যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে নিখোঁজ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি আর বেঁচে নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে এমনটাই জানিয়েছেন নাহিদার ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত। তবে তাঁর মরদেহ এখনো পাওয়া যায়নি। এর আগে গতকাল শুক্রবার নিখোঁজ আরেক বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের (২৭) ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করেছে ফ্লোরিডার স্থানীয় পুলিশ।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ হন লিমন ও বৃষ্টি। দুজনই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার পিএইচডি শিক্ষার্থী। ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন লিমন। অন্যদিকে নাহিদা পিএইচডি করছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন দুজনকে সর্বশেষ ক্যাম্পাসে দেখা গিয়েছিল।

বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান তাঁর বোনের মৃত্যুর খবর জানিয়ে আজ শনিবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। ইতিমধ্যে সাড়ে সাত শতাধিক শেয়ার হওয়া এই পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘আমার বোন আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।’
নিখোঁজ শিক্ষার্থী বৃষ্টির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জাহিদ হাসান। আজ দুপুরে তিনি বলেন, ‘আমাদের আজ ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় পুলিশ ফোন করেছে। ওকে (বৃষ্টি) এখনো পাওয়া যায়নি, রিকভার (উদ্ধার) করা যায়নি। ওই সাসপেক্টর (গ্রেপ্তার হিশাম আবুঘরবেহ)...নিশ্চিত করেছে, এটা আসলে দুজনের। সন্দেহভাজন ব্যক্তিটি আরেকটা বডি (মরদেহ) আসলে ডিসপোজ (নষ্ট করা) করতেছিল।’
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় পুলিশের বরাতে জাহিদ হাসান বলেন, ‘আর আমাকে বলছে, মৃতদেহ পাওয়া যাবে কি না, সেটার নিশ্চয়তা তারা এখনো দিতে পারছে না।...সেখানকার স্থানীয় পুলিশ আমাকে ফোন করে এমনটাই বলেছে।’
অন্যান্য গণমাধ্যম জাহিদ হাসানের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, বৃষ্টির বাসায় রক্তের মধ্যে পড়ে থাকা দেহের একটি অংশের সঙ্গে তাঁর ডিএনএর মিল পাওয়া গেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ মরদেহ পাওয়া যাবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা তারা দিতে পারেনি।
এর আগে গতকাল আরেক নিখোঁজ শিক্ষার্থী জামিলের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ। ফ্লোরিডার হিলসবরোর স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এক সংবাদ সম্মেলনে ফ্লোরিডার ট্যাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের কথা জানায়।
তাঁদের নিখোঁজের ঘটনায় হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ নামে ২৬ বছরের আমেরিকার এক নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় পুলিশ। তিনি জামিলের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন। তবে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁর পারিবারিক বাড়ি থেকে।
শিগগিরই বিয়ের পরিকল্পনা ছিল লিমন–বৃষ্টির
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডির শিক্ষার্থী নিহত জামিল আহমেদ লিমনের সঙ্গে নিখোঁজ আরেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাঁরা শিগগিরই বিয়ের পরিকল্পনা করছিলেন। এমন তথ্য জানিয়েছেন লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদ।
লিমনের ভাইয়ের বরাত দিয়ে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় বৃষ্টিকে নিয়ে লিমন অনেক ভালো ভালো কথা বলতেন। লিমন বলেছিলেন, তিনি বৃষ্টিকে প্রেম নিবেদন করেছেন এবং তাঁরা দুজন বিয়ের বিষয়েও ভাবছেন।
জুবায়ের বলেন, ‘লিমন বলত, সে খুবই ভালো মেয়ে, তার অনেক প্রতিভা আছে; যেমন তার গানের গলা ভালো, তেমনি রান্নাও করতে পারে।’লিমন দুই বছর ধরে নিজের থিসিস নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করছিলেন বলেও জানান তাঁর ভাই জুবায়ের আহমেদ।
জুবায়ের বলেন, ‘আমার ভাই খুবই ভদ্র এবং খুবই সাধারণ একজন মানুষ ছিল। তার মুখে সব সময় হাসি লেগে থাকত। পিএইচডি শেষ করে তার বাংলাদেশে ফিরে আসার ইচ্ছা ছিল, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কাজ করার ইচ্ছা ছিল।’
প্রায় ১০ দিন নিখোঁজ থাকার পর গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের (২৭) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। লিমন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। একই দিন পিএইচডির শিক্ষার্থী বাংলাদেশি বৃষ্টিও নিখোঁজ হন। নাহিদা কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পিএইচডির শিক্ষার্থী।
এ ঘটনায় হিশাম আবুঘরবেহ (২৬) নামের এক মার্কিন নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি জামিলের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন।
হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের (পুলিশ) কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, পুলিশ আবুঘরবেহকে জিজ্ঞাসাবাদের পর গতকাল ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে জামিলের মরদেহ উদ্ধার করে। নিখোঁজ বৃষ্টির বিষয়ে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তাঁর সন্ধানে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শেরিফ চ্যাড ক্রোনিস্টার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এটি একটি ভয়ানক উদ্বেগজনক ঘটনা, যা আমাদের এলাকাকে কাঁপিয়ে দিয়েছে এবং বহু মানুষকে প্রভাবিত করেছে।’ তাঁরা একটি নিরাপদ সমাধানের আশায় আছেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, আবুঘরবেহকে ২০২৩ সালে শারীরিক আঘাতের অভিযোগে দুবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তবে পরে সেই অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করা হয়। তবে ওই ঘটনাগুলোর একটির পর তাঁর ভাই আদালতের কাছে একটি নিষেধাজ্ঞা (ইনজাংশন) আবেদন করেন। ওই আবেদনের ভিত্তিতে আদালত আবুঘরবেহকে তাঁর ভাই ও তাঁদের বাড়ির কাছাকাছি যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন।
লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে গতকাল সকালে গ্রেপ্তার করা হয়। শেরিফের কার্যালয়ের চিফ ডেপুটি জোসেফ মাউরার বলেন, পারিবারিক সহিংসতার একটি ঘটনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাঁর বাড়িতে ডাকা হয়েছিল।
শেরিফের দপ্তর থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২৬ বছর বয়সী আবুঘরবেহ ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার একজন সাবেক শিক্ষার্থী। লিমনও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।
আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে মারধর ও শারীরিকভাবে আঘাত করা, জোর করে আটকে রাখা, প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা, মৃত্যুর ঘটনা না জানানো এবং মৃতদেহ অবৈধভাবে সরানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রধান ডেপুটি বলেন, শুক্রবার তদন্তকারী কর্মকর্তারা এই মামলার সঙ্গে এবং (লিমনের) মরদেহের সঙ্গে সন্দেহভাজনের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি জোড়া লাগাতে সক্ষম হন। শেরিফের দপ্তর জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের সময় আবুঘরবেহ একটি বাড়ির ভেতরে লুকিয়ে ছিলেন। এর ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সোয়াত দল এবং সংকট পরিস্থিতিতে আলোচক দলকে ঘটনাস্থলে আসতে হয়।
হিশামকে গ্রেপ্তারের সময়ের ভিডিওতে দেখা যায়, একটি সাঁজোয়া যান একটি বাড়ির সামনের উঠানে দাঁড়িয়ে আছে এবং আবুঘরবেহ হাত ওপরে তুলে বাড়ির সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসছেন। এ সময় তিনি কেবল তোয়ালে পরা ছিলেন।
আবুঘরবেহকে তাঁর পারিবারিক বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর ভাইয়ের করা পারিবারিক সহিংসতার একটি অভিযোগের ভিত্তিতে আদালত তাঁকে ওই বাড়িতে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন।
শুক্রবার গ্রেপ্তার হওয়ার আগে আবুঘরবেহকে অন্তত দুবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। মাউরার বলেন, তিনি শুরুতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলছিলেন, কিন্তু বৃহস্পতিবার আবার জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি সহযোগিতা করা বন্ধ করে দেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, শারীরিকভাবে আঘাতের অভিযোগে আবুঘরবেহকে ২০২৩ সালে দুবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তবে পরে সেই অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করা হয়।
তবে ওই ঘটনাগুলোর একটির পর তাঁর ভাই আদালতের কাছে একটি নিষেধাজ্ঞা (ইনজাংশন) আবেদন করেন। ওই আবেদনের ভিত্তিতে আদালত আবুঘরবেহকে তাঁর ভাই ও তাঁদের বাড়ির কাছাকাছি যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন।

আদালতে দাখিল করা নথিতে তাঁর ভাই অভিযোগ করেছিলেন, একটি পারিবারিক ঝগড়ার সময় তিনি আবুঘরবেহকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলেন। তখন আবুঘরবেহ তাঁর এবং তাঁদের মায়ের ওপর আক্রমণ করেছিলেন।
কিন্তু গত বছরের মে মাসে আদালতের জারি করা ওই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। তাঁর ভাই মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আদালতে আবেদন করেছিলেন। আবেদনে তিনি বলেছিলেন, আবুঘরবেহর ফিরে আসার ‘ঝুঁকি তাঁরা নিতে চান না’। তবে আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেন। সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুখপাত্র সিএনএনকে জানান, সন্দেহভাজন ব্যক্তি (আবুঘরবেহ) ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন। তিনি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ে লেখাপড়া করতেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এনবিসিসহ একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, লিমন ও বৃষ্টির সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে তাঁদের এক পারিবারিক বন্ধু পরদিন ১৭ এপ্রিল বিকেলে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুটি নিখোঁজ ডায়েরি করা হয় এবং অঙ্গরাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ের নিখোঁজ ব্যক্তির ডেটাবেজে দুজনের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats