দৈর্ঘ্যে প্রায় এক মাইল; প্রস্থে ৮০০ ফুট। উচ্চতায় ৩০ তলা। থাকবে স্টেডিয়াম, উদ্যান, জাদুঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণাকেন্দ্র, হাসপাতাল, বাজার, রেস্তোরাঁ, আবাসন—আরও কত কী! এসব নিয়ে সাগরে ভাসবে এক ‘অভিনব শহর’। এর বাসিন্দার সংখ্যা হবে প্রায় ৮০ হাজার। গত ১ জুন ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদন থেকে এমন তথ্য জানা গেল।
বিশ্বের প্রথম ‘ভাসমান শহর’ হিসেবে পরিচিতি পেতে যাওয়া ‘ফ্রিডম শিপ’-এর ওপর সেই প্রতিবেদনে জানানো হয়—এই ‘শহরের বাসিন্দা’ বিশ্বের যেকোনো দেশের মানুষ হতে পারবে। প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে এই মহাযজ্ঞ সম্পাদনে। জাহাজটির ওজন হবে ২৩ লাখ টন।
পরমাণু-জ্বালানি ব্যবহার করে জাহাজটি চালানোর চিন্তাভাবনা চলছে।
এই মহাতরীর ৮০ হাজার অধিবাসীর মধ্যে ৫০ হাজার হবে স্থায়ী। প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানোর ব্যবস্থা থাকবে। এই ৬০ হাজার মানুষের পরিসেবা নিশ্চিত করতে থাকবে প্রায় ২০ হাজার কর্মী।
এমন বিলাসবহুল জাহাজে থাকবে বহুতল হোটেল, ১৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়াম, কনভেনশন সেন্টার, ওয়াটার পার্ক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য সিম্ফনি হল।
সংবাদ প্রতিবেদনটিতে আরও জানানো হয়—সাগরে ভাসমান জাহাজটির ভেতরে বিশাল জলাধারে সাঁতার কাটার সুযোগ থাকবে। বিনোদন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে থাকবে ক্লাব। জাহাজবাসীদের যারা নিয়মিত পরিবেশন করা খাবারের পাশাপাশি স্বাদে ভিন্নতা আনতে চান তাদের জন্য থাকবে দুই-তলা ফুড হল।
শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার কথাও ভেবে রাখা হয়েছে। তাই ভাসমান শহরটির বাসিন্দাদের সন্তানদের জন্য থাকবে স্কুল-কলেজ। জাহাজের চারটি তলা রাখা হচ্ছে বাণিজ্যিক কাজ পরিচালনার জন্য। সেখানে থাকবে ব্যাংক-বাজার। জাহাজটির ছাদে আটটি হেলিপ্যাড থাকবে বলেও প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘ফ্রিডম শিপ’ নামের এই মহাতরীর আয়তনে এত বড় হবে যে তা কোনো দেশের বন্দরে ভেড়ানো সম্ভব হবে না। আর তাই জাহাজটিকে চলাচল করতে হবে আন্তর্জাতিক জলসীমায়। ছোট ছোট ফেরি বা প্রমোদতরী দিয়ে যাত্রীদের আনা-নেওয়া করা হবে। প্রতি দুই বছরে একবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করবে জাহাজটি। জাহাজটির ভেতরে থাকবে তিন একরের উদ্যান। হাঁটতে পছন্দ করা ব্যক্তিদের জন্য থাকবে ১৫ মাইল দীর্ঘ হাঁটাপথ।
যে স্বপ্ন ‘অধরা’ ৩০ বছর
যে বিস্ময়কর জাহাজ ‘ফ্রিডম শিপের’ গল্প বলা হচ্ছে তা এখনো সাগরে ভাসেনি। এমনকি, তা বানানোর কাজও শুরু হয়নি। এমন একটি মহাতরী বানানোর মহাপরিকল্পনা চলছে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে।
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুসারে, ১৯৯০ এর দশকে মার্কিন প্রকৌশলী নরম্যান নিক্সন প্রথম এমন মহাতরী বানানোর প্রস্তাব দেন। তিনি মারা গেছেন ২০১২ সালে। তবে তার স্বপ্ন এখনো মরেনি। নিক্সনের মৃত্যুর পরের বছর সেই জাহাজের নকশা নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা শুরু হয়। আবারও এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানান মুখরোচক গল্প।
তবে দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় পর কেন আবার আলোচনায় ‘ফ্রিডম শিপ’? কারণ—ফ্রিডম ক্রুজ লাইন ইন্টারন্যাশনাল এর প্রধান নির্বাহী রজার গুচ জাহাজটির জন্য প্রকল্প ব্যবস্থাপক, নকশাকার ও একজন নৌপ্রকৌশলীসহ ১২ জনের দল ঘোষণা করেছেন।
‘বাজারে ব্যাপক চাহিদা আছে’—এমনটিই জানানো হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে। রজার গুচের দাবি, ‘এমন তিনটি জাহাজ তৈরির যৌক্তিকতা আছে।’ফ্লোরিডা কার্যালয় থেকে তিনি জুম কলে দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘আমরা খুবই আত্মবিশ্বাসী।’তবে টাকা জোগাড় করাটাই মূল কাজ’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গতকাল ২ জুন একে ‘পুরোপুরি স্বনিয়ন্ত্রিত শহর’ আখ্যা দিয়ে অপর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস জানায়, বর্তমানে সাগরে যেসব জাহাজ ভাসছে ‘ফ্রিডম শিপ’-এর কাছে সেগুলো শিশুতুল্য হয়ে যাবে। গভীর সাগরে এই জাহাজ একটি চলমান শহর হিসেবে বিবেচিত হবে।
দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজ 'স্টার অব দ্য সিজ’-এর তুলনায় আট গুণ বেশি মানুষ ‘ফ্রিডম শিপে’ ভাসতে পারবে।
উল্লেখ্য, এই জাহাজটি পরিচালনা করে রয়েল ক্যারিবিয়ানস নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
তৈরি হবে কোথায়?
সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুসারে—মহাতরীটি বানানোর টাকা নিশ্চিত হলে ইন্দোনেশিয়ায় এর কাজ শুরু হবে। প্রথমে একটি খোলস তৈরি করা হবে। জাহাজটির অবকাঠামো ভাগে ভাগে তৈরির পর সেগুলো জোড়া দেওয়া হবে।
মহাতরীটি তৈরি করতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগবে বলেও প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পুরো কাজ শেষ হওয়ার আগেই বাসিন্দাদের অনেকে জাহাজে থাকতে শুরু করতে পারবেন।
কোনো দেশের কোনো নির্দিষ্ট বন্দরে নয়, বরং সাগরে ভাসমান অবস্থায় জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা যাবে।
গত ২৮ এপ্রিল ইউএস টুডে একে ‘উচ্চাভিলাষী ও ঐতিহাসিক প্রকল্প’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এক প্রতিবেদনে বলে—‘ফ্রিডম শিপ’ সাগরে উদ্ভাবন, টেকসই ও অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতার বলিষ্ঠ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে।
এতে আরও বলা হয়, এটি অন্যসব সাধারণ প্রমোদতরীর মতো নয়। এটি প্রকৌশল বিজ্ঞানে এক অত্যাধুনিক কাজ হিসেবে গৃহীত হবে। বৈশ্বিক বিনোদন জগতে এটি একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেবে। এ ছাড়াও, পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি নজির হয়ে থাকবে এটি।
টাকা আসবে কোথা থেকে?
সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস আরও জানায়—জমিতে যেভাবে একটি আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হয়, তেমনি সাগরে এই ভাসমান আবাসন প্রকল্পটি গড়ে তোলা হবে। বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের জন্য জায়গা ভাড়া দেওয়া হবে।
বাজার, রেস্তোরাঁ ও নানান পরিসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জায়গা ভাড়া দেওয়া হবে। সেখানে একটি বড় হাসপাতাল ও চিকিৎসা বিষয়ে গবেষণাকেন্দ্র থাকবে। জাহাজটি চালনায় পরমাণুশক্তি ব্যবহারের ফলে দূষণ কমানো যাবে।
ফ্রিডম ক্রুজ লাইন ইন্টারন্যাশনাল-এর দাবি, মহাতরীটি যখন চলাচল করবে তখন এটি মহাসাগর পরিষ্কারের কাজেও সহায়তা করবে।
প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ কেভিন শুপফার এই জাহাজটি তৈরিতে স্থাপত্যবিদ্যা ও পরিবেশবান্ধব নকশার ওপর জোর দিচ্ছেন, বলেও এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সাগরের উচ্চতা ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছে। তাই পরিবেশবান্ধব জাহাজটিতে সবুজের সমারোহ থাকবে।
জাহাজটিতে বিনোদনের এমন ব্যবস্থা থাকবে যাতে জগৎ-খ্যাত শিল্পীরাও সেখানে পারফরম্যান্স করতে পারেন।
শেষ কথা
১৯৯৭ সালে বিশ্ববাসীকে ঐতিহাসিক ব্রিটিশ জাহাজ টাইটানিকের কথা নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন কানাডার পরিচালক জেমস ক্যামেরন। তেমনি এই মহাতরী ‘ফ্রিডম শিপ’ নিয়েও হয়ত একদিন তৈরি হবে কোনো মহাকাব্য।
আশা থাকুক, নতুন কাহিনিতে কোনো বিপর্যয় নয়, থাকবে সাগরবিজ্ঞান ও জাহাজ প্রকৌশলের জয়যাত্রার গৌরবের কথা।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats