বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান, সংস্কার, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ তাদের ওয়েবসাইটে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে। “বাংলাদেশ’স আনফিনিশড রেভোল্যুশন’’ শিরোনামে এই প্রবন্ধ লিখেছেন অবিনাশ পালিওয়াল। নিউজ ডিপ্লোমেটস্ পাঠকদের জন্য লেখাটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।
ভূমিকা
২০২৫ সালের বড়দিনে এক বিশাল উচ্ছ্বসিত জনসমুদ্রের সামনে তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আমার দেশের মানুষের জন্য আমার একটি পরিকল্পনা আছে।’ ওই সময়েই তাঁর ১৭ বছরের নির্বাসনের অবসান ঘটেছিল। এর দুই মাসের কিছু কম সময় পর ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে।
বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৯টি আসন পায়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পায় ৬৮টি আসন। নতুন ছাত্র নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) লাভ করে ৬টি আসন। এই ভোট ছিল প্রায় দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। এর আগে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ এমন নির্বাচনই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের উত্থানের পথ তৈরি করেছিল। ক্ষমতায় বসার পর হাসিনা উত্তরোত্তর কর্তৃত্ববাদী উপায়ে ক্ষমতা সুসংহত করেছিলেন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে এক গণ-অভ্যুত্থানের পর তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি না হওয়া পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল ছিলেন।
শুধু নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে—এটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এর বাইরেও আরও একটি বড় বিষয় ঘটেছে। সেটি হলো, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জুলাই সনদ নিয়ে আয়োজিত গণভোটে ৬৮ শতাংশ ভোট এর পক্ষে পড়ে। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের নামানুসারে প্রণীত এই সনদে সাংবিধানিক, নির্বাচনী ও প্রশাসনিক সংস্কারের একটি প্যাকেজ রয়েছে, যা কিনা নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রস্তাব করেছিল।
জুলাই সনদের উদ্দেশ্য ছিল একজনের হাতে বা এক জায়গায় অতিরিক্ত ক্ষমতা জমা হওয়া বন্ধ করা। এ জন্য কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যেমন প্রধানমন্ত্রী কতবার ক্ষমতায় থাকতে পারবেন, তা সীমিত করা; বর্তমান নির্বাচনপদ্ধতির বদলে এমন ব্যবস্থা আনা, যাতে ভোটের অনুপাতে আসন পাওয়া যায়; সংসদকে দুই কক্ষে ভাগ করা; দল থেকে ভিন্নমত দিলেই সদস্য পদ হারানোর নিয়ম কিছুটা শিথিল করা ইত্যাদি। এসব পরিবর্তনের লক্ষ্য ছিল রাজনীতিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক করা।

একই সঙ্গে বিএনপির ফিরে আসা, জামায়াতে ইসলামীর আবার শক্তিশালী হওয়া এবং নতুন দল এনসিপির আবির্ভাব—সব মিলিয়ে বোঝা যায়, বাংলাদেশের মানুষ এখন বেশি অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি, সংস্কার, স্থিতিশীল অর্থনীতি ও সত্যিকারের গণতন্ত্র চায়। বড় ধরনের গণ-আন্দোলন বা বিপ্লব (বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনকে ‘মনসুন রেভোল্যুশন’ বলা হয়) সাধারণত অনেক আশা তৈরি করে। কিন্তু বাস্তবে সেই আশা অনেক সময় পুরোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে ধাক্কা খায়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল করতে পেরেছে এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করেছে। একই সঙ্গে তারেক রহমান প্রায় কোনো বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এটি দেখে মনে হয়, দেশে একটা স্থিতিশীল রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি হয়েছে। এটা শেখ হাসিনার সময়ের তুলনায় ভিন্ন। কারণ, তখন তিনি প্রায়ই বিরোধী দল ও ভিন্নমত দমন করতেন। তবে এখানেও একটা ধারাবাহিকতা আছে। কারণ, আবার ক্ষমতায় এসেছে একটি পুরোনো দল—বিএনপি। এই দলের নেতা তারেক রহমান হচ্ছেন দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে। উল্লেখ্য, তিনি নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার পাঁচ দিনের মাথায় খালেদা জিয়া মারা যান।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসেছে, সেই একই কাঠামোর মধ্যে থেকে তারেক রহমান কি সত্যিই বড় ধরনের সংস্কার করতে পারবেন?
ভাঙনের পথে
গণ-অভ্যুত্থানের আগের কয়েক মাসে অর্থনীতি, নির্বাচনব্যবস্থা ও সেনাবাহিনীর ভেতরে ব্যাপক উত্তেজনা জমে উঠছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে দেশজুড়ে বিএনপি ও জামায়াত–সমর্থকেরা ব্যাপক প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করেন। ফলে ভোটের আগের দিন পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। শেখ হাসিনা জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়াগতভাবে সুষ্ঠু ছিল না বলে অভিযোগ তুলে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে।
যদিও ওই মাসেই শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় ফেরেন, কিন্তু নির্বাচন ঘিরে সহিংস পরিস্থিতি পুরো ব্যবস্থাকে একধরনের ‘প্রেশার কুকার’ পরিস্থিতিতে নিয়ে যায়। কার্যত বিরোধী দলহীন হওয়ায় নির্বাচনকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে দেখা হয়। কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী দুর্নীতির কারণে ভুগতে ভুগতে দেশের অর্থনীতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছিল। আর সেনাবাহিনীও এসব পরিস্থিতি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল।
এই প্রেক্ষাপটেই শেখ হাসিনা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য ৩০ শতাংশ চাকরির কোটা ঘোষণা করেন। এ পদক্ষেপ ছিল একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত যে সরকার সরাসরি আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্তদের পক্ষেই সুবিধা দিতে চায়।

যে দেশে রাষ্ট্র চাকরি সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখে, সেখানে এই ঘোষণা প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ (১৮ মিলিয়ন) তরুণ-তরুণীকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। এই তরুণ-তরুণীরা হয় বেকার, না হয় আংশিক বেকার। তাঁদের জন্য সরকারি চাকরি ছিল অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথগুলোর একটি।
শেষ পর্যন্ত ব্যাপক চাপের মুখে এই কোটা প্রত্যাহার করা হলেও কোটা ইস্যুই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার চূড়ান্ত প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। পরে শেখ হাসিনা দমন-পীড়নের নির্দেশ দিলে এই আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং সেখানে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডার, পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সেনাবাহিনীর হাতে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁর বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন: সেনাবাহিনী আর আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাবে না; বরং শেখ হাসিনার নির্বাসনে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে সহায়তা করবে। এর পরপরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সে সময়ে বিদেশে থাকা এবং একাধিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দেশে ফিরে এলে দেশের নেতৃত্ব তাঁকে দেওয়া হবে।
এর পরবর্তী ১৮ মাস বাংলাদেশের রূপান্তরের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ইউনূস কাঠামোগত সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন করেন। শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করার অঙ্গীকারসহ নানা ধরনের সংস্কারের প্রতিশ্রুতির বাইরে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো মূলত দুটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত ছিল। তার একটি হলো অর্থনীতি এবং আরেকটি হলো নির্বাচনী রাজনীতি।
ইউনূসের অর্থনৈতিক টিম ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে ঠিক করে কিছুটা স্থিতিশীল করতে পেরেছিল। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে অনেক বিতর্ক তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে থাকা ছাত্রনেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত কিছু গোষ্ঠীর চাপের কারণে ইউনূস এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন, যা পরে বড় রাজনৈতিক বিরোধের কারণ হয়। তিনি আওয়ামী লীগের আবার রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেন। ফলে দেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংঘাত শুরু হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
-20250513150315.jpg)
অন্তর্বর্তী সরকার এসে দেশের অর্থনীতি, নির্বাচনব্যবস্থা ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা—এই তিন ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনে। তবে সব জায়গায় একরকম ফল হয়নি। কিছু জায়গায় উন্নতি বা সাফল্য হয়েছে, কিন্তু অনেক সমস্যা এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। তাই এই তিন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা এক নয়—প্রতিটিতে আলাদা অর্জন ও আলাদা অসমাপ্ত সমস্যা আছে।
অর্থনীতি: পরিবর্তনবিহীন স্থিতিশীলতা
বাংলাদেশের অর্থনীতি বাইরের ধাক্কা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সত্ত্বেও কিছুটা স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এটি কোনো ছোট অর্জন নয়। এ অর্জনের পেছনের কারণ হলো, এই অর্থনীতি মূলত দুটি আয়ের উৎসের ওপর নির্ভরশীল—প্রথমটি হলো, তৈরি পোশাক রপ্তানি, যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি; আরেকটি হলো ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স।
অর্থনীতির পতনের ধারা শুরু হয় কোভিড মহামারির সময়। পরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক খাদ্য ও জ্বালানি মূল্যের প্রভাবে সেই পতন আরও তীব্র হয়। এই দুই ধরনের ধাক্কা আবার শেখ হাসিনা সরকারের কাঠামোগত দুর্নীতির কারণে আরও বেশি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
২০২৩ সালে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে এস আলম গ্রুপ ও বেক্সিমকোর জন্য ১৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেন। পরে দেখা যায়, এই অর্থের বড় অংশ হয় বিদেশে পাচার করা হয়েছে, নয়তো ঋণখেলাপি হয়ে গেছে, যা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
হাসিনার অনুগতরা (যাঁর মধ্যে সংসদ সদস্য এবং ব্যবসায়ীরাও ছিলেন) ডিম, শস্য ও রান্নার তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে কারসাজি করেন। এটি খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তোলে। ২০২৪ সালের আন্দোলন স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, তা ছিল কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি এবং কথিত এই ‘ম্যাক্রো-ইকোনমিক মিরাকল’ মূলত হাসিনা-ঘনিষ্ঠ অল্পসংখ্যক কিছু ধনকুবেরেরই লাভ নিশ্চিত করেছিল।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির ঠিক আগমুহূর্তে সমসাময়িক মূল্যায়ন অনুযায়ী, কারফিউ, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও কোটা আন্দোলনের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি কার্যত ‘হঠাৎ সম্পূর্ণ থেমে যাওয়ার’ অবস্থায় পৌঁছায়।
এক মাসের এই অস্থিরতায় দেশ আনুমানিক ১০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়ে। শুধু তৈরি পোশাক খাতেই প্রতিদিন ১৫ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, যা দিয়ে মাত্র তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব ছিল। মাথাপিছু মূল্যস্ফীতি প্রায় ১২ শতাংশে পৌঁছে যায়। আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ১৪ শতাংশে।
যখন ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন এমনই ছিল অর্থনীতির করুণ অবস্থা। কিন্তু তাৎক্ষণিক ও সহজ সমাধান খোঁজার বদলে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের আর্থিক খাতে ব্যাপক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। তারা ১১টি বড় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় (যার মধ্যে ৭টি ছিল এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে) এবং একটি সম্পদ পুনরুদ্ধার কর্মসূচি শুরু করে। জনগণের আমানত রক্ষার জন্য ২০২৫ সালের ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এমন ক্ষমতা দেয়, যাতে দুর্বল বা ব্যর্থ ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা বা দখল নেওয়া যায়।
নতুন নিয়োগ পাওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর (যিনি আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের অর্থনীতিবিদ ছিলেন) দেশের মুদ্রার কৃত্রিমভাবে নির্ধারিত হার বাতিল করেন এবং বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক ভাসমান ব্যবস্থায় (মার্কেট বেজড ফ্লোট) নিয়ে আসেন। ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই রেমিট্যান্স প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে যায়। এই পরিবর্তনের ফলে আন্ডার-ইনভয়েসিং (কম দাম দেখিয়ে আমদানি-রপ্তানি দেখানো) এবং অর্থ পাচারের ঝুঁকিও অনেকটা কমে আসে।
২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতি বিষয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। এর উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনার শাসনামলে অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির প্রভাব সম্পর্কে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া। এই নথিতে বলা হয়, গত ১৫ বছরে হাসিনা সরকার ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লুটপাট করেছে এবং অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ব্যয় কৃত্রিমভাবে অতিরিক্ত দেখানো হয়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার স্বল্প রিজার্ভ সংরক্ষণ করার জন্য একাধিক অবকাঠামো প্রকল্প বাতিল বা স্থগিত করা হয়।
ইউনূস তাঁর ব্যক্তিগত সুনাম ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ ঋণ নিশ্চিত করেন এবং পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ৩ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার পোশাক কারখানার মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে ১৮ দফা একটি চুক্তি করার মধ্যস্থতা করে, যেখানে ন্যূনতম মজুরি ও শিল্পনিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে এই খাত থেকে এইচঅ্যান্ডএম এবং জারার মতো বৈশ্বিক খুচরা ব্র্যান্ডগুলোর সরে যাওয়ার ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তখন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩০ বিলিয়ন ডলার। সে সময় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস ছিল এবং মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ শতাংশের কাছাকাছি।
এভাবে গভীর সংকটে থাকা অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীল করা অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখা হয়। ফলে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেই কাজ শুরু করতে পারে। অর্থাৎ প্রথম দিন থেকেই তাদের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট সামলাতে হয়নি। এই স্থিতিশীল পরিস্থিতি তারেক রহমানকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত থেকে আসা গুরুতর অর্থনৈতিক চাপও তুলনামূলকভাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মোকাবিলা করার সুযোগ দেয়।
পরবর্তী অংশ পড়ুন -২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান -২এ
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats