স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ # ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল # সংসদ সদস্যের সমর্থন এবং সহযোগিতা প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রীর # নিজামী-সাঈদী ও হাদীর নাম শোক প্রস্তাবে আনার দাবি জামায়াতের
দীর্ঘ দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থা পেরিয়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক নতুন সোপানে পদার্পণ করল বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বেলা ১১টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ঐতিহাসিক অধিবেশন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সংসদকে ঘিরে জনমনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল ও প্রত্যাশা।
অধিবেশনের শুরুতে এক নজিরবিহীন সাংবিধানিক পরিস্থিতির অবতারণা হয়। বিগত সরকারের পতনের পর স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে কার্যক্রম শুরু হয়। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার নাম প্রস্তাবকালে ১৯৭৩ সালের উদাহরণ টেনে বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। বর্তমান সংকটকালীন প্রেক্ষাপটে প্রবীণ এই সংসদ সদস্যের হাত ধরেই শুরু হলো সংসদের যাত্রা।
অধিবেশনের দর্শক সারিতে দেখা গেছে বিশিষ্টজনদের এক অনন্য সমাহার। সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান উপস্থিত থেকে এই মাহেন্দ্রক্ষণ প্রত্যক্ষ করেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমান। নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানসহ বিদেশি কূটনীতিক ও দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে সংসদ কক্ষ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ।
প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করাই আমাদের লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী
প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রারম্বে সভাপতির নাম প্রস্তাবকালে বক্তব্যের সময় তিনি এ কথা জানান।
সংসদনেতা তারেক রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি দল মত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমার রাজনীতি দেশ এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার রাজনীতি। এই লক্ষ্য অর্জনে আমি গণতান্ত্রিক জনগণের সমর্থন এবং সহযোগিতা চাই। এই মহান জাতীয় সংসদে সকল দলের নির্বাচিত প্রতিজন সংসদ সদস্যের সমর্থন এবং সহযোগিতা চাই।

সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দল কিংবা মত কিংবা কর্মসূচি ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু তাঁবেদারমুক্ত, ফ্যাসিবাদমুক্ত একটি স্বাধীন সার্বভৌম নিরাপদ স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না। বিরোধ নেই।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। সেই গণতন্ত্রকে প্রহসনের রূপ দিয়ে জাতীয় সংসদকে হাস্যরসের খোরাকে পরিণত করা হয়েছিল। দেশের তাঁবেদারি শাসন শোষণ কায়েম করা হয়েছিল। দেশের সংসদীয় গণতন্ত্র এবং জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করেছেন। জীবনে কখনোই স্বৈরাচার কিংবা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আপস করেননি। দেশে আজ থেকে আবারও সেই কাঙ্ক্ষিত সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো। আলহামদুলিল্লাহ। সংসদীয় রাজনীতি প্রতিষ্ঠাতা খালেদা জিয়া দেশ এবং জনগণের সাফল্যে এই শুভ মুহূর্তটি দেখে যেতে পারেননি। আজ তাই এই জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আমরা দেশ এবং জনগণের স্বার্থে আপসহীন নেতৃত্ব ব্যক্তিত্ব স্মরণীয় বরণীয় অনুকরণীয় রাজনীতিবিদকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।
বিএনপির রাজনীতি জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার রাজনীতি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি পরিবার স্বনির্ভর করাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য। প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করার মাধ্যমেই বিএনপি একটি স্বনির্ভর সমৃদ্ধ নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই লক্ষ্য অর্জনে আমি গণতান্ত্রিক জনগণের সমর্থন এবং সহযোগিতা চাইছি। এই মহান জাতীয় সংসদে সকল দলের নির্বাচিত প্রতিজন সংসদ সদস্যের সমর্থন এবং সহযোগিতা আশা করছি।
নতুন সরকারের যাত্রার শুরুতে স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকার উপস্থিত না থাকার বিষয়ে সংসদনেতা বলেন, পতিত পরাজিত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকারের জনবিরোধী এবং গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের ফলে যে জনরোষ তৈরি হয়েছে বা জনরোষ তৈরি হয়েছিল তাতে এই মহান সংসদের সাবেক স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের কেউ কারাগারে, কেউ নিখোঁজ কিংবা কেউ পলাতক। দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী এবং তাঁবেদারি শাসন শোষণের পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে আজ আমাদের এক বিশেষ পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।
জাতীয় সংসদকে জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু না করে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকার অকার্যকর করে ফেলেছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এই মহান জাতীয় সংসদকে সকল যুক্তি-তর্ক আর জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চাই।

ত্রয়োদশ সংসদের সভাপতিত্ব করেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সংসদের শুরু হওয়া প্রথম অধিবেশনের সংসদ সদস্যদের সমর্থনে সভাপতিত্বের দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি।
সভাপতির নাম ঘোষণার পর বিএনপির পক্ষ থেকে তা পূর্ণ সমর্থণ জ্ঞাপন করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সভাপতি নির্বাচনের এই প্রস্তাবটি বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সমর্থন জানান বিরোধীদলের উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করবেন।
সংসদের স্পিকার পদে নির্বাচিত মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে স্পিকার পদে নির্বাচিত হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সংসদ অধিবেশনে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের নাম প্রস্তাব করেন বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। এই প্রস্তাব সমর্থন করেন খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম। সংসদের সভাপতি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সংসদের সামনে স্পিকার নির্বাচনের বিষয়টি পেশ করেন। পরে এটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।

বেলা ১১টার দিকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের আহ্বানে সংসদের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমে সংসদীয় নেতা তারেক রহমান তার বক্তব্যে সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করেন। এতে পূর্ণ সমর্থন জানান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা।
এদিকে, তারেক রহমানের প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়ে বিরোধী দলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, এ বিষয়ে আগে আলোচনা করলে খুশি হতেন তারা।

সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সংসদ অধিবেশনে কায়সার কামালের নাম প্রস্তাব করেন নাটোরের সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। এই প্রস্তাব সমর্থন করেন আরেক সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজাম।
সংসদের সভাপতি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সংসদের সামনে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের বিষয়টি পেশ করেন। পরে এটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ালেন রাষ্ট্রপতি
ত্রয়োদশ সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দুপুর ১২টার পরে এই শপথ পড়ানো হয়। জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে এই শপথ পড়ানো হয়।
খালেদা জিয়া, মনমোহন, খামেনি ও ৩১ জন সংসদ সদস্যের প্রতি শোকপ্রস্তাব, নিজামী– সাঈদী–হাদীসহ বিভিন্ন নেতার প্রতি শোকপ্রস্তাব আনার দাবি বিরোধী দলের
সংসদে শোকপ্রস্তাব আনা হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, পোপ ফ্রান্সিস, ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতি।
এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরীসহ ৩১ জন সাবেক সংসদ সদস্যের প্রতি শোকপ্রস্তাব আনা হয়।
এ সময় বিরোধীদলীয় উপনেতা জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, শোকপ্রস্তাবটি একপেশে। তিনি মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, শরিফ ওসমান হাদিসহ বিভিন্ন নেতাদের প্রতি শোকপ্রস্তাব আনার দাবি জানান।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats