পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে প্রতিকূল সময় পার করছে পশ্চিম এশিয়ার দেশ কুয়েত। ১৭ হাজার ৮২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশটিতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের উত্তাপ এখন জনজীবনে স্পষ্ট।
ধোঁয়া, সাইরেনের শব্দ আর বারুদের ঘ্রাণে ভরে উঠছে জনপদ, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রবাসীদের যাপিত জীবনে। আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যে প্রস্তুতির আমেজ থাকলেও সেখানে অবস্থানরত প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার বাংলাদেশি প্রবাসীর মাঝে উৎসবের পরিবর্তে বিরাজ করছে উদ্বেগ, উপার্জন সংকট ও স্বজনদের কাছে ফিরতে না পারার বিষণ্নতা।
যুদ্ধাবস্থার কারণে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বর্তমানে বন্ধ থাকায় হাজারো প্রবাসী শ্রমিকের নাড়ির টানে দেশে ফেরার পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তেমনই একজন কিশোরগঞ্জের কামাল আহমেদ। তিনি গত ২০ বছর ধরে কুয়েতের ‘ওয়াল আল নসিব’ নামে একটি ক্লিনিং কোম্পানিতে কাজ করছেন।
দীর্ঘ ৫ বছর পর এবার কেনাকাটা গুছিয়ে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কামাল আহমেদ জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তার এই যাত্রা স্থগিত হওয়ায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। বাড়িতে প্রতীক্ষায় থাকা সন্তানদের কাছে এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কামাল বলেন, “যুদ্ধ আমাকে দেশে যেতে দিল না। নিজেকে হয়তো বুঝিয়েছি, কিন্তু বাড়িতে আমার অবুঝ সন্তানদের কী বলব? তারা তো পথের দিকে চেয়ে আছে।”
একই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোহাম্মদ শাহিন আহমদ। ‘ট্রাস্ট ক্লিনিং’ কোম্পানিতে কর্মরত এই শ্রমিকের আয় বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধাবস্থার কারণে অতিরিক্ত উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি এবার ঈদের খরচের টাকাও দেশে পাঠাতে পারেননি। সন্তানদের জন্য নতুন পোশাক কিনতে না পারা তার জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরেক প্রবাসী সত্তরোর্ধ্ব মো. সাজ্জাদুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জের এই বাসিন্দা ১৮ বছর আগে জীবিকার তাগিদে কুয়েতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। গৃহকর্মীর ভিসা নিয়ে সেখানে গেলেও অধিক উপার্জনের আশায় প্রতি বছর নিজ কফিলকে (স্পন্সর) ৫০০ কুয়েতি দিনার দিয়ে তিনি বাইরে কাজ করতেন।
তবে বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে কাজের সংকটে তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বয়সের ভারে ক্লান্ত এই প্রবাসীর পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার ইচ্ছা থাকলেও পরিস্থিতির কারণে এবার তা সম্ভব হচ্ছে না। ঘরে বসে অলস সময় পার করা সাজ্জাদুলের কণ্ঠে ঝরে পড়ল হাহাকার।
মুন্সিগঞ্জের মো. শাহাবুদ্দিনের পরিস্থিতি যেন আরও সংকটাপন্ন। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে বৈধ কাগজপত্রহীন (আকামাহীন) অবস্থায় দিন কাটছে তার। বর্তমানে তিনি সরকারের সাধারণ ক্ষমার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
কুয়েত প্রবাসের এই দীর্ঘ সময়ে শাহাবুদ্দিন তার বাবা-মা উভয়কেই হারিয়েছেন, কিন্তু আইনি জটিলতায় দেশে ফিরতে না পারায় শেষবারের মতো তাদের দেখতে পাননি। বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় কর্মহীন শাহাবুদ্দিন জানান, আর্থিক সংকটের কারণে এবার তিনি পরিবারকে ঈদের কোনো অর্থ পাঠাতে পারেননি।
একইভাবে শোকাবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার রইস উদ্দিন। মাত্র ১৫ দিন আগে তার ৬ বছর বয়সি কন্যাসন্তান পানিতে ডুবে মারা যায়। চলমান যুদ্ধ ও বিমান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় তিনি মেয়ের মুখ দেখার শেষ সুযোগটিও হারিয়েছেন।
রইস উদ্দিন বলেন, “মেয়ে ফোনে বলেছিল ঈদে নতুন জামা কিনবে। আজ টাকা পাঠিয়েছি ঠিকই, কিন্তু আমার কলিজার টুকরা মেয়েটাই তো আর নেই।”
কুয়েতে ব্যবসায়িক খাতেও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রবাসী ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন।
প্রবাসী কমিউনিটি নেতা ও ব্যবসায়ী আবুল কাশেম পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে জানান, যুদ্ধের কারণে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে। অনেকে চাকরি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার বাইরে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ না থাকায় প্রবাসীরা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তবে সার্বিক পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল সৈয়দ তারেক হোসেন। তিনি জানান, নিরাপত্তার স্বার্থে এবার কুয়েতে বাংলাদেশ হাউসে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। তবে দূতাবাস আটকে পড়া যাত্রীদের সহায়তায় কাজ করে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, “কুয়েত এয়ারওয়েজ ও জাজিরা এয়ারওয়েজের ট্রানজিট ফ্লাইটে এসে যারা আটকা পড়েছিলেন, দূতাবাসের হস্তক্ষেপে তাদের সৌদি আরব হয়ে বিকল্প পথে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষার নিশ্চয়তা দিয়ে প্রবাসীদের গুজবে কান না দেওয়া এবং দূতাবাসের ভেরিফায়েড সোশ্যাল মিডিয়া পেইজে নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats