১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে পোল্যান্ডের আকাশে জার্মান যুদ্ধবিমানছবি: মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ও�
আজ থেকে ৮৭ বছর আগে এক একনায়কের উগ্র জাত্যভিমান, চরম প্রতিশোধস্পৃহা আর সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছিল এক ভয়াবহ যুদ্ধের মুখে। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভোররাতে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই পোল্যান্ডে আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেন নাৎসি জার্মানির নেতা অ্যাডলফ হিটলার। মানব ইতিহাসের এ কলঙ্কজনক অধ্যায় নিয়ে প্রথম আলোর আজকের ‘ফিরে দেখা’র এ বিশেষ প্রতিবেদন।
রাতের অন্ধকারে হঠাৎ গ্লাইভিৎস শহরের রেডিও স্টেশনে ঢুকে পড়ল একদল সশস্ত্র লোক। পোলিশ বিদ্রোহীদের পোশাক পরা ওই লোকেরা জার্মানির সীমান্তবর্তী শহরটির রেডিও স্টেশনের কর্মীদের আটক করে সেটির দখল নেয়। এরপর পোলিশ ভাষায় ভেসে এল জার্মানবিরোধী একটি বার্তা, ‘এটি গ্লাইভিৎস। এখন পোলিশদের হাতে।’
বর্ণনা শুনে মনে হতে পারে, জার্মান ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে পোল্যান্ড। কিন্তু সত্যিটা ছিল ঠিক এর উল্টো। হামলাকারীরা ছিলেন নাৎসি জার্মানির আধা সামরিক বাহিনী শুৎসশতাফেলের সদস্য, যাঁরা এসএস নামে বেশি পরিচিত।
পোল্যান্ড আগে জার্মানিতে হামলা চালিয়েছে—বিশ্বের সামনে এমন এক নাটক সাজাতে অ্যাডলফ হিটলার এ কাণ্ড ঘটান। পোল্যান্ডে সামরিক অভিযান শুরু করার আগে এ আগ্রাসনের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে তাঁর একটি অজুহাতের প্রয়োজন ছিল।
এ নাটকের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভোররাতে জার্মান যুদ্ধজাহাজ শ্লেসভিগ-হলস্টাইন বাল্টিক সাগর-সংলগ্ন ডানজিগ বন্দরের কাছে পোলিশ সামরিক ঘাঁটি ভেস্টারপ্লাটে গোলাবর্ষণ শুরু করে। একই সঙ্গে জাহাজে থাকা প্রশিক্ষিত জার্মান নৌ সেনারা পোলিশ উপকূলে হামলে পড়েন।
এভাবেই এক ভোরে আকস্মিক আক্রমণের মধ্য দিয়ে সূচনা হয়েছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও বিধ্বংসী অধ্যায়—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভেতরই লুকিয়ে ছিল এ যুদ্ধের বীজ
মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে জার্মানির নেতৃত্বাধীন অক্ষশক্তির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। পরাজিত জার্মানির ওপর বিজয়ী মিত্রশক্তি ১৯১৯ সালের ‘ভার্সাই চুক্তি’ চাপিয়ে দেয়। চুক্তিটির নানা অসম শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয় জার্মানি।
এ চুক্তির কঠোর শর্তে জার্মানিকে ভূখণ্ড ছাড়তে হয়। সামরিক বাহিনী ও অস্ত্রশক্তি কঠোরভাবে সীমিত করা হয়। দেশটির ওপর বিশাল যুদ্ধ ক্ষতিপূরণের বোঝাও চাপানো হয়। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে জার্মানি।
জার্মানদের চোখে ভার্সাই চুক্তি ছিল একটি ‘আরোপিত শান্তিচুক্তি’। তারা চুক্তিটি জাতীয় অপমান হিসেবে দেখত। ফলে জার্মান সমাজে জন্ম নেয় তীব্র ক্ষোভ, ঘৃণা ও প্রতিশোধের স্পৃহা।
এমন প্রেক্ষাপট থেকেই উঠে আসেন অ্যাডলফ হিটলার। তিনি জার্মান জাতিকে অপমান মোচন, প্রতিশোধ গ্রহণ এবং এক নতুন মহান সাম্রাজ্য পুনর্গঠনের স্বপ্ন দেখান।
উগ্র জাতীয়তাবাদী
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর জার্মান রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে অতি ডানপন্থী ‘জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া হিটলার ১৯১৯ সালে এ দলে যোগ দেন।
১৯২০ সালে দলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি’। দলটি পরে সংক্ষেপে নাৎসি পার্টি নামে পরিচিতি পায়। একই বছর দলের ইশতেহারের ২৫ দফা তুলে ধরেন হিটলার। দফার মধ্যে অন্যতম ছিল ভার্সাই চুক্তি বাতিল করা।
১৯২১ সালে নাৎসি পার্টির নেতা নির্বাচিত হন হিটলার। তাঁর উগ্র জাতীয়তাবাদী বক্তব্য, প্রচারকৌশল ও সাংগঠনিক দক্ষতায় দলটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
১৯৩২ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে পার্লামেন্টে সর্বাধিক আসন পেয়ে নাৎসি পার্টি জার্মানির বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।
জার্মানির প্রেসিডেন্ট পল ফন হিন্ডেনবার্গ ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি হিটলারকে জার্মান চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দেন।
চ্যান্সেলর হওয়ার পর হিটলার প্রথমেই নিজের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার উদ্যোগ নেন। ১৯৩৩ সালের মার্চে ‘এনাবলিং অ্যাক্ট’ পাসের মাধ্যমে তিনি পার্লামেন্ট ছাড়াই আইন প্রণয়নের পূর্ণ ক্ষমতা লাভ করেন। তাঁর ক্ষমতা হয় নিরঙ্কুশ।
১৯৩৪ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ মারা যান। এরপর হিটলার চ্যান্সেলর ও প্রেসিডেন্ট পদ একীভূত করে নিজেকে ঘোষণা করেন জার্মানির ‘ফুয়েরার’ বা সর্বোচ্চ নেতা। এভাবেই একনায়ক হয়ে ওঠেন হিটলার।
নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত হওয়ার পর হিটলার তাঁর সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য পূরণে পদক্ষেপ নিতে থাকেন। লক্ষ্য পূরণে প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে হিটলার ১৯৩৬ সালের মার্চে রাইনল্যান্ডে জার্মানির সামরিক নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
উল্লেখ্য, ভার্সাই চুক্তি অনুযায়ী রাইনল্যান্ডকে ‘সামরিকীকরণমুক্ত অঞ্চল’ ঘোষণা করা হয়েছিল। অর্থাৎ এ অঞ্চলে জার্মানি কোনো সেনা বা সামরিক সরঞ্জাম রাখতে পারবে না, যাতে ফ্রান্স নিরাপত্তা বোধ করে।
পরে হিটলার ওই চুক্তি ভেঙে রাইনল্যান্ডে আবার জার্মান সৈন্য পাঠান। মিত্রশক্তি (ফ্রান্স ও ব্রিটেন) তখন কোনো কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ায় হিটলারের সাহস ও শক্তি বেড়ে যায়। এ ঘটনা পরবর্তী সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করেছিল।
ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও লুক্সেমবার্গের সীমান্ত–সংলগ্ন হওয়ায় ইউরোপীয় রাজনীতি ও ভূরাজনীতিতে রাইনল্যান্ড অঞ্চল ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
যাহোক, দুই বছর পর ১৯৩৮ সালের মার্চে হিটলার অস্ট্রিয়াকে জার্মানির সঙ্গে যুক্ত করেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে মিউনিখ চুক্তির মাধ্যমে তিনি চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেতেনল্যান্ড অধিগ্রহণ করেন। ১৯৩৯ সালের মার্চে পুরো চেকোস্লোভাকিয়াই দখল করেন তিনি।
এ সময় ব্রিটেন ও ফ্রান্স যুদ্ধ এড়াতে হিটলারকে বারবার ছাড় দিয়ে যাচ্ছিল, যা ইতিহাসে ‘তুষ্টনীতি’ নামে পরিচিত। কিন্তু এ নীতি হিটলারের আগ্রাসী মনোভাবকে আরও উসকে দেয়। হিটলারের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হয় পোল্যান্ড।
কেন নিশানায় পোল্যান্ড
ভার্সাই চুক্তির অধীন জার্মানির ডানজিগ শহর ও আশপাশের এলাকা রাষ্ট্রপুঞ্জের (লিগ অব নেশনস) তত্ত্বাবধানে একটি স্বাধীন নগররাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পোল্যান্ডকে একটি করিডরও (পোলিশ করিডর) দেওয়া হয়। করিডরটি জার্মানির পূর্ব প্রুশিয়াকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং বাল্টিক সাগরে পোল্যান্ডের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে।
হিটলার ১৯৩৯ সালের মার্চে ডানজিগের মালিকানা ফেরত চান। শহরটির অধিকাংশ অধিবাসী ছিল জার্মানভাষী, কিন্তু প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে পোল্যান্ডের সঙ্গে এর বিশেষ সংযোগ ছিল।
পাশাপাশি হিটলার পোল্যান্ডের মধ্য দিয়ে পূর্ব প্রুশিয়ায় যাওয়ার জন্য সরাসরি সড়ক ও রেলপথের দাবি জানান। হিটলারের এ দাবি পোল্যান্ড প্রত্যাখ্যান করলে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়।
১ সেপ্টেম্বর ভোররাত ৪টা ৪৫ মিনিটে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই নৌ ও আকাশপথে পোল্যান্ডের ওপর আক্রমণ শুরু করে জার্মানি।
নাৎসি বাহিনী পোল্যান্ডে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালায়। নির্বিচার মানুষ হত্যা করে তারা। এ হত্যাযজ্ঞ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে সংঘটিত হলোকাস্টের বিভীষিকার পূর্বসূচনা।
যুক্তরাজ্য-ফ্রান্সের যুদ্ধ ঘোষণা
হিটলার ভেবেছিলেন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সরাসরি কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেবে না। কিন্তু এ ভাবনা ঠিক হয়নি। উভয় দেশ জার্মানিকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা পাঠায়। অবিলম্বে পোল্যান্ড থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে, নইলে যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হবে।
শেষ আলটিমেটাম পাওয়ার পর হিটলার কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকেন। তারপর হতাশাভরা চোখে তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিবেনট্রপকে প্রশ্ন করেন, ‘এখন কী হবে?’
আলটিমেটামে জার্মানি সাড়া না দিলে ১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্রথমে যুক্তরাজ্য, পরে ফ্রান্স যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে ইউরোপজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়।
তবে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও জার্মানির অগ্রযাত্রা থামাতে কার্যত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। ফলে ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই জার্মান বাহিনী পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশর উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়।
যুক্তরাজ্যের সমস্যা ছিল, দেশটি তখনো বৃহৎ সামরিক অভিযানের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না। আর ফ্রান্স সীমান্ত বরাবর একটি সীমিত আক্রমণ শুরু করলেও দ্রুত তা থেমে যায়। ফলে অপ্রতিরোধ্য গতিতে জার্মান সেনারা পোল্যান্ড দখল করতে শুরু করেন।
অক্ষশক্তিতে কারা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির প্রধান মিত্র ছিল ইতালি ও জাপান। এদের সঙ্গে পরে হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, স্লোভাকিয়া, ক্রোয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশ যুদ্ধে যুক্ত হয়।
ইতালি ১৯৪০ সালে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে। উত্তর আফ্রিকা, পূর্ব আফ্রিকা ও বলকান অঞ্চলে ইতালীয় বাহিনী যুদ্ধ করে। তবে ১৯৪৩ সালে মিত্রবাহিনী ইতালিতে অভিযান চালানোর পর দেশটি আত্মসমর্পণ করে এবং পরে জার্মানির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
জাপান ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবারে মার্কিন নৌঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে টেনে আনে। এরপর জাপান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে। হাঙ্গেরি ১৯৪১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জার্মানির যুদ্ধে যোগ দেয় এবং পূর্ব ফ্রন্টে সেনা পাঠায়। রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, স্লোভাকিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডও অক্ষশক্তিতে যোগ দিয়ে জার্মানির হয়ে যুদ্ধে জড়ায়।
হিটলারের সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ
২২ জুন ১৯৪১, ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন অ্যাডলফ হিটলারের নির্দেশে জার্মান বাহিনীর এক বিশাল বহর সোভিয়েত ইউনিয়ন জয় করার উদ্দেশ্যে পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করে। তত দিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইউরোপের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা হিটলারের দখলে চলে গেছে।
জার্মান বাহিনীর তিনটি বড় বড় দল সোভিয়েত ইউনিয়ন দখলের পথে যাত্রা করে। তিন দলে কম করে হলেও ৩০ লাখ সেনা ছিল। দুর্বার জার্মান বাহিনী ইউক্রেন হয়ে রাশিয়ার ইউরোপ অংশের অনেকটা দখল করে ফেলে। হিটলারের লক্ষ্য তখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করা।
স্তালিনগ্রাদে সোভিয়েত ইউনিয়নের রেড আর্মির সঙ্গে জার্মান বাহিনীর ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধ ইতিহাসে র্যাটেনক্রিগ বা ইঁদুরের যুদ্ধ নামে পরিচিত। সে সময়ে শক্তি ও কৌশলের দিক দিয়ে জার্মান বাহিনী রেড আর্মির চেয়ে কয়েক গুণ শক্তিশালী। তারপরও রেড আর্মির প্রবল প্রতিরোধের মুখে স্তালিনগ্রাদ যুদ্ধে হেরে যায় জার্মানি।
প্রায় ছয় মাস যুদ্ধ চলার পর ১৯৪৩ সালের ৩১ জানুয়ারি জার্মান সেনারা আত্মসমর্পণ শুরু করেন। ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ জার্মান সেনা আত্মসমর্পণ করেন।
স্তালিনগ্রাদ যুদ্ধে প্রায় দেড় লাখ জার্মান সেনা নিহত হয়েছিলেন। বন্দী হয়েছিলেন আরও প্রায় এক লাখ সেনা। যদিও এ যুদ্ধে সোভিয়েত রেড আর্মির ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহত মানুষের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি ছিল। তারপরও বলা হয়, স্তালিনগ্রাদে এ পরাজয় দুর্বার জার্মান বাহিনীর মনোবল অনেকটা ভেঙে দিয়েছিল।
নাৎসি বাহিনীর আত্মসমর্পণ
স্তালিনগ্রাদে হেরে যাওয়ার পর জার্মানি আরও দুই বছরের বেশি যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ১৯৪৪ সালে সোভিয়েত বাহিনী পূর্ব দিক থেকে এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও এদের মিত্ররা পশ্চিম থেকে জার্মানির দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
১৯৪৫ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে সোভিয়েত বাহিনী বার্লিনে প্রবেশ করে। ৩০ এপ্রিল বার্লিনের ভূগর্ভস্থ বাংকারে আত্মহত্যা করেন অ্যাডলফ হিটলার।
হিটলারের মৃত্যুর পর কার্ল দনিৎসের নেতৃত্বাধীন জার্মান সরকার মিত্রবাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের উদ্যোগ নেয়। ৭ মে ফ্রান্সের রেইমসে জার্মান সশস্ত্র বাহিনী নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করে। দলিল অনুযায়ী, ৮ মে রাত ১১টা ১ মিনিটে ইউরোপে সব জার্মান সামরিক অভিযান বন্ধের কথা হয়।
সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুরোধে ৮ মে বার্লিনে আত্মসমর্পণের আরেকটি আনুষ্ঠানিক দলিলে স্বাক্ষর করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে।
কিন্তু অক্ষশক্তির আরেক দেশ জাপান তখনো অনমনীয়, কিছুতেই তারা পরাজয় স্বীকার করবে না। ফলে মূল রণক্ষেত্র ছেড়ে যুদ্ধ তখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। জাপানকে পরাস্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট দেশটির দুই শহরে পারমাণবিক বোমা হামলা চালায়।
ভয়াবহ ওই হামলার পর ১৫ আগস্ট আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেয় জাপান। তবে আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করা হয় ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে সারা ইউরোপ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ওই বোমা হামলার মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবার পরিকল্পিতভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার করা হয়। যুদ্ধে সারা বিশ্বে প্রায় ১১ কোটি নারী ও পুরুষ অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। স্থল, সমুদ্র ও আকাশে নিয়মিত যুদ্ধের সময়, যুদ্ধাপরাধের শিকার হয়ে, গণহত্যায় নিহত হয়ে এবং বাস্তুচ্যুতির কারণে ৬–৭ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাঁদের বড় অংশ ছিল সাধারণ মানুষ।
এ যুদ্ধে শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নেই প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। চীন-জাপান যুদ্ধের কারণে চীনে নিহত হন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ। এ ছাড়া জার্মানিতে ৭০ লাখ ও পোল্যান্ডে ৬০ লাখ মানুষ নিহত হন।
তবে শুধু মৃত্যুর সংখ্যা বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দিয়ে এ যুদ্ধের ভয়াবহতা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ গোটা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকেই আমূল পাল্টে দিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা এবং পরে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়।
(তথ্যসূত্র: হিস্ট্রি ডটকম, হলোকাস্ট এনসাইক্লোপিডিয়া, ব্রিটানিকা, ন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু মিউজিয়াম, অটোমিক হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ও দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট)
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats