আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন৷ নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স, বিশেষ করে গুলিতে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে৷ তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনাও বেড়েছে৷ আইনশৃঙ্খালার এমন অবনতিতে আসছে নির্বাচনের সময়ে পরিস্থিতি কতোটা সুষ্ঠু থাকবে তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে৷
দুইটি দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচনকালীণ সময়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম৷ এই বিশ্লেষক বলেন, ‘‘সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে দুই ধরনের শঙ্কা রয়েছে৷ প্রথমত এটা ইনক্লুসিভ নির্বাচন হচ্ছে না৷ এখানে যাদের বাদ দেওয়া হয়েছে তারা তো ঝামেলা করতেই পারে৷ দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে লুট হওয়া প্রচুর পরিমান অস্ত্র এখনও অপরাধীদের হাতে রয়েছে৷ সেই অস্ত্রগুলো তো সাধারণ মানুষের কাছে নেই৷ যাদের কাছে আছে তারা তো ভালো মানুষ না৷ ফলে এই অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা না গেলে তো আরও বেশি বিশৃঙ্খলা ঘটতে পারে৷’’
সর্বশেষ গত বুধবার রাতে কারওয়ান বাজারে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়৷ এর আগে গত সোমবার চট্টগ্রামের রাউজানের একজন যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে৷ কক্সবাজারে একজন প্রার্থীকে কাফনের কাপড় পাঠিয়ে হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাগুলোও সামনে আসছে৷ গত মাসে তফসিল ঘোষণার পরদিনই ঢাকায় গুলিতে নিহত হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি৷

নিবাচন সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নে করা যাবে কি না সেই প্রশ্নে নির্বাচন কমিশন বলছে, যেসব ঘটনা ঘটছে তার সবগুলো রাজনৈতিক বা নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতা না৷
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, ‘‘সহিংসতা যে কারণেই হোক এটা যেভাবেই হোক থামাতে হবে৷ সহিংসতা থাকলে নির্বাচনের পরিবেশ বিঘ্নিত হবে৷ আমরাও তো মনে করছি, এটা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ৷’’
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের দিন সারাদেশের থানায় অস্ত্র ও গুলি লুটের ঘটনা ঘটে৷ এসব অস্ত্রের কিছু উদ্ধার করা গেলেও এখনো অনেক অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি৷
গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, লুট হওয়া সেসব অস্ত্রের ১৫ শতাংশ এবং ৩০ শতাংশ গুলি এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি৷ এগুলো নির্বাচনের আগে ব্যবহার হতে পারে৷
পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘কিছু ঘটনা যে ঘটছে না, সেটা বলা যাবে না৷ তবে সবগুলো ঘটনাতেই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি৷ নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু করা যায় সেজন্য যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন তার সবকিছু নেওয়া হচ্ছে৷ এখন যে ঘটনাগুলো ঘটছে সেগুলোতেও আমরা শক্ত পদক্ষেপ নিচ্ছি৷ পাশাপাশি নতুন করে নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে৷ সামনে পরিস্থিতি আরও ভালো হবে৷’’
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি তথ্য বলছে, গত এক বছরে অর্থাৎ ২০২৫ সালে এক বছরেই সারাদেশে ৯১৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩৩জন নিহত হয়েছে৷ আর এতে আহত হয়েছে সাড়ে সাত হাজারেও বেশি মানুষ৷ এই সময়ে মব সহিংসতা, গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে অন্তত ১৬৮ জন৷ পুলিশ সদর দফতরের হিসাব অনুযায়ী, গত জানুয়ারি মাসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ২৭৬টি৷ এরমধ্যে বেশ কিছু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে৷
এর আগে ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি বাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে৷ এতে একতলা ভবনের দুটি কক্ষের দেয়াল উড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়৷ ঘটনাস্থল থেকে ককটেল, রাসায়নিক দ্রব্য ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে পুলিশ৷ এই ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে৷
পুলিশ বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, মাদ্রাসা পরিচালনার নামে ভাড়া করা ওই বাড়িতে তৈরি করা বেশ কিছু বোমা এর আগে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়েছে৷ এগুলো কী কাজে ব্যবহার করা হতো সেটিও পরিস্কার নয়৷
১৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে লক্ষ্মীপুরে দরজায় তালা লাগিয়ে ও পেট্রল ঢেলে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার ঘরে আগুন দেওয়া হয়৷ এতে আগুনে পুড়ে ওই নেতার সাত বছর বয়সী এক মেয়ের মৃত্যু হয়৷ দগ্ধ হন বিএনপি নেতাসহ তার আরও দুই মেয়ে৷ গত সোমবার রাতে চট্টগ্রামের রাউজানে এক যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা৷ একইদিন সন্ধ্যায় যশোরের মনিরামপুরে এক বরফ কল ব্যবসায়ীকে গুলি করে এবং রাত ৯টায় নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় আরেক ব্যবসায়ীকে বাড়ির ফটকে গুলি হত্যা করা হয়েছে৷
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এসব ঘটনা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এনে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে পারাটা ভোটের আগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ৷ সরকারের পক্ষ থেকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য এলেও বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর মবের ঘটনা ঘটছেই৷
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, গত বছরে এভাবেগণপিটুনি বা ‘মব সন্ত্রাসের’ শিকার হয়ে প্রাণ গেছে ১৯৭ জনের৷ ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছিলেন অন্তত ১২৮ জন৷
ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৩ ডিসেম্বর থেকে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ শুরু হয়৷ ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এই অভিযানে ১৫ হাজার ৯৩৬ জন গ্রেপ্তার হন৷ তবে এই অভিযানেও চিহ্নিত, পেশাদার ও বড় সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের সংখ্যা খুবই কম৷ তাছাড়া অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যাও খুব বেশি নয়৷ এই সময়ে মোট অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ২৩৬টি৷
নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে একধরনের উদ্বেগ রয়েছে৷ গোপালগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এস এম জিলানীর একটি ভিডিও থেকে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার বিষয়টি স্পষ্ট হয়৷ ৭ জানুয়ারি কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মতবিনিময়কালে এই প্রার্থীকে গায়ে থাকা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট প্রদর্শন করতে দেখা যায়৷
চাদর সরিয়ে পাঞ্জাবির বোতাম খুলে ভেতরে পরা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট দেখিয়ে এস এম জিলানী বলেন, ‘‘আমাদের জীবনের হুমকি আছে, এটা সত্য৷ দেখেন, এখনো বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে আছি৷ জানি না, কখন কী হয়, তাই সবসময় সতর্ক থাকি৷’’
এর আগে গত বছরের ৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম-৮ আসনে (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর জনসংযোগে গুলি করা হয়৷ এতে একজন নিহত হন৷ এখন পর্যন্ত খুনি বা হামলাকারীরা গ্রেপ্তার হয়নি৷ ব্যবহৃত অস্ত্রটিও উদ্ধার হয়নি৷
বিদ্যমান বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা চেয়ে ইতিমধ্যে সরকারের কাছে আবেদন করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তত ২০ জন নেতা৷ এর মধ্যে পরমোনাই পীর ও গণসংসহি আন্দোলনের জুনায়েদ সাকিকে অস্ত্রধারী গ্যানম্যান দেওয়া হয়েছে৷
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা একটি চরম ও ধারাবাহিক রূপ ধারণ করেছে, যা ২০২৫ সালে আরও বিস্তৃত ও সহিংসতর হয়ে উঠেছে৷
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে৷ এসব ঘটনায় প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ জন আহত এবং ১০২ জন নিহত হয়েছেন৷
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats