চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দোয়া চাওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, “আজকে মূল যে কারণে আমার এখানে আসা, যেটা সংসদ সদস্যও বলেছেন, প্রথমত আমি যে ওয়াদাটা করেছিলাম হুজুরের কাছে, সেই ওয়াদাটা আমি আজকে রক্ষা করলাম, হুজুরকে সালাম দিলাম এবং যাওয়ার সময় আমি দোয়া নিয়ে যেতে চাই যাতে যে কথাগুলো আমরা দেশের মানুষকে বলেছি, যে প্রতিশ্রুতিগুলো আমরা দেশের মানুষকে দিয়েছি—তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য, আল্লাহ যাতে আমাদেরকে রহমত করেন, সেই প্রতিশ্রুতি যাতে আমরা রক্ষা করতে পারি।

“আমরা যদি একজন মুসলমান হিসেবে বিবেচনা করি নিজেকে, তাহলে সেটা যে-ই হোক, যখন আমরা একটা জবান দিই কাউকে, সেই জবানটা আমাদেরকে রক্ষা করতে হবে, তাই না? জবান যদি রক্ষা করতে না পারি, তাহলে তো আর কাজটা ঠিক হলো না।”
রোববার বিকালে ফটিকছড়িতে আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। এর আগে হেফাজত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সরকারপ্রধান।
মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান বলেন, “আপনাদের সকলের কাছে দোয়া চেয়েছি এবং একই সাথে আমি হুজুরের কাছে দোয়া চেয়েছি যাতে আল্লাহ আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, এই দায়িত্ব যাতে আমি ঈমানের সাথে পালন করতে পারি, আমার শেষ দিন পর্যন্ত।”
দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, “আমরা ’৯১ সালে দেখেছি, আমরা ’৯৬ সালে দেখেছি, এমনকি বিগত নির্বাচনের সময়ে আপনারা দেখেছেন যে- যাদের বিরুদ্ধে বা যারা দেশটাকে অন্যদিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, আমরা এবং আপনারা একসাথে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ হিসেবে আমরা নির্বাচনে কাজ করেছিলাম। খেয়াল করে দেখবেন গত কয়েকদিন ধরে এরা আবার কতগুলো কথা, বিভ্রান্ত ছড়ানোর চেষ্টা করছে। বিশৃঙ্খলা তৈরি করার চেষ্টা করছে তারা।
“সেজন্য বলছি যে- আমরা যে একসাথে কাজ করছি, দেশটাকে সঠিক রাখার চেষ্টা করছি; এখানে আমরা দুই বছর আগে যেমন একসাথে কাজ করেছি, হুজুরের (হেফাজত আমির) দোয়া নিয়ে আমি বলতে চাই, অনুরোধ জানাতে চাই যে—আগামী দিনগুলোতেও আমাদেরকে একসাথে থাকতে হবে।”
কওমি মাদ্রাসার বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘হ্যাঁ, আমি জানি এখানে কিছু দাবি স্থাপন করেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাহেব, উনি কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমরা পর্যায়ক্রমে চেষ্টা করব। আমাদেরকে বুঝতে হবে...

“এদেশে তো আরও অনেক মানুষ বাস করে। আমরা চাই এমন একটা বাংলাদেশ তৈরি করতে, যেখানে বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাদেশের সন্তানেরা খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকবে, শান্তিতে থাকতে পারবে এবং বিভিন্ন বিভিন্ন মানুষ একসাথে শান্তিতে থাকব।” সরকারপ্রধান বলেন, “আমরা আমাদের ধর্ম পালন করব, তারা তাদের ধর্ম পালন করবে। কিন্তু একই সাথে এখানে অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মের, এখানে ইসলাম ধর্ম হিসেবে এখানে ইসলামকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব, দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাব ইনশাল্লাহ।”
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘‘আমাদেরকে দেশের মানুষের জন্য কর্মসংস্থান ব্যবস্থা করতে হবে, মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থা ঠিক করতে হবে, শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ আমাদেরকে ঠিক করতে হবে, বিভিন্ন জায়গায় ব্রিজ-কালভার্ট ঠিক করতে হবে।
“দেশে যদি বিশৃঙ্খলা থাকে বা বিরাজ করে, তাহলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী যারা বিনিয়োগ করতে চায়, তারা বিনিয়োগ করতে আসবে না। আর বিশৃঙ্খলা যদি না থাকে, বিদেশিরা এখানে বিনিয়োগ করবে।
“তাহলে আমাদের সন্তানরা, আমাদের পরিবারের সমস্যারা চাকরির সুযোগ পাবে। দেশের মানুষের ব্যবস্থা করলে দেশের মানুষ ভালো থাকতে পারবেন; এটা আমাদের দায়িত্ব যে দেশের মানুষের ভালো থাকার ব্যবস্থা করা।”

শেষে মোনাজাতে হেফাজত আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, “ইয়া আল্লাহ, যারা দুশমনি করেন, ইয়া আল্লাহ তৌফিক দেন উনারা নিজেরা যাতে হেদায়েত পান। আর হেদায়েত না পাইলে যারা দুশমনি করে, হিংসা করে ইয়া আল্লাহ এদেরকে হেদায়েত...ইয়া আল্লাহ আমাদের হেফাজত করো। আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে ইয়া আল্লাহ হেফাজত করো।”অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বক্তব্য রাখেন।
৯ দফা দাবি
দিনব্যাপী চট্টগ্রাম সফরের অংশ হিসেবে ফটিকছড়িতে হেফাজত আমীর আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় পৌঁছালে হেফাজত আমীর তাকে উষ্ণ অভিবাদন জানান।
রোববার বিকালে হেলিকপ্টারে করে ফটিকছড়ির পেহেলগাজী দিঘীর মাঠে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে স্থানীয় সাধারণ মানুষ তাকে অভ্যর্থনা জানান। পরে তিনি বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজত আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
প্রধানমন্ত্রী মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন। সেখানে বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসার শতাধিক শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ভূমি ও পাবর্ত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতি মন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর, গিয়াস কাদের চৌধুরী ছিলেন।
মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৯ দফা দাবি করা হয়। হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা সাজেদুর রহমানের সই করা লিখিত দাবিতে প্রথমেই মহান আল্লাহ, রাসুল (সা.), পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাসের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ই মে শাপলা চত্বরে রাতের আঁধারে সংঘটিত নৃশংস গণহত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাযজ্ঞে জড়িত, হুকুমের আসামি ও খুনিদের বিচার নিশ্চিতের মাধ্যমে বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়।
কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করে শিক্ষার্থীদের জন্য দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে হেফাজত। বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি মাদ্রাসার ডিগ্রির পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের ডিগ্রি শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে উল্লেখ করার দাবি জানানো হয়েছে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।বাংলাদেশ সংবাদ কভারেজ
এ ছাড়া কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা এবং হিজবুত তাওহিদকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি মিশনারিগুলোর ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা বন্ধের দাবিও রয়েছে তাদের। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে আলেমদের বিরুদ্ধে করা মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার করে এ দেশের আলেম-ওলামাকে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে অংশীদার করার দাবিও জানিয়েছে হেফাজত। একইসাথে টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থিদের ইজতেমা বন্ধের দাবি করা হয়। এছাড়াও আল্লামা মহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে তিনটি দাবি করা হয়। সেগুলো হলো উত্তর চট্টগ্রামে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নিত করা ও ফটিকছড়িতে একটি বিদ্যুৎ সাবস্টেশন নির্মাণ।
এদিকে হেফাজত আমীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে প্রধানমন্ত্রী পার্শবর্তী হাটহাজারী বড় মাদ্রাসায় যান। সেখানে তিনি হেফাজতে ইসলামের প্রয়াত আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও আল্লামা জোনায়েদ বাবুনগরীর কবর জিয়ারত করেন। এর আগে দুপুরে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এরআগে সকালে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) কার্যক্রম পরিদর্শন করেন তিনি।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats