কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং তাঁদের কর্ম, নেতৃত্ব, শিক্ষা বিস্তার এবং মানুষের জন্য নিরলস প্রচেষ্টা একটি বৃহত্তর সমাজের অগ্রযাত্রার সঙ্গে সর্ম্পৃক্ত হয়ে ওঠে। অধ্যক্ষ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম মুকুল তেমনই একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। শিক্ষা, সমাজসেবা, সংগঠন, নেতৃত্ব, ব্যবসা এবং প্রবাসী কমিউনিটির উন্নয়ন—বিভিন্ন অঙ্গনে তাঁর দীর্ঘ পথচলা তাঁকে দেশে ও প্রবাসে একটি পরিচিত ও সম্মানিত অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
তিন দশকেরও বেশি সময়ের কর্মজীবনে তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন—সাফল্য শুধু নিজের জন্য অর্জন করার বিষয় নয়; বরং সেই সাফল্যকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোই একজন মানুষের প্রকৃত অর্জন।
ছাত্রজীবনেই নেতৃত্বের সূচনা
অধ্যক্ষ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম মুকুলের নেতৃত্বের হাতেখড়ি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে। ১৯৯১–৯২ শিক্ষাবর্ষে তিনি মীর মশাররফ হোসেন হল ছাত্রদলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। তরুণ বয়সেই সংগঠন পরিচালনা, নেতৃত্ব প্রদান এবং মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করার যে অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেন, পরবর্তী জীবনে তা তাঁর পেশাগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।

ছাত্রজীবনের সেই নেতৃত্বের অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাঁকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, শিক্ষক সংগঠন, সামাজিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক ও কমিউনিটি কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় হতে অনুপ্রাণিত করে।
শিক্ষা বিস্তারে অনন্য অবদান
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে নিজ এলাকা বাগেরহাটের ফকিরহাট থানার টাউন নওয়াপাড়ায় ফিরে তিনি শিক্ষা বিস্তারে আত্মনিয়োগ করেন। শিক্ষাকে সমাজ পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে তিনি শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে তিনি খান জাহান আলী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ এবং শহীদ স্মৃতি টেকনিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও যুক্ত হন।
১৯৯৫ সালে তাঁর মায়ের স্মৃতিকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠা করেন আমেনা বেগম স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেন আমেনা বেগম স্মৃতি ফাউন্ডেশন, যার মাধ্যমে এলাকার মানুষের সামাজিক কল্যাণ ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু প্রতিষ্ঠান নির্মাণ নয়; বরং অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখা। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তীতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা একজন শিক্ষকের জন্য নিঃসন্দেহে গর্ব ও সাফল্যের বিষয়।

শিক্ষক সংগঠনে নেতৃত্ব
শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি শিক্ষক সমাজের পেশাগত অধিকার ও উন্নয়নেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বাগেরহাট জেলা কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শিক্ষক সংগঠনের বৃহত্তর পরিসরে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পান।
শিক্ষক সমাজের সমস্যা, পেশাগত উন্নয়ন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর সক্রিয়তা তাঁকে একজন শিক্ষকনেতা হিসেবেও পরিচিত করে তোলে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ কর্মজীবন
অধ্যক্ষ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম মুকুলের কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। ২০০০–২০০১ সালে উচ্চশিক্ষা ও অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে তিনি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অবস্থান করেন।
পরবর্তীতে ২০০৩ সালে ভারত সরকারের একটি স্কলারশিপের মাধ্যমে নয়াদিল্লিতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষা ও পেশাগত জ্ঞানকে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার এই প্রচেষ্টা পরবর্তী কর্মজীবনে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
এরপর তিনি সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশের বাইরে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও একাডেমিক নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে তাঁর অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বিস্তৃত হয়।
কানাডায় নতুন অধ্যায়, নতুন সম্ভাবনা
২০১০ সালে তিনি পরিবারসহ কানাডার টরন্টোতে পাড়ি জমান। জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলেও নিজের দেশ, নিজ এলাকা এবং মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি।
প্রবাস জীবনে তিনি শুধু নিজের প্রতিষ্ঠা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজন ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন।
কানাডায় তিনি Bangladesh Funeral Service প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রবাসী মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রয়োজনকে প্রাতিষ্ঠানিক সেবার আওতায় নিয়ে আসার এই উদ্যোগ তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

রাজনৈতিক ও কমিউনিটি নেতৃত্ব
কানাডায় তাঁর নেতৃত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র রাজনীতি ও কমিউনিটি সংগঠন। তিনি Scarborough Southwest-এ লিবারেল পার্টির সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালেও তিনি পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
মূলধারার কানাডিয়ান রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি বাংলাদেশি-কানাডিয়ান কমিউনিটির অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ এবং বাংলাদেশ ও কানাডার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন।
তাঁর নেতৃত্বের দর্শন মূলত মানুষকেন্দ্রিক—মানুষের কথা শোনা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সহযোগিতা ও সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি করা।

সমাজসেবা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা
অধ্যক্ষ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম মুকুলের জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি যেখানে থেকেছেন, সেখানেই মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা করেছেন।
বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা, শিক্ষক সংগঠনে নেতৃত্ব, সামাজিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং কানাডায় কমিউনিটি সেবামূলক কর্মকাণ্ড—সব ক্ষেত্রেই তাঁর কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ।
তাঁর জীবন থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—প্রবাস জীবন মানুষের শিকড়কে ভুলে যাওয়ার নাম নয়। বরং প্রবাসে থেকেও নিজের দেশ, সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ধরে রাখা সম্ভব। তিনি সেই বিশ্বাসকেই নিজের কর্মের মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে চলেছেন।
পরিবার ও ব্যক্তিজীবন
অধ্যক্ষ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম মুকুল দুই সন্তানের জনক। তাঁর কন্যা ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করে বর্তমানে পেশাজীবী হিসেবে কর্মরত এবং বিবাহিত। তাঁর ছেলে ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির আইভি বিজনেস স্কুলে অধ্যয়ন করছেন।
তাঁর সহধর্মিণী মাহমুদা নাসরিন কানাডায় সোশ্যাল ওয়ার্ক ও জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত এবং রাজনৈতিক ও ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত কাজেও সক্রিয়।
পরিবার, পেশা ও সামাজিক দায়িত্ব—এই তিনটি ক্ষেত্রকে সমন্বয় করে এগিয়ে চলাই তাঁর ব্যক্তিজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

অর্জনের চেয়ে মানুষের ভালোবাসাই বড় পরিচয়
একজন মানুষের জীবনের সাফল্য শুধু পদ-পদবি, প্রতিষ্ঠান বা পেশাগত পরিচয়ে পরিমাপ করা যায় না। মানুষের জীবনে তিনি কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পেরেছেন, কতজনকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন এবং সমাজের জন্য কতটা অবদান রাখতে পেরেছেন—সেখানেই প্রকৃত সাফল্যের মূল্যায়ন।
অধ্যক্ষ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম মুকুলের দীর্ঘ কর্মজীবনের দিকে তাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ, শিক্ষক সংগঠনে নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, সামাজিক উদ্যোগ, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড এবং কানাডার কমিউনিটি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন একটি বহুমাত্রিক কর্মযাত্রার প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশের মাটি থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, সৌদি আরব এবং সর্বশেষ কানাডা—বিভিন্ন দেশ ও সমাজের অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিত্বকে করেছে আরও সমৃদ্ধ ও পরিণত।
আগামী দিনের প্রত্যাশা
অধ্যক্ষ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম মুকুলের জীবনযাত্রার মূল শিক্ষা হলো—শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে, নেতৃত্ব মানুষকে সংগঠিত করে এবং মানবসেবা মানুষকে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে দেয়।
দেশ ও প্রবাসে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতেও শিক্ষা, সমাজসেবা, কমিউনিটি উন্নয়ন এবং বাংলাদেশি-কানাডিয়ান জনগোষ্ঠীর কল্যাণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে—এটাই প্রত্যাশা।
তাঁর জীবন কেবল একজন ব্যক্তির সাফল্যের কাহিনি নয়; এটি একজন শিক্ষাবিদ, সংগঠক, সমাজসেবক ও কমিউনিটি নেতার দীর্ঘ সংগ্রাম, অভিজ্ঞতা ও মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয়ের গল্প।
মানুষের জন্য কাজ করার যে অঙ্গীকার তিনি দেশে শুরু করেছিলেন, প্রবাসেও তা অব্যাহত রেখেছেন—আর এই ধারাবাহিকতাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ও অর্জন।
লেখক: সংবাদ প্রতিনিধি, উইকলি টরেন্টো, কানাডা
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats