আন্দোলনের মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার ভার বিদেশি অপারেটরদের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে এনসিটির দায়িত্ব আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার খসড়া চুক্তি অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে।
এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব কোন বিদেশি অপারেটরকে দেওয়া হয়েছে, সেটি বলা হয়নি বিজ্ঞপ্তিতে। তবে দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এ টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে শুরু থেকে। চট্টগ্রাম বন্দরের চালু থাকা চারটি কন্টেইনার টার্মিনালের মধ্যে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল সবচেয়ে বড়। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরে হ্যান্ডলিং হওয়া কন্টেইনারের ৪৪ শতাংশ হয় এনসিটিতে।
২০২৪ সালের ৭ জুলাই থেকে এনসিটি পরিচালনা দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল)। এরপর থেকে এনসিটিতে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এবং সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) কাঠামোর অধীনে এনসিটি পরিচালনার কাজ ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সেসময় ওই উদ্যোগ পরিণতি পায়নি। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এনসিটির দায়িত্ব বিদেশি অপরাটেরের হাতে দেওয়ার কার্যক্রম আবার শুরু করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এ বিষয়ে চুক্তির জোর আলোচনা শুরু হলে আন্দোলনে যায় বন্দরের শ্রমিক কর্মচারীরা।
অন্তর্বর্তী সরকার গত ৮ ফেব্রুয়ারি এনসিটি বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত করে। পরে বিএনপির নতুন সরকার গত ৪ জুন দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়।
সরকারের নির্দেশনার পর আলোচনা প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ১২ সদস্যের একটি সাপোর্ট টিমও গঠন করে। বন্দর চেয়ারম্যানও জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, এ বিষয়ে আলোচনায় দেশের স্বার্থে ‘কোনো ছাড় দেওয়া হবে না’।
তবে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ নেতারা বলছেন, বহুজাতিক কোম্পানিকে ইজারা দিলে সরকার আয় থেকে বঞ্চিত হবে, দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হয়ে যাবে এবং ‘কনসেশন’ চুক্তির কারণে বিপজ্জনক পণ্য খালাসেরও আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম গত ১৯ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “বিদেশিদের দিলে চট্টগ্রাম বন্দর যেমন লোকসানের দিকে যাবে ও দক্ষ কর্মশক্তি হারাবে তেমনিভাবে ভূ-রাজনৈতিক ভাবেও বাংলাদেশ একটা বিপদের সম্মুখীন হওয়ার সমূহ আশঙ্কা অনেক বেশি।”
চট্টগ্রামের শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) এর আগে বিবৃতিতে দাবি করে, “এ ধরনের উদ্যোগ জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ, কর্মসংস্থান, শ্রমিকদের অধিকার এবং ভবিষ্যতে বন্দরের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।” বিদেশি অপারেটরকে ইজারার প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে চট্টগ্রামে একাধিক সংগঠন মানববন্ধন ও সমাবেশসহ বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে আসছে।
জাতিকে অন্ধকারে রেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার ভার আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার খসড়া চুক্তি অনুমোদন দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়েছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বলেন, “সরকার জাতিকে অন্ধকারে রেখে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
“আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছি। সবশেষ গত ২৭ সেপ্টেম্বর আমাদের প্রতিবাদ সমাবেশ থেকেও বলেছিলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও নৌপরিবহন মন্ত্রীর সঙ্গে আমরা আলোচনা করতে চাই। সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি।”
বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের মধ্যেই এনসিটি নিয়ে এমন সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, “আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। শনিবার বিকালে পোর্ট কলোনি ১২ নম্বর রোডের শহীদ মিনারে আমাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি ও বিক্ষোভ মিছিল হবে।
“এখনো সময় ও সুযোগ আছে, সরকারের কাছে আহ্বান, তারা যেন এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।”এদিকে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) নেতা ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, “শনিবার বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আমাদের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
“আমরা আজকের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানাই। এই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করছি।”
আন্দোলনের মধ্যেই বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার ভার বিদেশি অপারেটরদের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে এনসিটির দায়িত্ব আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার খসড়া চুক্তি অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে। এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব কোন বিদেশি অপারেটরকে দেওয়া হয়েছে, সেটি বলা হয়নি বিজ্ঞপ্তিতে। তবে দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এ টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা আছে শুরু থেকেই।
ক্ষোভ ও নিন্দা বন্দর রক্ষা কমিটির
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার ভার আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার খসড়া চুক্তি অনুমোদন দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে বন্দর রক্ষা কমিটি।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বন্দর রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রামের আহ্বায়ক দেলোয়ার মজুমদার ও সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু এক যৌথ বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি কয়েকটি দাবিও তুলে ধরেছেন। ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, “অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় মূল এজেন্ডায় না থাকা সত্ত্বেও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর একটি বিষয় ‘বিবিধ’ এজেন্ডার মাধ্যমে উত্থাপন করা হয়।
“ওভারফ্লো ইয়ার্ডসহ কনসেশন চুক্তির আওতায় চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তে আমরা তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানাই।”শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে তারা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন, বলেন বন্দর রক্ষা কমিটির এ নেতা।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats