কিন্তু সূর্যবংশীর মতো অমিত প্রতিভাধর কেউ এসে হুটহাট ব্যাট করাকে এমন ডাল-ভাত বানিয়ে ফেলেন। গতকাল রাতেও বেঞ্চে বসে কান্নার আগে রাজস্থান রয়্যালসের সূর্যবংশী করেছেন ৪৭ বলে ৯৭ রান। এমন ইনিংস খেলে যেকোনো ব্যাটসম্যান যেভাবে খুশিতে উৎফুল্ল হবেন।

তবে সূর্যবংশীর ক্ষেত্রে মনে হবে, বল বোধ হয় একটু বেশিই খেলেছেন! অবশ্য আর কিবা করার ছিল। একে তো মন্থর উইকেট, তারওপর সঙ্গীরা যখন ক্রিজে আসা-যাওয়ায় ব্যস্ত ছিলেন, তখন স্বভাববিরুদ্ধভাবে একটু ‘দেখেশুনে’ খেলতে হয়েছে তাঁকে। ম্যাচ হারার পাশাপাশি অবশ্য সেঞ্চুরির আক্ষেপও থাকবে তাঁর। শেষ চার ইনিংসের তিনটিতেই যে ‘নার্ভাস নাইন্টিজে’ ফিরেছেন তিনি।
সূর্যবংশীর দল রাজস্থান রয়্যালস শেষ পর্যন্ত ফাইনালে যেতে পারেনি। গুজরাট টাইটানসের কাছে দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে হেরেছে ৭ উইকেটে। সূর্যবংশীও কাছাকাছি গিয়েও সেঞ্চুরি পাননি। কিন্তু তাঁকে দেখতে আসার দর্শকদের মনোরঞ্জন তিনি ঠিকই করেছেন। নিউ চণ্ডীগড়ের উপকণ্ঠে অবস্থিত মহারাজা যাদবীন্দ্র সিং স্টেডিয়ামে তখন আইপিএলের দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ার শুরুর আরও প্রায় তিন ঘণ্টা বাকি।
নিরাপত্তাকর্মীর পাশ কাটিয়ে গ্যালারিতে ঢোকার সময় গর্বভরে সূর্যবংশীর গোলাপি রঙের ০৩ নম্বর জার্সি দেখিয়ে এক কিশোর বলে উঠল, ‘আমরা এসেছি বৈভবকে দেখতে।’ আসলে স্টেডিয়ামে উপস্থিত অসংখ্য দর্শকের মনের কথাই যেন বলছিল সে।
গতকালের আগে এই বিস্ময়বালক গ্রুপ পর্বে এক সপ্তাহের মধ্যে দুটি অসাধারণ ইনিংস খেলে আলোচনায় এসেছিলেন। প্লে-অফে এসে সেই ধারাবাহিকতাকে আরও এক ধাপ ওপরে নিয়ে গেছেন। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে খেলেছেন আরও দুটি দুর্দান্ত ইনিংস। বুধবার তিনি একাই প্যাট কামিন্সদের সব পরিকল্পনা তছনছ করে দিয়েছিলেন। এমন সহজতায় ব্যাট চালিয়েছিলেন, যেন টেলিভিশনে নিজের প্রিয় কার্টুনের চ্যানেল বদলাচ্ছেন।
তবে শুক্রবারের ইনিংসটি ছিল ভিন্ন মাত্রার। সেটি শুধু আরেকটি ঝোড়ো ইনিংসই নয়, বৈভবের প্রতিভার নতুন একটি দিকও সামনে নিয়ে এসেছে। এলিমিনেটর ম্যাচে ব্যবহৃত ৪ নম্বর পিচেই শুক্রবার দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ার অনুষ্ঠিত হয়। বেশি ব্যবহৃত হওয়ায় উইকেটটি ছিল মন্থর এবং অসম বাউন্সের, বিশেষ করে ইনিংসের শুরুর দিকে। গুজরাট টাইটানসের লম্বা গড়নের পেসাররা সেটির পুরো সুবিধা নেন। তারা ধারাবাহিকভাবে বল ছোট লেংথে ফেলে ব্যাটসম্যানদের চাপে রাখেন।
অন্য প্রান্ত থেকে সূর্যবংশী দেখেছেন, মাত্র দুই ওভারের মধ্যে ফিরে গেছেন যশ্বসী জয়সওয়াল ও ধ্রুব জুরেল। এরপর চোটের কারণে রবীন্দ্র জাদেজার অনুপস্থিতিতে দুর্বল হয়ে পড়া মিডল-অর্ডারের দায়িত্বও অনেকটা কাঁধে তুলে নিতে হয় তাঁকে।
এর মধ্যেই হেলমেটে বলের আঘাতও সহ্য করতে হয়েছে। স্বভাবতই আক্রমণাত্মক ও নির্ভার ক্রিকেট খেলেন বৈভব। কিন্তু চারপাশে এত প্রতিকূলতা তৈরি হওয়ায় সেদিন নিজের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখেন তিনি। পরিস্থিতি বুঝে খেলেছেন, ধৈর্য দেখিয়েছেন এবং সমাধান খুঁজেছেন প্রতিটি চ্যালেঞ্জের।
প্রথম ছক্কা মারতে তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৪ বল পর্যন্ত। আইপিএলে এটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে ধীরগতির ফিফটি, যদিও সেটিও এসেছে মাত্র ৩১ বলে। প্রায় ১৮ ওভার ক্রিজে ছিলেন তিনি, টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে যা তাঁর দীর্ঘতম ইনিংস। ম্যাচ শেষে রাজস্থান রয়্যালসের প্রধান কোচ কুমার সাঙ্গাকারা বলেন, ‘আজ ও অসাধারণ ব্যাটিং করেছে। চারপাশে উইকেট পড়ছিল, ফলে এটি অনেক কঠিন একটি ইনিংস ছিল। কিন্তু ও স্নায়ুর দৃঢ়তা ধরে রেখেছে। আমাদের লড়াই করার মতো স্কোর এনে দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ওর।’
সাঙ্গাকারা আরও বলেন, ‘মাত্র ১৫ বছর বয়সী একজন ক্রিকেটারের জন্য ও অবিশ্বাস্য রকম পরিণত। খেলার পরিস্থিতি খুব ভালোভাবে বুঝতে পারে, ম্যাচও দারুণ পড়ে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ওর মধ্যে কোনো ভয় নেই।’
বৈভব সূর্যবংশী কতটা পরিণত ক্রিকেট খেলেন, তা বোঝা যায় তাঁর ব্যাটিংয়ে। তিনি এমনকি টেস্ট ও ওয়ানডেতে ভারতের অধিনায়ক শুভমান গিলের ফিল্ড সাজানোর পরিকল্পনাও ভেস্তে দিতে পারেন, বদলে দিতে পারেন মোহাম্মদ সিরাজের বোলিং পরিকল্পনা।
ইনিংসের তৃতীয় ওভারে গিল শর্ট ফাইন লেগ থেকে একজন ফিল্ডারকে কভার-পয়েন্টে সরিয়ে এনে অফ সাইডের ভেতরের বৃত্ত আরও শক্ত করেছিলেন। তখন লেগ সাইডের সীমানায় একমাত্র ফিল্ডার ছিলেন ডিপ স্কয়ার লেগে, যেখানে এর আগে আউট হয়েছিলেন জয়সওয়াল। সূর্যবংশী সেই ফাঁকটাই কাজে লাগান। ব্যাক অব আ লেংথ ডেলিভারিকে দুর্দান্ত এক সুইপ করে ফাইন লেগ অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন, যে শট ওই দৈর্ঘ্যের বলে খুব কম ব্যাটসম্যানই খেলতে পারেন।
পরের বলেও একই কৌশল। প্রায় দাঁড়িয়ে থেকেই তিনি বলটিকে একই ফাঁক গলে গুজরাট টাইটানসের ডাগআউটের দিকে পাঠান। শটটি দেখে গুজরাটের কোচ আশিস নেহরাও নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। আর গ্যালারিতে থাকা ২৫ হাজারের বেশি দর্শকও উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন।
এরপরও দর্শকদের রোমাঞ্চে ভাসিয়ে যেতে থাকেন বৈভব। পরের ওভারে কাগিসো রাবাদা নিজের পরিচিত হার্ড লেংথ থেকে সরে আসতেই ১৫২ কিলোমিটার গতির বল মিড-অফের ওপর দিয়ে চার মেরে দেন তিনি। প্রেস বক্সের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোর তখন বৈভবের ০৩ নম্বর জার্সি উঁচিয়ে ধরে জোরে জোরে নাড়াচ্ছিল। তার সঙ্গে থাকা বড়রাও উঠে দাঁড়িয়ে করতালি দিচ্ছিলেন প্রাণভরে। শেষ পর্যন্ত তাঁর আনন্দময় ইনিংসটা থেমেছে ৯৭ রানে।
দর্শকদের এমন আনন্দ অবশ্য পুরো আইপিএল মৌসুমজুড়ে দিয়েছেন সূর্যবংশী। একের পর এক চার-ছক্কায় এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্ট সর্বোচ্চ ৭৭৬ রান তাঁর। ১৬ ইনিংসে ২৩৭.৩০ স্ট্রাইক রেট ও ৪৮.৫০ গড়ে এই রান করেছেন তিনি। ৭২২ রান করে দ্বিতীয় স্থানে থাকা গিল ফাইনাল নিশ্চিত করায় তাঁর সামনে সুযোগ আছে সূর্যবংশীকে টপকে যাওয়ার। যদিও এখনো ৫৫ রানে পিছিয়ে আছেন ভারতের টেস্ট অধিনায়ক। সেই কোটা পূরণ করতে ব্যর্থ হলে ‘অরেঞ্জ ক্যাপ’টা সূর্যবংশীর কাছেই থেকে যাবে।
এবারের আসরে গেইলের ছক্কার রেকর্ডসহ অসংখ্য রেকর্ড ভেঙেছেন সূর্যবংশী। গতকাল রাতের ৭ ছক্কাসহ তাঁর মোট ৭২টি। টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে কোনো টুর্নামেন্টে এটিই কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড। ২০১২ আইপিএলে ৫৯টি ছক্কা মেরে আগের রেকর্ডটি গড়েছিলেন ক্রিস গেইল।
সূর্যবংশীর এসব রেকর্ড কে ভাঙবেন?
হয়তো বৈভব সূর্যবংশী নিজেই! বয়সটা মনে আছে তো?
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats