যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় (ইউএসএফ) অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল লিমনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার হিশাম আবুগারবিয়েহকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম নিউজউইকের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, লিমনের সাবেক রুমমেট ২৬ বছর বয়সী তরুণ হিশাম আবুগারবিয়েহ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তার বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক সহিংস অপরাধের অভিযোগ ছিল বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিখোঁজ আরেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা এস বৃষ্টির এখনো সন্ধান পায়নি পুলিশ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে বৃষ্টির ফোন ক্যাম্পাস এলাকায় শনাক্ত হয়।
নিহত লিমন ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতিমালা বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। অন্যদিকে বৃষ্টি রাসায়নিক প্রকৌশলের শিক্ষার্থী। তাদের দুজনের বয়স ২৭। গত ১৬ এপ্রিল তাদের সর্বশেষ দেখা যায় বলে জানিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
গতকাল শুক্রবার দেশটির গণমাধ্যম ডব্লিউএফএলএ নিউজ চ্যানেল ৮ জানায়, নিখোঁজ শিক্ষার্থী জামিল লিমনের দেহের অবশিষ্টাংশ হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড সেতু থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, লিমনের মরদেহ উদ্ধারের আগে হিশামকে গ্রেপ্তার নিয়ে বেশ নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। টাম্পার উত্তরে হিশামের পরিবারের বাড়িতে পারিবারিক সহিংসতার ফোন পেয়ে পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়।
পুলিশ পৌঁছালে হিশাম ঘরের ভেতর নিজেকে অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং বের হতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তার আগেই পুলিশ তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়।
পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট 'সোয়াট' টিম তলব করা হয়। দীর্ঘ উত্তেজনার পর হিশাম আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন।
হিশাম আবুগারবিয়েহর অপরাধমূলক অতীত
আদালত ও শেরিফ অফিসের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে হিশাম সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।
হিশাম ইউএসএফের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। তবে গ্রেপ্তারের সময় তিনি আর ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন না।
আদালতে রেকর্ডে দেখা যায়, ২০২৩ সালের মে ও সেপ্টেম্বর মাসে তার বিরুদ্ধে শারীরিক আঘাত করা এবং একটি জনশূন্য বাড়িতে চুরির অভিযোগ আনা হয়েছিল। যদিও সে সময় এগুলোকে অপেক্ষাকৃত লঘু গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল।
হিলসবোরো কাউন্টি আদালতের নথিতে আরও দেখা যায় যে, হিশামের সহিংস আচরণের কারণে তার নিজের পরিবারের এক সদস্যই তার বিরুদ্ধে দুটি ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স ইনজাংশন’ বা পারিবারিক সুরক্ষা নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে একটি আবেদন আদালত মঞ্জুর করেছিল। এছাড়া তার বিরুদ্ধে একাধিক ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ ও তদন্তের অগ্রগতি
হিলসবোরো কাউন্টির চিফ ডেপুটি জোসেফ মাউরার জানিয়েছেন,জামিল লিমনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে হিশামকে কয়েকটি অভিযোগে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে মৃত্যুর সংবাদ না দেওয়া ও অবৈধভাবে মৃতদেহ সরানো, আলামত নষ্ট করা, নিজেকে মিথ্যা ও অন্যায়ভাবে আটকে রাখা এবং পারিবারিক সহিংসতা ও শারীরিক আঘাত করা।
পুলিশ জানায়, লিমনের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষা করা হচ্ছে।
‘এ ঘটনা আমাদের সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েছে’
যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী খুনের ঘটনায় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা ক্যাম্পাসে শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ফক্স-১৩।
ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট মোয়েজ লিমায়েম এক ই-মেইল বার্তায় জানান, হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের (পুলিশ) কার্যালয় থেকে লিমনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। বৃষ্টি এখনো নিখোঁজ এবং তার সন্ধানে তদন্ত চলছে।
ওই বার্তায় আরও বলা হয়, এ ঘটনায় হিশাম আবুগারবিয়েহ নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার সাবেক শিক্ষার্থী এবং লিমনের সাবেক রুমমেট।
তবে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ এই ই-মেইল বার্তা দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে ফক্স-১৩-কে জানিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার জুনিয়র শিক্ষার্থী এলি পাওয়েল।
‘আমি সামনে ফাইনাল পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করছি, কিন্তু বিষয়টা আমাকে ভীষণভাবে বিচলিত করছে’, বলেন পাওয়েল।
তিনি আরও বলেন, ‘এই পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছি না, এ ঘটনা আমাদের সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েছে।’
ফক্স-১৩ জানাচ্ছে, পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে এখন শোকের আবহ। শিক্ষার্থীরা একদিকে ফাইনাল পরীক্ষা ও গ্র্যাজুয়েশনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্যদিকে এই ঘটনার ধাক্কা সামলাচ্ছেন। ক্যাম্পাসের উত্তরে অ্যাভালন হাইটস অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন লিমন। প্রতিবেশী মেগান ম্যাকডোনাল্ড বলেন, শুরুতে বিষয়টি ততটা গুরুতর মনে হয়নি।
‘প্রথমে মনে হয়েছিল তারা হয়তো একসঙ্গে কোথাও চলে গেছেন। কিন্তু পরে বুঝতে পারি ঘটনার ভয়াবহতা’, বলেন ম্যাকডোনাল্ড। তিনি আরও বলেন, ‘এই ক্ষতি মেনে নেওয়া কঠিন। এটা তো কারও জীবন ছিল। আমি ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না’, বলেন তিনি।
এ ঘটনায় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিরূপ প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছে ফক্স-১৩।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই শিক্ষার্থীই বাংলাদেশের নাগরিক এবং তারা ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার বৃহৎ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমিউনিটির অংশ ছিলেন। ব্রাজিল থেকে আসা শিক্ষার্থী কোটশো জানান, এই ঘটনা তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
‘তাদের পরিবারের প্রতি আমার সমবেদনা। আশা করি তারা ন্যায়বিচার পাবেন এবং কিছুটা হলেও শান্তি পাবেন। আমি চাই না এমন ঘটনা আর কখনও ঘটুক’, বলেন তিনি। এই কঠিন সময়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসে কাউন্সেলিং সেবা চালু রয়েছে বলে জানিয়েছে ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats