শিল্পী মাসুক হেলালের তুলিতে জিয়াউর রহমান
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন রাষ্ট্রপতি, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। বিদ্রোহ দমন ও সামরিক আদালতে তার বিচার হলেও উত্তরহীন রয়ে গেছে অনেক কিছু। সেনাবাহিনী ও ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে বহু অস্বস্তিকর প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
৪৫ বছর আগে, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোর, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের নিস্তব্ধতা ভেঙে যায় মেশিনগানের গুলিতে। সেখানে অবস্থান করছিলেন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। আগের দিন তিনি চট্টগ্রামে এসেছিলেন দলের স্থানীয় বিরোধ মেটাতে। ভোর হওয়ার আগেই সেই সফর পরিণত হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়ে।
তখন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ছিলেন জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী। তাঁর বাসভবন ছিল ডিসি হিলে, সার্কিট হাউস থেকে মাইলখানেক দূরে। ভোরের দিকে গোলাগুলির শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। প্রহরী এসে জানায়, গুলির আওয়াজ সার্কিট হাউসের দিক থেকে আসছে। পরে সার্কিট হাউস-সংলগ্ন সরকারি গ্যারেজ থেকে সহকারী প্রটোকল অফিসার মোশতাক তাঁকে ফোন করে জানান, ভোর চারটার দিকে সেনাবাহিনীর কয়েকটি গাড়ি গুলি করতে করতে সার্কিট হাউসে ঢুকেছে। তিনি ডাইনিংরুমের টেবিলের নিচে লুকিয়ে ভারী বুটের শব্দ, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার শব্দ এবং আরও গুলির আওয়াজ শুনেছেন।
কিছুক্ষণ পর বিভাগীয় কমিশনার সাইফুদ্দিন ফোন করে জেলা প্রশাসককে জানান, রাষ্ট্রপতি জিয়া নিহত হয়েছেন। এরপর বিভাগীয় কমিশনারকে সঙ্গে নিয়ে জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী সার্কিট হাউসে যান। সেখানে তিনি দেখেন, প্রধান ফটক খোলা। নেই কার্যকর প্রহরা, নেই সেনাবাহিনীর উপস্থিতি। ওপরতলায় রাষ্ট্রপতির কক্ষের দরজার কাছে সাদা কাপড়ে ঢাকা পড়ে আছে জিয়াউর রহমানের মরদেহ।
জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর লেখা বই দুই জেনারেলের হত্যাকাণ্ড: ১৯৮১-র ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান-এ উঠে আসা এই দৃশ্য শুধু একজন প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার ইতিহাসের আরেক নির্মম চিত্র। তবে সে ঘটনার নেপথ্যের সবকিছু ৪৫ বছরেও স্পষ্ট হয়নি।
হঠাৎ সফর, রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপট
জিয়াউর রহমানের চট্টগ্রাম সফর ছিল হঠাৎ নির্ধারিত। জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী তাঁর বইয়ে লিখেছেন, জিয়া প্রায় প্রতি মাসেই চট্টগ্রাম সফর করতেন। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী দমনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পর চট্টগ্রাম হয়ে পার্বত্য অঞ্চলের সেনাক্যাম্প পরিদর্শন তাঁর নিয়মিত কর্মসূচি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে ১৯৮১ সালের মে মাসের শেষ সফরটি ছিল আলাদা।
এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে জিয়াউর রহমান কক্সবাজারে সেনা মহড়া দেখতে এসেছিলেন। তখন আবার চট্টগ্রামে আসবেন—এমন কোনো ইঙ্গিত স্থানীয় প্রশাসন পায়নি। পরে হঠাৎ জানানো হয়, রাষ্ট্রপতি জরুরি রাজনৈতিক কারণে চট্টগ্রাম আসছেন। তিনি থাকবেন মাত্র এক দিন। সফরটি রাজনৈতিক হওয়ায় কোনো সরকারি কর্মসূচি রাখা হয়নি। তবে জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারকে কাছাকাছি থাকতে বলা হয়, প্রয়োজন হলে যেন তাঁরা সহযোগিতা করতে পারেন।

জিয়াউদ্দিনের বর্ণনায় রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গীদের মধ্যে যাঁদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন, বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, আমিনা রহমান (বিএনপির তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য), মাঈদুল ইসলাম (তৎকালীন বিএনপি নেতা ও মন্ত্রী) এবং রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত কয়েকজন কর্মচারী। উপপ্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দীন আহমেদ আগে থেকেই চট্টগ্রামে ছিলেন। বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানাতে ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ কমিশনার, পুলিশের ডিআইজি, নৌ ও বিমানবাহিনীর স্থানীয় প্রধান, ডেপুটি স্পিকার সুলতান আহমেদ চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম জেলা বিএনপির সভাপতি এ এস এম ইউসুফ। সাধারণত চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর বিমানবন্দরে থাকতেন। কিন্তু সেদিন তিনি ছিলেন না। তাঁর জায়গায় ছিলেন ব্রিগেডিয়ার আজিজ। মঞ্জুরের অনুপস্থিতি তখনই অস্বাভাবিক বলে মনে হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতির সফরের মূল কারণ ছিল চট্টগ্রাম বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ। স্থানীয় নেতৃত্ব দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। এক পক্ষের পেছনে ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দীন আহমেদ, আরেক পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছিলেন ডেপুটি স্পিকার সুলতান আহমেদ চৌধুরী। দলীয় বিরোধ এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে স্থানীয় কর্মীরা সংঘর্ষে জড়াতেন, শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিঘ্নিত হতো। জিয়াউদ্দিনের ভাষ্যে, পরিস্থিতি ফেরাতে গিয়ে পুলিশও নাজেহাল হয়েছিল।
১৯৮১ সালে ২৯ মে সকালে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে জিয়াউর রহমান প্রথমে যান সার্কিট হাউসে। এরপর চন্দনপুরা মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে ফিরে এসে সার্কিট হাউসে বিএনপির স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠক শুরু হয় বেলা তিনটার দিকে। সন্ধ্যা পেরিয়েও তা চলছিল। সেটিই ছিল চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমানের শেষ রাজনৈতিক বৈঠক (বৈঠকটি হয় প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত)।
সার্কিট হাউসে হামলা
অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর ‘বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে জিয়া হত্যাকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সামরিক হামলা হিসেবে দেখেননি। তাঁর বয়ানে এর পটভূমিতে ছিল স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীর ভেতরে জমে থাকা অসন্তোষ, মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তানফেরত কর্মকর্তাদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব, পদায়ন-পদোন্নতি নিয়ে ক্ষোভ, জিয়ার ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসন এবং চট্টগ্রামে মঞ্জুরকে ঘিরে তৈরি হওয়া অস্থিরতা।
মঞ্জুর তখন চট্টগ্রামে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি। তিনি মুক্তিযুদ্ধের বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। মাসকারেনহাসের বর্ণনায়, মঞ্জুরকে বদলির সিদ্ধান্ত (মঞ্জুরকে ঢাকার ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে বদলি করা হয়েছিল) এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তার ক্ষোভ বিদ্রোহকে দ্রুততর করে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান ও ঢাকার সেনা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিলেন বলে তাঁর বিবরণে উঠে আসে।
তবে এই জায়গাতে ইতিহাসের বয়ান একরৈখিক নয়। জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী পরে তাঁর বই ও সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জিয়া ও মঞ্জুর—দুজনকেই তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর ধারণা, মঞ্জুরের মূল ক্ষোভ ছিল সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদের প্রতি; জিয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খারাপ ছিল বলে তাঁর মনে হয়নি। জিয়া হত্যার সঙ্গে মঞ্জুর সরাসরি জড়িত ছিলেন কি না, সে বিষয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন। এই ভিন্ন মূল্যায়নই জিয়াউর রহমান হত্যার ইতিহাসকে আরও জটিল করে তোলে।
সার্কিট হাউসে হামলা ছিল দ্রুত, সংগঠিত ও ভয়াবহ। সরকারি ভাষ্যে বলা হয়, ‘বিপ্লবী পরিষদ’ পরিচয় দেওয়া কিছু বিদ্রোহী সেনাসদস্য রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করেছেন।
চট্টগ্রাম বেতার থেকে মঞ্জুরের বরাত দিয়ে জিয়াউর রহমানের নিহত হওয়ার খবর প্রচারিত হয়। মঞ্জুর নিজেকে ‘বিপ্লবী পরিষদের’ একমাত্র মুখপাত্র বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম বেতার থেকে এই ঘোষণা প্রচারের আগপর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসনের অনেকেই নিশ্চিতভাবে জানতেন না, আসলে কী ঘটেছে। রেডিওতে ঘোষণার পর পুরো চট্টগ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সান্ধ্য আইন জারি হয়। ঢাকার সঙ্গে টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সড়ক ও আকাশপথও বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রাম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দেশের কেন্দ্রীয় শাসন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ঢাকায় তখন দ্রুত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা শুরু হয়। উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য ও তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদসহ সামরিক নেতৃত্ব সাত্তার সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। ৩০ মে দুপুরে বিচারপতি সাত্তার রেডিও-টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। সভা-সমাবেশ, মিছিল ও গণজমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়।
গোপন দাফন, পরে মরদেহ উদ্ধার
রাষ্ট্রপতির মৃত্যুর পর সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্ন ছিল—জিয়াউর রহমানের মরদেহ কোথায়? সার্কিট হাউসে সকালে যাঁরা গিয়েছিলেন, তাঁরা মরদেহ দেখেছিলেন। পরে সকাল আটটা থেকে নয়টার মধ্যে সেনাবাহিনীর একটি দল সার্কিট হাউসে এসে জিয়াউর রহমানসহ অন্তত তিনজনের মরদেহ গাড়িতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। পরে মরদেহ গোপনে রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ি এলাকায় দাফন করা হয়।
সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর রেজাউল করিম রেজা পরে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তাঁকে সার্কিট হাউসে পাঠানো হয়েছিল সেখানে থাকা সৈন্যদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে।
মেজর রেজাউল করিম রেজার ভাষ্যে, জিয়াউর রহমানের মরদেহ পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে দাফনের দায়িত্ব প্রথমে তাঁকে দিতে চাওয়া হয়েছিল; তিনি অনীহা জানালে মেজর শওকত আলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কয়েকজন সেনাসদস্যকে সঙ্গে নিয়ে মেজর শওকত আলীই মরদেহ পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে দাফন করেন বলে রেজাউল করিমের বর্ণনায় এসেছে। একই কবরে কর্নেল এহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজের মৃতদেহও দাফন করা হয়েছিল বলে তিনি জানান। এই দুজনকেও সেদিন ভোরে সার্কিট হাউসে হত্যা করা হয়েছিল।
মঞ্জুরের পলায়ন এবং পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা শুরু হয়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী লিখেছেন, তাঁরা জানতে পারেন জিয়ার মরদেহ সেনানিবাসে নেওয়া হয়নি। রাঙ্গুনিয়া থানার পুলিশ খবর দেয়, বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানির কাছে একটি খালি জায়গায় রাতে সেনাসদস্যরা একটি মরদেহ দাফন করেছেন। স্থানীয় একজন মৌলভি লাশ কার, তা না জেনেই দাফনে সহায়তা করেছিলেন। পরে জিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়ালে স্থানীয় লোকজন সন্দেহ করে পুলিশকে জানান। কবর খুঁড়ে দেখা যায়, সেটি জিয়াউর রহমানের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ।
উদ্ধারের পর জিয়াউর রহমানের মরদেহ সরাসরি চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। জিয়াউদ্দিন, বিভাগীয় কমিশনার সাইফুদ্দিন ও পুলিশ সুপার মারুফ সেই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। তাঁরা সেনানিবাসে গিয়ে দেখেন, ভেতরেও আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। প্রধান ফটকে কোনো প্রহরা নেই। কর্মকর্তাদের অনেকেই বিভ্রান্ত, কেউ কেউ বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। জিয়াউদ্দিনের বর্ণনায়, সেনানিবাসের সেই পরিবেশ দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, পরিস্থিতি এখনো স্থির হয়নি; দেশ আবার কোনো বড় পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে কি না, সেই ভয়ও তাঁর মধ্যে ছিল।
পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে জিয়ার মরদেহ প্রস্তুত করা হয়। ঢাকা থেকে সামরিক হেলিকপ্টার আসে। ঢাকায় নেওয়ার আগে সেনাসদস্যদের দাবিতে হেলিপ্যাডে জানাজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর হেলিকপ্টারে করে মরদেহ ঢাকায় পাঠানো হয়।
লালদীঘির গায়েবানা জানাজা
এদিকে লালদীঘি ময়দানে জিয়াউর রহমানের গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে বিএনপি। জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিনের ভাষ্য, বিকেল চারটার দিকে তিনি লালদীঘি ময়দানে গিয়ে দেখেন, বিপুল মানুষের জমায়েত। আরও মানুষ আসছে। এই দৃশ্য তাঁকে বিস্মিত করেছিল। কারণ, জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর আগের দুই দিন চট্টগ্রাম প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট হতেই তাঁরা আবার শহরে ফিরে আসেন।
জিয়াউদ্দিন লিখেছেন, ‘ময়দানে লক্ষ মানুষের জমায়েত দেখে তাঁর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কথা মনে পড়েছিল। পার্থক্য ছিল—চট্টগ্রামের রাস্তা দুই দিন পর আবার মানুষে ভরে যায়, কারণ এ অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ঢাকার অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়নি।’
মঞ্জুরের পলায়ন ও আত্মসমর্পণ
চট্টগ্রামের বিদ্রোহ দ্রুত ভেঙে পড়ে। ৩০ মে যে ক্যান্টনমেন্টে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছিল, ৩১ মে সেখানে বিভক্তি দেখা দেয়। অনেক কর্মকর্তা ও সৈনিক বিদ্রোহীদের পক্ষ ত্যাগ করে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাত্তারের সরকারের প্রতি আনুগত্য জানাতে শুরু করেন।
৩১ মে রাতে মেজর জেনারেল মঞ্জুর চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছাড়েন। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী, চার সন্তান ও কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা। এর মধ্যে ছিলেন তাঁর নিরাপত্তা কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা মেজর রেজাউল করিম। তিনি ২০২৪ সালে প্রথম আলোকে এ–সংক্রান্ত বর্ণনায় বলেছেন, তাঁদের গাড়ির বহর চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকা হয়ে খাগড়াছড়ি যাওয়ার জন্য কিছু দূর অগ্রসর হয়ে একটি পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছানোর পর সামনে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান তাঁরা। তখন তাঁরা লক্ষ করেন সামনে কিছু সৈন্য পাহাড়ের দিকে ছুটোছুটি করছে। সে সময় জেনারেল মঞ্জুর গাড়ি ঘুরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। কিন্তু তাঁদের বহনকারী গাড়িটি হঠাৎ বিকল হয়ে পড়ে।
তখন তাঁরা অন্য আরেকটি গাড়িতে করে পেছনের দিকে চলে আসেন। সেখানে তাঁরা কর্নেল মতিউর রহমান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। রাস্তায় ওই গোলাগুলির সময়ই কর্নেল মতিউর রহমান নিহত হন বলে রেজাউল করিমের ধারণা।
রেজাউল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, জেনারেল মঞ্জুর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিকল গাড়ি ফেলে রেখে তাঁরা একটি গ্রামে হাঁটা শুরু করেন। এলাকাটিতে চা-বাগান ছিল। জেনারেল মঞ্জুর তখন চা-বাগানের এক কুলির বাড়িতে যান। কারণ, তাঁর সন্তানেরা ছিল ক্ষুধার্ত। সেখানে জেনারেল মঞ্জুরের সন্তানদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
রেজাউল করিম বলেন, ‘তাঁরা যখন খেতে বসেছিলেন, তখন হঠাৎ কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ শুনতে পাই। তখন আমরা লক্ষ করলাম বেশ কিছুটা দূরে পাহাড়ি এলাকায় খাকি পোশাকের পুলিশ দেখা যাচ্ছে। তখন জেনারেল মঞ্জুর বললেন যে আমি পুলিশের কাছে সারেন্ডার করব। পুলিশ সদস্যরা যখন সামনের দিকে এগিয়ে আসছিলেন তখন জেনারেল মঞ্জুর জঙ্গলের ভেতরে দাঁড়িয়ে যান।’
মঞ্জুর পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণের পর তাঁর স্ত্রী, সন্তান, রেজাউলসহ তাঁদের হাটহাজারী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জেনারেল মঞ্জুর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তারা বললেন যে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা যাবে না।
জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর বইয়ে মঞ্জুরকে ঘিরে প্রশাসনিক দোটানার বর্ণনা আরও স্পষ্ট। লালদীঘির জানাজার পর পুলিশ সুপার মারুফ তাঁকে জানান, ফটিকছড়ির এক গ্রামে মঞ্জুরের খোঁজ মিলেছে। জিয়াউদ্দিন তখন পুলিশকে সতর্ক করেন, যেভাবেই হোক সেনাবাহিনীর আগে যেন পুলিশ মঞ্জুরকে হেফাজতে নিতে পারে। তাঁর আশঙ্কা ছিল, সেনাবাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তারের বদলে অন্য কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে।
পরে পুলিশ জানায়, মঞ্জুরকে পরিবারসহ হাটহাজারী থানায় আনা হয়েছে। কিন্তু সেখানে নতুন সংকট তৈরি হয়। থানার বাইরে হাজারো মানুষ ভিড় করে। কিছুক্ষণ পর একজন সামরিক ক্যাপ্টেন ও সশস্ত্র সৈন্য দল আসে। তারা দাবি করে, মঞ্জুর সামরিক কর্মকর্তা, তাই তাঁকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিতে হবে। অন্যদিকে মঞ্জুর পুলিশ হেফাজতে জেলে যেতে চান; সেনানিবাসে যেতে রাজি নন।
ঢাকায় যোগাযোগ করা হয়। বিচারপতি সাত্তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেনাপ্রধান এরশাদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান। শেষ পর্যন্ত মঞ্জ
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats