ভারত ও পাকিস্তানে স্বাধীনতা উদ্যাপন হচ্ছে। ১৯৪৭ সালে ভারতের বিভাজন ছিল ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ৭৯ বছর আগে ভারতের ১৭ লাখ বর্গমাইল বিস্তৃত ভূখণ্ডে ছড়িয়ে থাকা ৩৯ কোটি মানুষের দেশকে এ মাসের ১৪-১৫ তারিখে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছিল। সে সময় ভারতে ছিল ১৭টি প্রত্যক্ষ শাসিত প্রদেশ এবং ৫৬৫টি বিভিন্ন আকারের দেশীয় রাজ্য। বিভাজনের ফলে দুটি রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান জন্ম নিল, যার একটি আবার দুই অংশে বিভক্ত ছিল এক হাজার মাইলের বেশি দূরত্বে।
এই বিভাজন ছিল ব্রিটিশদের আরোপিত একটি রাজনৈতিক সমঝোতা ভারতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের দ্বন্দ্ব প্রশমনের উদ্দেশ্যে। এর প্রধান চালিকা শক্তি ছিল তথাকথিত দ্বিজাতি তত্ত্ব—যে তত্ত্বে বলা হয়েছিল, হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি, এবং ব্রিটিশরা চলে গেলে তারা একসঙ্গে থাকতে পারবে না। আগস্ট ১৯৪৭-এ সেই তত্ত্বের ভিত্তিতেই দুটি দেশ জন্ম নিল। পরিহাসের বিষয়, দ্বিতীয় দেশটি মাত্র ২৪ বছর টিকে ছিল এবং ১৯৭১ সালে আবার ভেঙে তৃতীয় দেশ বাংলাদেশ জন্ম নিল, যা দ্বিজাতি তত্ত্বকে বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে।
এই মাসে সেই ঐতিহাসিক বিভাজনের ৭৯তম বার্ষিকী। আজ চিন্তার দিন ৭৯ বছর আগের সেই বিভাজনের মানবিক মূল্য কত ছিল? আর সেই বিভাজনের রেখাটি কীভাবে আঁকা হয়েছিল? আমরা সবাই স্যার সিরিল র্যাডক্লিফের নাম জানি। কিন্তু তিনি কি একজন আমলা ছিলেন, রাজনীতিবিদ ছিলেন, নাকি ব্রিটিশ সরকারের নিযুক্ত কোনো ঠিকাদার?
র্যাডক্লিফের আঁকা রেখা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল পাঞ্জাব ও বাংলাকে; কারণ, এই দুই জনবহুল প্রদেশকে তিনি অত্যন্ত স্বেচ্ছাচারীভাবে ভাগ করেছিলেন। আনুমানিক ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল এবং প্রায় ১৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়—মূলত পাঞ্জাবে। অগণিত সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছিল, আর মানুষের দুর্ভোগ ছিল অবর্ণনীয়।
স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ মাত্র পাঁচ সপ্তাহে ভারত-পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারণ করেন পুরোনো মানচিত্র, অযথার্থ জনগণনা তথ্য ও কোনো মাঠ জরিপ ছাড়াই। ভারতীয় উপমহাদেশে তিনি কখনোই আসেননি। পক্ষপাতহীনতার অজুহাতে ব্রিটিশরা তাঁকে বেছে নিয়েছিল। তিনি ৮ জুলাই ১৯৪৭-এ ভারতে এসে পাঞ্জাব ও বাংলার ১ লাখ ৭৫ হাজার বর্গমাইল ভূখণ্ড এবং প্রায় ৯ কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব পান।
র্যাডক্লিফ দুটি বাউন্ডারি কমিশন গঠন করেন; একটি পাঞ্জাবের জন্য, একটি বাংলার জন্য। প্রতিটি কমিশনে ছিলেন চারজন স্থানীয় বিচারপতি; দুজন কংগ্রেস মনোনীত, দুজন মুসলিম লীগ মনোনীত। কিন্তু স্থানীয় রাজনীতিবিদেরা প্রতিটি বিষয়ে অচলাবস্থায় পৌঁছালে সব সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত র্যাডক্লিফের হাতে চলে যায়।
দিল্লির এক নির্জন বাংলোতে প্রচণ্ড গরমে র্যাডক্লিফ কাজ করতেন, নিরাপত্তার কারণে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। তাঁর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত প্রশাসনিক ও যান্ত্রিক।
র্যাডক্লিফের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ ছিল ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সীমানা আঁকা; মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ও হিন্দু-শিখ সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা আলাদা করা। কিন্তু একটি অস্বচ্ছ ধারা তাঁকে ‘অন্যান্য বিষয়’ বিবেচনার সুযোগ দেয়; যার ফলে তিনি নদী, রেলপথ, সড়ক, ও সেচ, খালব্যবস্থার মতো বাস্তবিক বিষয়ও রেখা নির্ধারণে ব্যবহার করেন।
আমরা র্যাডক্লিফের তড়িঘড়ি করা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে পারি, ব্রিটিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারি এবং সেই অযৌক্তিক রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে পারি। কিন্তু আমরা সেই মৃত মানুষদের ফিরিয়ে আনতে পারি না, কিংবা কোটি মানুষের দুর্ভোগের ক্ষতিপূরণ দিতে পারি না।
সময় ছিল মাত্র এক মাস; মাঠ পর্যবেক্ষণের সুযোগ ছিল না। তাই তিনি ১৯৪১ সালের জনগণনা ও পুরোনো মানচিত্রের ওপর নির্ভর করেন। এমনকি রাজনৈতিক সমন্বয়ের জন্য তিনি তাঁর প্রথম খসড়ায় লাহোরকে ভারতের অংশ হিসেবে দেওয়ার পরিকল্পনা বদলে পাকিস্তানকে দেন; কারণ, কলকাতা ইতিমধ্যেই ভারতের অংশ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল।
কিন্তু সবচেয়ে রহস্যময় ঘটনা ছিল বিভাজন মানচিত্রের ঘোষণা—১৭ আগস্টে, স্বাধীনতা উদ্যাপনের দুই দিন পর। র্যাডক্লিফ ১২ আগস্টেই কাজ শেষ করেছিলেন। ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ইচ্ছাকৃতভাবে মানচিত্র প্রকাশ বিলম্বিত করেন—স্বাধীনতা উদ্যাপন নষ্ট হওয়া এড়াতে এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে আসন্ন বিশৃঙ্খলার দায় থেকে রক্ষা করতে। কী অজুহাত!
অফিস কক্ষে বসে আঁকা সেই রেখা পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের বহু গ্রাম, বাড়ি, জমি, এমনকি সেচের খালকে মাঝখান থেকে কেটে দেয়। আজও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এমন পরিবার আছে, যাদের বাড়ির একাংশ বাংলাদেশে, অন্য অংশ ভারতে।
মানচিত্র প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানব ইতিহাসের বৃহত্তম গণ-অভিবাসন শুরু হয়—১৪ মিলিয়নের বেশি মানুষ নতুন সীমানা পেরিয়ে পালাতে বাধ্য হয়। ভয়াবহ দাঙ্গা ও এক মিলিয়নের বেশি মৃত্যুর জন্য নিজের আঁকা রেখাকে দায়ী মনে করে র্যাডক্লিফ তাঁর দুই হাজার পাউন্ড সম্মানী গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন, নিজের সব নোট পুড়িয়ে ফেলেন এবং পরদিনই দেশ ছেড়ে চলে যান—আর কখনো ফিরে আসেননি।
১৯৪৭ সালের ভারতের বিভাজনের সহিংসতা ছিল কেবল সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিস্ফোরণ নয়; এটি ছিল বহুস্তরীয় রাজনৈতিক ব্যর্থতা, প্রশাসনিক অরাজকতা এবং মানুষের অস্তিত্বগত নিরাপত্তাহীনতার এক সম্মিলিত বিপর্যয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তেজনা, ব্রিটিশ শাসনের হঠাৎ অবসান এবং ক্ষমতার শূন্যতা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যেখানে গুজব, ভয়, ও প্রতিশোধপরায়ণতা মুহূর্তের মধ্যে জনতার আচরণকে বদলে দিতে পারে। ধর্মীয় পরিচয় তখন অস্ত্র হয়ে ওঠে, আর রাষ্ট্রের পতন সেই অস্ত্রকে ব্যবহার করার সুযোগ করে দেয়।
র্যাডক্লিফের আঁকা রেখা, যা মাত্র কয়েক সপ্তাহের প্রস্তুতিতে নির্ধারিত হয়েছিল—রাতারাতি গ্রাম, শহর, পরিবার, সম্প্রীতি এবং শতাব্দীপ্রাচীন সামাজিক বিন্যাসকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে দেখেছিল তাদের বাড়ি, তাদের মাটি, তাদের পরিচয়—সবকিছুই নতুন এক রাষ্ট্রের অন্তর্গত। এই আকস্মিক পরিবর্তন ভয়কে সহিংসতায় রূপান্তরিত করে; প্রতিবেশী প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, আর নিরাপত্তাহীনতার ঢেউ লাখো মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে।
আজ, যখন আমরা বিভাজনের নবম দশকে প্রবেশ করছি, আমাদের উচিত সেই ঘটনার রাজনৈতিক ও মানবিক মূল্য আরও গভীরভাবে পুনর্বিবেচনা করা। ১৯৪৭ সালের সিদ্ধান্ত ছিল এমন এক ঐতিহাসিক মোড়, যার ভার তিন দেশের এক-পঞ্চমাংশ জনগোষ্ঠী বহন করেছে—রক্ত, অশ্রু ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। আমরা সেই বিভাজন বাতিল করতে পারি না; ইতিহাসের চাকা পেছনে ঘোরানো যায় না।
আমরা র্যাডক্লিফের তড়িঘড়ি করা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে পারি, ব্রিটিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারি এবং সেই অযৌক্তিক রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে পারি। কিন্তু আমরা সেই মৃত মানুষদের ফিরিয়ে আনতে পারি না, কিংবা কোটি মানুষের দুর্ভোগের ক্ষতিপূরণ দিতে পারি না।
তবু আমাদের সামনে একটি নৈতিক দায়িত্ব রয়ে গেছে—ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বর্তমান নেতৃত্বকে সতর্ক করা যে তারা যেন ধর্ম, জাতি বা পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে আবার বিভক্ত না করেন। বিভাজনের ক্ষত আজও পুরোপুরি শুকায়নি; সেই স্মৃতি আমাদের শেখায় যে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত যখন মানুষের জীবনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন তার পরিণতি হয় ভয়াবহ।
১৯৪৭ সালের বিভাজনের শিকারদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হলো এই প্রতিশ্রুতি—আমরা আর কখনো সেই ভুল পুনরাবৃত্তি হতে দেব না। আমরা এমন এক ভবিষ্যৎ চাই, যেখানে পরিচয় বিভাজনের অস্ত্র নয়, বরং সহাবস্থানের ভিত্তি। যেখানে রাষ্ট্র মানুষকে রক্ষা করে, বিভক্ত করে না। যেখানে ইতিহাসের ক্ষত আমাদের সতর্ক করে, বিভ্রান্ত করে না।
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী, লেখক ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats