নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর থেকেই আলোচনায় আছে ‘আওয়ার স্টিকি লাভ’। কোরিয়ান এই রোমান্টিক কমেডি সিরিজের গল্পে প্রেম, রহস্য, অ্যাকশন, স্মৃতিভ্রম এবং অপরাধজগতের যোগসূত্র রয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নায়ক জুং হে-ইনের জনপ্রিয়তা। তবে সিরিজটির সাফল্যের গল্পটা একেবারে মসৃণ নয়। মুক্তির কয়েক দিনের মধ্যেই এর অন্যতম প্রধান অভিনেত্রী হা ইয়ংকে ঘিরে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। এমনকি সিরিজটির প্রচারণাও বাধাগ্রস্ত হয়। এরপরও দর্শকদের আগ্রহে ভাটা পড়েনি; বরং দ্বিতীয় সপ্তাহেই বিশ্বজুড়ে নেটফ্লিক্সের নন-ইংলিশ টিভি সিরিজের তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে ‘আওয়ার স্টিকি লাভ’। ১০ থেকে ১৬ আগস্টের মধ্যে সিরিজটি পেয়েছে ৭৫ লাখ ভিউ এবং দেখা হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৮০ লাখ ঘণ্টা। বাংলাদেশেও সিরিজটি নেটফ্লিক্সের টপ চার্টে জায়গা করে নিয়েছে।
গল্পটা যেমন
১২ পর্বের সিরিজটির গল্প শুরু হয় এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রসিকিউটরকে ঘিরে। গো উন-সে নামের ওই নারী একটি বিপজ্জনক তদন্তের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে গুরুতর হামলার শিকার হয়ে তিনি স্মৃতিশক্তি হারান। এরপর তাঁর জীবনে হাজির হন জ্যাং তে-হা, একসময়কার বক্সিং প্রতিভা, যিনি এখন ছোট শহরে বক্সিং প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।

তে-হা দাবি করেন, উন-সে তাঁর প্রেমিকা। কিন্তু স্মৃতিশক্তি হারানো উন-সের কাছে অবশ্য এই দাবি বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। তবু পরিস্থিতির কারণে তাঁকে তে-হার সঙ্গে থাকতে হয়।
ধীরে ধীরে জানা যায়, এই সম্পর্কের আড়ালে আছে আরও বড় রহস্য। তে-হার নিজেরও আছে অপরাধজগতের অতীত। অন্যদিকে উন-সে আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতির তদন্ত করছিলেন। ফলে দুজনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে যায় অপরাধী চক্র, পুরোনো শত্রুতা ও লুকানো সত্য।
নেটফ্লিক্সের ভাষায়, এটি মূলত রোমান্টিক কমেডি; তবে গল্পে নোয়ার ঘরানার অপরাধ ও রহস্যও আছে। এই ভিন্ন স্বাদের মিশ্রণই সিরিজটির অন্যতম আকর্ষণ।
জুং হে-ইনের জনপ্রিয়তা
সিরিজটির সাফল্যের পেছনে বড় কারণ অবশ্যই জুং হে-ইন। ‘সামথিং ইন দ্য রেইন’, ‘ওয়ান স্প্রিং নাইট’, ‘স্নোড্রপ’, ‘ডি. পি. ’ ও ‘লাভ নেক্সট ডোর’-এর মতো সিরিজ দিয়ে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পরিচিত এই অভিনেতার নতুন কাজ নিয়ে আগে থেকেই আগ্রহ ছিল।
‘আওয়ার স্টিকি লাভ’-এ তাঁর চরিত্রটিও দর্শকদের পছন্দের উপাদান তৈরি করেছে। একদিকে কঠিন অতীতের মানুষ, অন্যদিকে প্রেমিকার নিরাপত্তার জন্য নিজের পরিচয় ও অতীত আড়াল করে রাখা—এই দ্বৈততা চরিত্রটিকে আকর্ষণীয় করেছে।
শুধু রোমান্টিক দৃশ্য নয়, অ্যাকশন ও আবেগঘন মুহূর্তেও জুং হে-ইনের অভিনয় নিয়ে দর্শকের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ফলে সিরিজটির প্রচারণায় যখন নানা সমস্যা দেখা দেয়, তখনও জুং হে-ইনের জনপ্রিয়তা দর্শক টানার বড় কারণ হয়ে থেকেছে।
মুক্তির পরই বিতর্ক
সিরিজটি মুক্তি পায় গত ৭ আগস্ট। আর সেদিনই হা ইয়ং অংশ নেন দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘প্রবলেম চাইল্ড ইন হাউস’-এ। সেখানে তিনি তাঁর পরিবারের চিকিৎসাবিদ্যার দীর্ঘ ঐতিহ্যের কথা বলেন। তিনি জানান, তাঁর প্রপিতামহ জাপানে পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিদ্যা পড়েছিলেন এবং হানইয়াংয়ে প্রথম দিকের পাশ্চাত্য ধাঁচের একটি ক্লিনিক চালু করেছিলেন। তিনি আরও বলেন, তাঁর প্রপিতামহ সম্রাট গো-জংয়ের চিকিৎসাও করেছিলেন।
এরপরই দর্শকের একাংশ তাঁর প্রপিতামহের অতীত নিয়ে খোঁজখবর শুরু করেন। ঐতিহাসিক নথিতে তাঁর প্রপিতামহ চিকিৎসক আন সাং-হোর নাম উঠে আসে। বিতর্কের কেন্দ্রে আসে জাপানের ঔপনিবেশিক শাসনামলে তাঁর কর্মকাণ্ড এবং দেজং চিনমকহোয়ে নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার তথ্য।
১৯১৬ সালে ওই সংগঠনের কাউন্সিল সদস্য হিসেবে আন সাং-হোর নাম থাকার তথ্য সামনে আসে। ঐতিহাসিকভাবে সংগঠনটিকে জাপান ও কোরিয়ার ‘একীভূতকরণ’ বা আত্তীকরণের পক্ষে কাজ করা সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিষয়টি দক্ষিণ কোরিয়ায় বিশেষভাবে স্পর্শকাতর। কারণ, ১৫ আগস্ট দেশটির স্বাধীনতা দিবস, যেদিন জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান স্মরণ করা হয়।
প্রথমে অস্বীকার, পরে ক্ষমা
বিতর্কের শুরুতে হা ইয়ংয়ের ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান বিস্টাস এন্টারটেইনমেন্ট অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছিল। কিন্তু পরে তারা নথিপত্র যাচাই করে অবস্থান পরিবর্তন করে।
১১ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করে, ১৯১৬ সালে আন সাং-হো দেজং চিনমকহোয়ের কাউন্সিল সদস্য থাকার রেকর্ড রয়েছে। আগের বক্তব্যের জন্য তারা ক্ষমাও চায়।

হা ইয়ংও পরে নিজের হাতে লেখা চিঠিতে দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে বিতর্কের সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল, একজন অভিনেত্রীর নিজের কোনো কর্মকাণ্ডের জন্য নয়; বরং তাঁর বহু প্রজন্ম আগের একজন পূর্বপুরুষের কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে কেন জবাবদিহির মুখে পড়তে হবে?
এই প্রশ্নে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই ধরনের মত দেখা যায়। এক পক্ষ মনে করে, ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত এমন পারিবারিক পরিচয় নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বললে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও জানা উচিত ছিল। অন্য পক্ষের যুক্তি, এক শতাব্দী আগের কোনো পূর্বপুরুষের কর্মকাণ্ডের দায় বর্তমান প্রজন্মের একজন অভিনেত্রীর ওপর চাপানো কতটা যুক্তিসংগত, সেটিও ভাবা দরকার।
থেমে যায় প্রচারণা
বিতর্কের প্রভাব পড়ে সিরিজটির প্রচারণাও। ‘আওয়ার স্টিকি লাভ’-এর জন্য হা ইয়ংয়ের নির্ধারিত কয়েকটি প্রচারণামূলক সাক্ষাৎকার বাতিল করা হয়। ১৪ আগস্ট তাঁর গোলটেবিল বৈঠকেও অংশ নেওয়ার কথা ছিল, সেটিও বাতিল হয় বলে দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
কিন্তু এখানেই গল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক, প্রচারণায় ধাক্কা এলেও দর্শকসংখ্যায় ধাক্কা আসেনি।
৭৫ লাখ ভিউ, বিশ্বে এক নম্বর
নেটফ্লিক্সের ১০ থেকে ১৬ আগস্টের সাপ্তাহিক হিসাবে ‘আওয়ার স্টিকি লাভ’ বিশ্বজুড়ে নন-ইংলিশ টিভি সিরিজের তালিকায় প্রথম হয়েছে। এই এক সপ্তাহে সিরিজটি পেয়েছে ৭৫ লাখ ভিউ। পাশাপাশি মোট দেখা হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৮০ লাখ ঘণ্টা।
আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো, ৬৮টি দেশের নেটফ্লিক্স টপ ১০-এ জায়গা করে নেয় সিরিজটি। এর মধ্যে ২৬টি দেশে ছিল এক নম্বরে—দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুরও সেই তালিকায় রয়েছে।
প্রথম সপ্তাহে সিরিজটির অবস্থান ছিল পাঁচ নম্বরে। অর্থাৎ দ্বিতীয় সপ্তাহে চার ধাপ এগিয়ে সরাসরি শীর্ষে উঠে এসেছে এটি।
নেটফ্লিক্সের হিসাবে ‘ভিউ’ বলতে মোট দেখা ঘণ্টাকে সিরিজটির মোট দৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করে পাওয়া সংখ্যা বোঝানো হয়। তাই ৭৫ লাখ ভিউ মানে ৭৫ লাখ ব্যক্তি একবার করে পুরো সিরিজ দেখেছেন—এমন সরল অর্থ করা ঠিক হবে না। তবে সংখ্যাটি সিরিজটির বৈশ্বিক দর্শক-আগ্রহের শক্তিশালী একটি সূচক।
বাংলাদেশেও কেন আগ্রহ?
বাংলাদেশের দর্শকদের মধ্যে কোরিয়ান সিরিজের জনপ্রিয়তা নতুন কিছু নয়। তবে ‘আওয়ার স্টিকি লাভ’-এর ক্ষেত্রে জুং হে-ইনের পরিচিতি বড় ভূমিকা রাখছে। তাঁর আগের রোমান্টিক সিরিজগুলো বাংলাদেশেও কোরিয়ান নাটকের দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয়।
তার ওপর এই সিরিজের গল্পে প্রচলিত প্রেমের গল্পের সঙ্গে যোগ হয়েছে স্মৃতিভ্রম, অপরাধজগৎ ও রহস্য। ফলে শুধু রোমান্টিক ড্রামার দর্শক নয়, থ্রিলার পছন্দ করেন এমন দর্শকদের কাছেও এটি আকর্ষণ তৈরি করছে।
সিরিজটির মূল কাঠামোও দর্শককে ধরে রাখার মতো—একজন নারী জানেন না তিনি কে; আর একজন পুরুষ তাঁকে নিজের প্রেমিকা বলে দাবি করছেন। কিন্তু দর্শক জানেন, ওই পুরুষের কথার পেছনে রয়েছে অনেক বড় একটি সত্য। ফলে প্রেমের পাশাপাশি ‘আসল সত্য কী?’—এই প্রশ্নও গল্পকে এগিয়ে নেয়।
বিতর্ক কি আগ্রহ বাড়িয়েছে?
‘আওয়ার স্টিকি লাভ’-এর ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন—বিতর্ক কি শেষ পর্যন্ত সিরিজটির প্রচারণা বাড়িয়ে দিয়েছে?
এর সরাসরি উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ, সিরিজটির সাফল্যের পেছনে জুং হে-ইনের তারকাখ্যাতি, গল্পের ধরন, কোরিয়ান কনটেন্টের বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা—সবই কাজ করেছে। তবে বিতর্ক যে সিরিজটিকে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়তি আলোচনার মধ্যে নিয়ে এসেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
নেটফ্লিক্সডটকম, কোরিয়া টাইমস ও স্ক্রিন র্যান্ট অবলম্বনে
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats