সারাটা দিনে হেথা হোথা চরে বেড়িয়ে পাখিরা যেমন সন্ধ্যাবেলা নিজ নীড়ে ফিরে যায়—মুখে তার কিছু খড়কুটো, না হয় কিছু আহার আপনজনের জন্য—ঠিক তেমনি এই ঈদে-বকরিদে আমরাও সারা বছর পর ছুটিতে গ্রামের বাড়ির দিকে আপনজনের কাছে যাই কত প্রকারের সব উপহার নিয়ে, তার হিসাব নেই। নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়ে যাই বটে, তবে তার অর্থমূল্য যত ক্ষুদ্রই হোক, আন্তরিকতার দাম কিন্তু অমূল্যই বটে।
আমাদের দুটি বৃহৎ উৎসব ঈদুল ফিতর আর কোরবানি ঈদ। এই দুই উৎসবের আনন্দ আমরা আপনজনের সঙ্গে উপভোগ করার জন্য ভীষণ আকুল থাকি। বিশেষ করে এই ঈদুল ফিতরে—যাকে আমরা বলি রোজা ভঙ্গের উৎসব। ছুটি যত বড়ই হোক, তাতে মন ভরে না কারোরই—আহা রে আরও দুদিন বেশি ছুটি হলে কী না মজা হতো, এই ভাবনা প্রায় সবার মধ্যেই দেখা যায়। তাই দেখি, ছুটি শেষেও ‘ওভার স্টে’ করি, কাজে–কর্মে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরতে লাগে যথেষ্ট সময়।
এই নীড়ে ফেরার জন্য যে যাত্রা, তার প্রধান বাহন তো বাস, ট্রেন, লঞ্চ—এ তিনটিই। দেখেন না, পড়ি কি মরি করে কোনো প্রকারে হাজার হাজার মানুষকে ঠেলেঠুলে নিজের জায়গা দখলের জন্য কী যুদ্ধটাই না করতে হয়। সময়ে টিকিট কেনা যাত্রীরা তো মোটামুটি নির্বিঘ্নে স্থান পেয়ে যান, কিন্তু দেরি করা মানুষগুলো বাহনের ছাদে, পাদানিতে, বাম্পারে—শুধু একটু যেতে পারলেই হয়। তাতেই তারা খুশি। এসবই কিন্তু ওই যে বললাম, নীড়ে ফেরা পাখির আনন্দে—আপন কুলায় পৌঁছানোটাই প্রধান লক্ষ্য—যেখানে অপেক্ষায় রয়েছে কারও পিতা–মাতা, কারও ভাই–বোন, কারো বা স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, কারও ভালোবাসার মানুষ।
আমারও ভীষণ ইচ্ছে করে ঈদে–বকরি ঈদে দেশে যেতে—কিন্তু সেই পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ইজান গ্রামে যাওয়া হয়ে ওঠে না কখনো—আত্মীয়স্বজন এখনো অনেকেই রয়েছেন সেখানে। যাওয়ার অনুরোধও আসে; কিন্তু হয় না নানান কারণে।
গেলে কিন্তু আমি ট্রেনেই যেতাম। আমার অতি প্রিয় বাহন যাত্রার জন্য। ছোট্টবেলা থেকে ট্রেনের ভক্ত আমি। আব্বা রেলে চাকরি করতেন বিধায় রেলের সঙ্গে সখ্য আমার। ফ্রি পাস ছিল আমাদের বছরে ছয়বার করে—আবার স্টুডেন্ট পাসও বেশ কবার পাওয়া যেত কনসেশনে। কী মজা যে পেতাম ট্রেনে চড়তে।
ওয়েলফেয়ার সেকশনে চাকরি ছিল আব্বার। প্রতিবছর রেলের টাইম–টেবিল ছাপানোর দায়িত্বটা ছিল এখানে। তাই বেশ কিছু টাইম–টেবিল বাসায় আসত, তার একটি দখল করতাম আমি। যখনই কোথাও যেতাম, সেটি যেত আমার সঙ্গে।
ট্রেন চলতে শুরু করলেই, তখন তো কয়লার ইঞ্জিন ছিল—কু-উ-উ ডাক দিয়ে নড়ে উঠত সে—আমি নড়েচড়ে বসতাম টাইম–টেবিল নিয়ে—পরের স্টেশনের নাম খুঁজে বের করে জানালায় বসে পড়তাম। রিজার্ভ করা সেকেন্ড ক্লাসে ছিল আমাদের যাতায়াত। আর আগে মনে পড়ে আমরা ইন্টার ক্লাসে যাতায়াত করতাম—এখন তো আর ইন্টার ক্লাস নেই, কবেই উঠে গেছে—ফার্স্ট, সেকেন্ড, ইন্টার আর থার্ড ক্লাস—এইভাবে ছিল। এখন ‘ইন্টার’ গায়েব।
যা–ই হোক, একটা করে স্টেশন আসত, আমার টাইম স্কেলে মিলিয়ে নিতাম। এরপর শুরু হতো টেলিফোনের পোল গোনা। কয়টা পোল হলে এক মাইল হয়, তা মুখস্থ ছিল—আব্বার হাতঘড়ি দেখে হিসাব বের করতাম, ট্রেনটা কত স্পিডে চলছে—এই অঙ্কে সাহায্য করতেন স্বয়ং আব্বা।
পাখির নাম লিখতাম খাতায়—খাতা নিয়ে যেতাম সঙ্গে—না নিয়ে গেলে স্টেশনে যে ম্যাগাজিন কিংবা পত্রিকা কিনতাম রাস্তায় পড়ার জন্য, তাতেই পেনসিল দিয়ে লিখতাম। আমার জার্নিগুলো বেশ লম্বা হতো—কখনো নাটোরে বড় বোনের বাড়ি, কখনো চুয়াডাঙ্গায় মেজ খালার ওখানে, নয়তো খুলনায় মেজ বোনের বাসায়। সে বেশ লম্বা যাত্রা। জগন্নাথগঞ্জ ঘাট হয়ে স্টিমারে পার হয়ে সিরাজগঞ্জ ঘাটে, সেখান থেকে ঈশ্বরদী, তারপর ভাগ হয়ে যেদিকে যাওয়া প্রয়োজন হতো, সেই মোতাবেক গাড়িবদল। পদ্মার এদিকে ছিল মিটার গেজ লাইন, ওদিকে বড় লাইন, মাঝে ব্রডগেজ।
আমি যেভাবে ফোনের পোল গুনতাম আর পাখির নাম লিখতাম খাতায় (যেটা বন্ধুদের কাছে বাহাদুরি নেওয়ার জন্য) তাতে জানালা খুলে বসে থাকতে হতো—এটা আব্বা প্রশ্রয় দিলেও আম্মা বকাবকি করতেন—জানালা দিয়ে ইঞ্জিনের কয়লা ঢুকছে বা ধুলা উড়ে আসছে বলে।
ট্রেনে উঠেই আব্বা ক্যাফেটেরিয়ায় অর্ডার দিতেন খাবারের। কখনো চা–নাশতার। তখন ওরা মাংসের কাটলেট দিত, যেটা আমার মোটেই পছন্দের ছিল না। এক পিস পাউরুটি চায়ে ভিজিয়ে খেয়ে মোটামুটি শখ মেটাতাম আর অপেক্ষা করতাম স্টিমারে উঠে কখন ডিনার হবে—সেটাও রেলেরই চমৎকার রান্না—আমার কাছে লোভনীয় ছিল চায়ের কাপে করে যে পুডিং দিত, সেটা। তার আগে মুরগির রানটাও আব্বা আমার পাতেই দিতেন। একমাত্র ছেলে হওয়ার যত রকম সুবিধা—সবই নেওয়া হতো বলতে পারেন।
ট্রেনে ভিড় তখনো ছিল, এখনো আছে। খুব একটা রকমফের নেই। তখন দেশে কত কম মানুষ ছিল, সেই হিসাবে ট্রেনের সংখ্যাও অনেক কম ছিল। এখন কত রকম এক্সপ্রেস ট্রেন, মেইল ট্রেন, কমিউটার ট্রেন বেরিয়েছে আর লোক বেড়েছে আগের চেয়ে বহু বহু গুণ বেশি। তাই প্রচণ্ড ভিড়। তারপরও মানুষ ওই প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে ট্রেন জার্নিটাই পছন্দ করে বলে আমার বিশ্বাস। কারণ, এই যাত্রা অনেক নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও উপভোগ্য।
জানালায় বসে যখন বাইরেটা দেখি, আনন্দে বুকটা ভরে যায়। দেশকে চেনা যায়, বোঝা যায়—কী সুন্দর আমার এই দেশ। শস্যখেতের সৌন্দর্য মুগ্ধ করবেই সবাইকে—কখনো দেখি কৃষকের হাল চষা, কখনো ফসল কাটা, কখন ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রা আর চড়ুইদের শস্যখেতে ছোটাছুটি—নদীতে নৌকা বাওয়া, দূরে পাহাড় অথবা গ্রামের ছবি দিগন্তে সব যখন ছোটে আমার উল্টো দিকে, সে এক অসাধারণ মজার ব্যাপার—আহা, গা–টা শিউরে ওঠে আমার। আমার লেখাটায় একটু পক্ষপাতিত্ব হলো—রেলের মানুষ তো, তাই একটু হলো আরকি! সব যাত্রারই ভিন্ন রকম আনন্দ আছে নিশ্চয়। পানিকে ভয় পাই বলে ওপথে সহজে চলাফেরা হয় না আমার আর বাসে চড়লে দম বন্ধ হয়ে আসে। তারপরও আমি বলব, রেলে চড়ার মজাই আলাদা, রেলের যাত্রাটা খুব মনে পড়ে আমার।
‘রেল গাড়ি ঝমাঝম/ পা পিছলে আলুর দম।’ রেল চলার সঙ্গে সঙ্গে ওর যে শব্দ হয়, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা কতবার যে গাইতাম এ ছড়া। কোরাসে গাইতাম।
জানি না, আজকালকার ছেলেমেয়েরা এটা জানে কি না। ডিজিটাল যুগে এসে আমাদের আমলের অনেক আনন্দই আজ মলিন হতে হতে বিলুপ্ত হয়ে এসেছে—তরুণ–তরুণীরা ‘টিকটক’ নির্মাণ করে মজা করতে করতে।
তবু এ–ও তো এক আনন্দ। তবে একে যতটা নির্মল রাখা যায়, সেই চেষ্টাই করা উচিত। লেখা দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে—শেষ করার আগে রেলের গল্পটা বলে নিই—ভারতবর্ষে ট্রেন এসেছিল সেই ১৮৫৩ সালে আর ইলেকট্রিক ট্রেন চালু হয়েছিল ১৯২৫ সালে বোম্বেতে (এখন মুম্বাই)।
এ দুটির প্রধান পার্থক্য ছিল চলার শুরুতে। আগের ট্রেনগুলো চলতে শুরু করত ঢিমেতালে, আস্তেধীরে আর ইলেকট্রিক ট্রেন সাইরেন বাজাল কি হুশ করে ছুটতে শুরু করল।
সেই তখনকার ঘটনা। ইলেকট্রিক ট্রেন চালু হয়েছে কেবল। এক ভদ্রলোক তাঁর পরিবারকে উঠিয়ে দিতে এসেছিলেন স্টেশনে, পরিবার যাচ্ছে দেশের বাড়ি। তিনি ছুটি না পাওয়ায় যেতে পারছেন না। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে আসছে, বাচ্চাটি জানালায় বসে কাঁদছে—বাবা বাইরে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন—অনেক বুঝিয়ে বাচ্চাকে যখন একটা স্নেহচুম্বন দিতে গেলেন, তখনই হুশ করে সাইরেন দিয়ে ট্রেন দিল ছুট—তাঁর চুমু দেওয়া হলো না বাচ্চাটাকে; বরং চুমুটা গিয়ে পড়ল তার দুই সিট পরে বসা আরেকজনের গালে!
ঈদ মোবারক।
আপনাদের সবার ঈদযাত্রা শুভ হোক, নিরাপদ হোক, আনন্দে ভরপুর হোক।
আবুল হায়াত, অভিনেতা ও নাট্য পরিচালক
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats