আশা ভোসলে ও শেখ সাদী খান। ছবি: কোলাজ
ভারতীয় সংগীতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। ৯২ বছর বয়সে আশা ভোসলের বিদায়ে শুধু এক শিল্পীর নয়, একটি সময়েরও সমাপ্তি ঘটল—যে সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য স্মৃতি, সুর আর ইতিহাস। এই প্রয়াণের খবরে ব্যথিত হয়েছেন দেশের সংগীত অঙ্গনের মানুষও। তাঁদের মধ্যেই একজন সংগীত পরিচালক ও সুরকার শেখ সাদী খান। তাঁর স্মৃতিতে ফিরে এসেছে সেই সময়, যখন তিনি নিজের সুরে আশা ভোসলের কণ্ঠে গান ধারণের বিরল অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। কিংবদন্তি এই শিল্পীর সঙ্গে কাজ করার সেই দিনগুলোর গল্পই তিনি তুলে ধরেছেন।
খবরটি শুনে বেশ ব্যথিত হয়েছি। এমন গুণী মানুষের প্রয়াণের কথা শুরুতেই নিয়ে গেল সেই ১৯৮৬-৮৭ সালের দিনগুলোতে। যখন বেশ কিছু সিনেমার জন্য অনেকগুলো গান প্রস্তুত করছিলাম। সেই সময়ে উপমহাদেশজুড়ে আলোচিত গায়িকা ছিলেন আশা ভোসলে। নানা ভাষায় একের পর এক গান গাইছেন। শ্রোতারা আশা ভোসলের গান বলতে যেন পাগল। কেনই–বা হবেন না, কারণ আশা ভোসলে ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী। এমন ভার্সেটাইল আর্টিস্ট আমি জীবনে আর দেখিনি। এমন কেউ হয়তো আর আসবেন না।
আমি পরিকল্পনা করি কীভাবে বাংলাদেশের সিনেমায় এমন উঁচু শিল্পীর গান ব্যবহার করা যায়। আমার পরিকল্পনা শুনে সিনেমার প্রযোজকও রাজি হন। তিনিও আশা ভোসলেকে দিয়ে গান করাতে চান। কিন্তু এমন গুণী শিল্পীকে ছোঁয়া কঠিন কাজ। তাঁর কাছে কীভাবে যাওয়া যায়, সেই পরিকল্পনা করি। আমার ইচ্ছা, যেভাবেই হোক তাঁর কাছে যেতেই হবে। তাঁর গান সিনেমাতে লাগবেই।
আশা ভোসলের সঙ্গে আমার পরিবারের লোকদের যোগাযোগ ছিল। আমার মেজ ভাই ওস্তাদ বাহাদুর খাঁ মুম্বাইয়ে গান করতেন। তাঁরা একসঙ্গে গানও করেছেন। তাঁর মাধ্যমেই পরে মিউজিক অ্যারেঞ্জার দিলীপ রায় যোগাযোগ করিয়ে দেন। তিনি ছিলেন আমার ভাইয়ের ছাত্র। দিলীপ রায় কথা বলে সব ব্যবস্থা করেন। যাহোক, পরে আমাদের আশা ভোসলের সঙ্গে দেখা হলো। পরিচয় দিলাম, আমি ওস্তাদ বাহাদুর খাঁর ভাই, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ভাতিজা। আমি তখন অনেক ছোট। তিনি সাদরে আমাদের গ্রহণ করলেন। তাঁর অসাধারণ স্নেহের স্মৃতিকথা এখনো মনে আছে। তিনি উর্দুতে বলেছিলেন। বাংলায় যার অর্থ, ‘তুমি তো ঐতিহ্যবাহী সংগীত পরিবারের সন্তান। তোমারই তো সংগীত হওয়ার কথা। তোমাকে দিয়েই সংগীত হবে।’
আশা ভোসলেকে সিনেমার গানের কথা বললাম। পরে আমি গানটির সুর করে তাঁকে শোনালাম, ‘কাল সারা রাত ছিল স্বপ্নেরও রাত’। গানটি নজরুল ইসলাম বাবুর লেখা। আশা ভোসলে গুনগুন করে গানটি কণ্ঠে তুললেন। মেলোডি গান হিসেবে এটি তাঁর পছন্দ হলো। একবার আমার দিকে তাকিয়ে উর্দুতে প্রশংসা করলেন। বুঝতে পারলাম তিনি বলছিলেন, ‘তুমি খুব চমৎকার সুর করেছ।’ তিনি ভাঙা ভাঙা বাংলায় কথা বলতে পারতেন। গানটি তাঁর পছন্দ হয়েছে, সেটা আবারও জানালেন। সেদিনের সেই মুহূর্তটা ভোলার নয়। সেদিন দেখা হওয়ার মুহূর্তটি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্মৃতি।
কিন্তু গানটিতে কণ্ঠ দেবেন কীভাবে—এ নিয়ে চিন্তায় পড়ে যাই। আমাদের বড় স্টুডিও ছিল। কিন্তু তাঁর মতো বড় মাপের শিল্পীকে বাংলাদেশে এনে গান করানো অনেক খরচের ব্যাপার। তাঁর সঙ্গে তিন–চারজন লোক থাকেন। সব মিলিয়ে এত বড় শিল্পীকে মেনটেইন করা, সামলানোও কঠিন। পরে তিনি গানটি ভয়েস রেকর্ডিং করে পাঠান। গানটি আমরা হাতে পেয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যাই। বাংলা সিনেমায় তিনি খুব গান করেননি। যৌথ প্রযোজনার দু–একটি সিনেমায় গান করেছিলেন। পরে নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে গানটি ‘প্রেমের প্রতিদান’ সিনেমায় ব্যবহার করা হয়। সিনেমাটির পরিচালক ছিলেন ফজল আহমেদ বেনজীর। এই গান বেশ আলোচনায় আসে। আজ পেছনে তাকাতে এটাই মনে হয়, আমার সংগীত ক্যারিয়ারে আশা ভোসলেকে দিয়ে গান গাওয়ানো অনেক বড় অর্জনের একটি।
সেই সময়ে একসঙ্গে আরও তিনটি গান রেকর্ডিং করানো ছিল। সেই গানগুলো ‘হেফাজত’ নামে একটি সিনেমায় ব্যবহার করানোর কথা ছিল। কিন্তু সিনেমার পরিচালক মারা যাওয়ায় সিনেমাটি আর আলোর মুখ দেখেনি। দুটি গান অপ্রকাশিতই রয়ে গেছে। তবে আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে, আশা ভোসলের একটি গান অনুদানের সিনেমা ‘দেয়া নেয়া’তে দর্শক পাবেন। এটি পরিচালনা করেছেন সাদেক সিদ্দিকী। গানটির শিরোনাম ‘চোখে আমার ভালোবাসার মহুয়া আছে আঁকা’। এটাই হয়তো হবে বাংলা সিনেমায় তাঁর গাওয়া শেষ গান। আমার জানামতে, তিনি খুব বেশি বাংলা সিনেমায় গান করেননি। বংশপরম্পরায় আমরা সংগীতের মধ্যে ছিলাম বলেই হয়তো সেরা এ অর্জনটি হয়েছে। তাঁর সঙ্গে গান নিয়ে থাকতে পারাটা এখনো বিরাট ভাগ্যের বলে মনে করি। আজ (গতকাল) তাঁর প্রয়াণের খবর ব্যথিত করেছে। এমন মানুষ, শিল্পী হয়তো আর আসবে না।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats