বাংলাদেশের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই)-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরীর সাম্প্রতিক নয়াদিল্লি সফর আপাতদৃষ্টিতে একটি নিয়মিত নিরাপত্তা সংলাপের অংশ বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সফরের তাৎপর্য অনেক গভীর। এমন এক সময়ে এই সফর অনুষ্ঠিত হলো, যখন গত দুই বছরের টানাপোড়েনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক আবার নতুন করে গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে। অনেকের মতে, এটি হতে পারে দুই দেশের মধ্যে নীরব কূটনীতির মাধ্যমে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সূচনা।
গত দুই দশকে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ায় তুলনামূলকভাবে একটি স্থিতিশীল ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময় দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও জ্বালানি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে আঞ্চলিক সংযোগ বহু ক্ষেত্রেই দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করেছে।
কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের নাটকীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই সম্পর্ক হঠাৎ করেই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিতেই নয়, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও একটি বড় ধাক্কা আনে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান বিষয়টিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ, বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও ভিসা সেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই স্থবিরতা দেখা দেয়।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে এখন সেই স্থবিরতা কাটানোর একটি প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে এই পুনর্গঠন হচ্ছে অত্যন্ত সতর্ক ও হিসেবি কৌশলে।
দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে একটি পরিচিত বাস্তবতা হলো যখন রাজনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা জটিল হয়ে পড়ে, তখন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংলাপ প্রায়ই যোগাযোগের প্রথম কার্যকর পথ হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে ডিজিএফআই প্রধানের দিল্লি সফরটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং ভারতের সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
এই আলোচনায় প্রধান যে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা যাচ্ছে, তা হলো দুই দেশের কেউই যেন নিজেদের ভূখণ্ড অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ না দেয়। বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর বাংলাদেশ যেভাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, তা দুই দেশের মধ্যে আস্থার নতুন ভিত্তি তৈরি করেছিল।
এই প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা সহযোগিতার পুনরুজ্জীবন দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি বাস্তবধর্মী পথ হতে পারে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি কূটনৈতিক ঘটনাও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফরকে অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন। এটি ছিল নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের নেতৃত্বের প্রতি ভারতের আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা ও সম্পৃক্ততার একটি প্রতীকী পদক্ষেপ। একইভাবে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ও পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের প্রতিনিধিত্বও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখার আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। তবে সামনে বেশ কিছু জটিল প্রশ্নও রয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হলো শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি। নতুন সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও আইনি প্রশ্ন। অন্যদিকে ভারতের জন্য এটি একটি জটিল কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। এই ইস্যু কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালের এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। নতুন করে এই চুক্তি নবায়ন বা পুনর্বিন্যাসের আলোচনা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পানিবণ্টন সবসময়ই একটি স্পর্শকাতর বিষয়।
তবুও বাস্তবতা হলো বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সবকিছুই দুই দেশকে একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে রেখেছে।
ভারতের জন্য বাংলাদেশ শুধু একটি প্রতিবেশী নয়; এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রেও ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। সীমান্ত অপরাধ, উগ্রবাদ, মানবপাচার বা আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় দুই দেশের সমন্বয় অপরিহার্য। সম্প্রতি ভারতে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনাকে অনেকে দুই দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পুনরুজ্জীবিত সহযোগিতার একটি ইঙ্গিত হিসেবেও দেখছেন।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে তুলে ধরছে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না। দুই দেশের মধ্যে যে বহুমাত্রিক সম্পর্কের কাঠামো গড়ে উঠেছে, তা রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও টিকে থাকার সক্ষমতা রাখে।
এই কারণেই অনেক সময় দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা হয় খুব নীরবভাবে। আলোচনার টেবিলে নয়, বরং পর্দার আড়ালে।
ডিজিএফআই প্রধানের দিল্লি সফরও হয়তো তেমনই একটি সূচনা। সময়ই বলে দেবে এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সফর ছিল, নাকি বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের প্রথম সংকেত।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ই-মেইল: [email protected]
সৌজন্যে: দৈনিক মানবজমিন
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats