Monday, 25 May 2026
The News Diplomats
ডিপ্লোমেটস ডেস্ক :
Publish : 06:38 AM, 25 May 2026.
Digital Solutions Ltd

ইতালিযাত্রার করুণ কাহিনী: নেই মৃত্যুসংবাদ, না আছে ফেরার আশা

ইতালিযাত্রার করুণ কাহিনী: নেই মৃত্যুসংবাদ, না আছে ফেরার আশা

Publish : 06:38 AM, 25 May 2026.
ডিপ্লোমেটস ডেস্ক :

গ্রামের নাম তুলাতলা। শরীয়তপুরের এই গ্রামের এক সরু রাস্তার পাশে একটি টিনের ঘর। এই ঘরের মালিক সেলিম জমাদার পেশায় একজন কৃষক। মাঝে মধ্যে গবাদিপশুর ব্যবসাও করেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, সাদাসিধে জীবনযাপন করা এক অতি সাধারণ মানুষ তিনি।

ঘরের ভেতর তার স্ত্রী রিনা বেগম সকালের কাজে ব্যস্ত। রান্নাঘরে বাসনকোসনের শব্দ। সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। তবে ছন্দপতন ঘটল যখন পরিবারের একমাত্র ছেলে রাশেদুল ইসলামকে নিয়ে প্রশ্ন করা হলো। ২০২৩ সালে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে নিখোঁজ হওয়া রাশেদুলের মা রিনা বেগম তখন মুখ খুললেন। ভাঙা গলায় তিনি জানালেন দালালদের প্রলোভন, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং ছেলের ফোন আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সেই করুণ কাহিনী। একসময় কথা বলতে বলতে তার গলা ধরে এলো, তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

রিনা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘দুই বছর পার হয়ে গেল, অথচ আমার ছেলেটা বেঁচে আছে না মরে গেছে—আজও তা জানি না।’শুধু রিনা বেগমই নন, শরীয়তপুরের কয়েকটি গ্রামের প্রায় দুই ডজন পরিবার এখন লিবিয়া ও ইতালির মধ্যবর্তী কোনো এক স্থানে নিখোঁজ হওয়া তাদের প্রিয়জনদের ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।

২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে অন্তত ২৩ তরুণ নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৮ জন শরীয়তপুরের এবং ৫ জন মাদারীপুরের। ইউরোপে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানবপাচারকারী চক্র তাদের বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় পাঠিয়েছিল। নিখোঁজ এই তরুণদের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।

নিখোঁজ হওয়া এই তরুণেরা লিবিয়ার কোনো ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি, নাকি পাচারকারীদের আস্তানায় আটকে আছেন, নাকি ইউরোপের বিপজ্জনক যাত্রাপথে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মারা গেছেন—তা পরিবারের সদস্যরা জানেন না।

শরীয়তপুরের বহু পরিবারের কাছে ইতালি যাওয়া কেবল একটি স্বপ্ন নয়, বরং এটি তাদের সামাজিক রীতিনীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নড়িয়া উপজেলার একটি এলাকা তো স্থানীয়ভাবে ‘ইতালি গ্রাম’ নামেই পরিচিত, কারণ সেখানে প্রায় প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্য ইতালিতে থাকেন। মানব পাচারকারীরা এই বিষয়টি বেশ ভালো করেই জানে।

তারা মূলত অল্প জমিজমা আছে এমন পরিবার, মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী এবং বিদেশে গিয়ে ভাগ্য বদলাতে মরিয়া তরুণদের টার্গেট করে। রাশেদুলও ছিল তাদেরই একজন। তার বাবা সেলিম জানান, ২০২১ সাল থেকে তিনি (রাশেদুল) সৌদি আরবের একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করতেন, কিন্তু তার আসল লক্ষ্য ছিল ইতালি যাওয়া।

‘আমি ওকে ইতালিতে পাঠাতে চাইনি, কারণ আমি জানতাম এই পথ কতটা বিপজ্জনক,’ বলছিলেন সেলিম জমাদার। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৩ সালে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার পর রাশেদ খান ও টুন্নু খান নামে দুই স্থানীয় দালাল তার ছেলেকে প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে।

শেষ পর্যন্ত পরিবারটিকে দালালদের হাতে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা তুলে দিতে হয়। এই বিশাল অংকের টাকা জোগাতে সেলিমকে তার গবাদিপশু বিক্রি করতে হয়েছে, জমি বন্ধক রাখতে হয়েছে এবং আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার নিতে হয়েছে। এমনকি নিজের ২০ শতাংশ জমি মানব পাচারকারীদের নামে লিখে দিতেও বাধ্য হন তিনি।

রাশেদুলকে পরিচিত সেই রুট দিয়েই পাঠানো হয়েছিল— বাংলাদেশ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সেখান থেকে মিসর হয়ে লিবিয়া। ২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকে লিবিয়া এখন এক সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত দেশ।

লিবিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেনগাজি থেকে রাশেদুলকে উত্তর-পশ্চিমের ত্রিপোলিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে রাখা হয় কথিত ‘গেম ঘরে’, যা আসলে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা লোকেদের একটি অস্থায়ী বন্দিশালা।

রাশেদুলের শেষ ফোনটি এসেছিল ২০২৪ সালের ২২ মার্চ। সেলিম সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘সে শুধু বলেছিল যে তাদের ফোনগুলো কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, এরপরই লাইনটা কেটে যায়।’ তারপর থেকে রাশেদুলের আর কোনো হদিস মেলেনি।

সেলিম আরও জানান, ‘আমরা বারবার দালালদের কাছে ছেলের খোঁজ চেয়েছি। প্রথমে তারা বলেছিল, আমার ছেলে মাল্টায় আটক আছে। পরে আবার দাবি করল, সে ইতালি পৌঁছে গেছে।’

একপর্যায়ে ওই দুই দালালই গা-ঢাকা দেয় এবং তাদের মোবাইল ফোনেও আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তুলাতলার কাছাকাছি গ্রাম চর চাটংয়ের গৃহিণী কমলা বেগমও গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে তার ২৫ বছর বয়সী ছেলে আমিনুল ইসলামের খবরের অপেক্ষায় আছেন। ২০২০ সালে আমিনুল দুবাই গিয়েছিলেন, কিন্তু দালালেরা তাকে বোঝায় যে ইতালিতে এর চেয়ে অনেক বেশি আয় করা সম্ভব।

২০২৩ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং পরে একই পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে লিবিয়ার উদ্দেশে রওনা হন। তাকে ‘গেম ঘরে’ নিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত পরিবারটি বিভিন্ন ধাপে পাচারকারীদের প্রায় ১৮ লাখ টাকা দিয়েছিল।

২০২৪ সালের এপ্রিলে আমিনুল শেষবারের মতো ফোন করেছিলেন। তার মা কমলা বেগম বলেন, ‘ও শুধু বলেছিল ও ত্রিপোলি পৌঁছেছে আর পরে কথা বলবে।’ ফোনটি ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার টাকা লাগবে না... আমি শুধু আমার ছেলেকে ফিরে পেতে চাই।’

এমন অনেক বিয়োগান্তক কাহিনী লিবিয়ার দীর্ঘকালীন সংঘাত আর অরাজকতার সুযোগে গড়ে ওঠা এক নৃশংস পাচার ব্যবস্থার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো লিবিয়ায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন, চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক কাজ করানো এবং নির্বিচার আটকে রাখার তথ্য সংগ্রহ করেছে। পাচারকারীরা প্রায়ই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ক্যাম্পে বন্দি করে রাখে এবং অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে দেশে তাদের পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে।

চক্রটি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ওপর ইলেকট্রিক শক দেয় এবং তাদের দিনের পর দিন না খাইয়ে রাখে। এমনকি নির্যাতনের সেই দৃশ্যগুলো ভিডিও করে দেশে পাঠানো হয়, যেন পরিবারগুলো ভয় পেয়ে দ্রুত টাকা পাঠিয়ে দেয়।

বাংলাদেশিদের জন্য লিবিয়া আজ যেমন গন্তব্যের পথ, তেমনি এক ফাঁদ। জাতিসংঘের হিসেবে, মধ্য ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাত্রাকারীদের অন্যতম বড় একটি অংশই বাংলাদেশি। নিশ্চিত মৃত্যুঝুঁকি জেনেও প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই পথে লিবিয়া ছাড়েন।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে বাংলাদেশিসহ ৩১ হাজারেরও বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রাণ হারিয়েছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজ হওয়া এসব মানুষের অনেকের মরদেহ কখনোই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

জেল বা আটককেন্দ্র থেকে মুক্তি পাওয়ার পর অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে আইওএম ও লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস কাজ করে থাকে। তবে বর্তমানে ঠিক কতজন বাংলাদেশি লিবিয়ার এসব ডিটেনশন সেন্টারে দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই।

নিখোঁজ বাংলাদেশিদের পরিবারগুলোর জন্য এই অনিশ্চয়তাই সম্ভবত সবচেয়ে নিষ্ঠুর যন্ত্রণা। তারা না পারেন প্রিয়জনের জন্য শোক প্রকাশ করতে (যেহেতু মৃত্যুর কোনো নিশ্চিত খবর নেই), না পারেন বুক ভরে আশা করতে (যেহেতু বেঁচে আছেন এমন কোনো প্রমাণও নেই)।

বেশ কয়েকটি পরিবার জানিয়েছে যে, স্থানীয় দালাল ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার পর থেকে তাদের হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। শরীয়তপুর ও মাদারীপুর আদালতে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে এক ডজনেরও বেশি মামলা করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযুক্তদের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে তারা আদালত থেকে জামিন পেয়ে গেছে।

কিছু পরিবারের অভিযোগ, পাচারকারীরা প্রতিশোধ নিতে তাদের বিরুদ্ধে উল্টো মিথ্যা মামলা করেছে, আবার অনেককে ভয়ভীতি দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে।

লিবিয়ায় নিখোঁজ আতিকুর রহমানের বোন আফরোজা আক্তার বলেন, কিছু পাচারকারী আত্মগোপনে যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে সালিশি করে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করেছিল। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের নভেম্বরে আমরা যখন সংবাদ সম্মেলন করে অপরাধীদের বিচারের দাবি জানালাম, তখন থেকেই তারা আমাদের হুমকি দেওয়া শুরু করেছে।’

প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার এক ক্ষীণ আশা আর বুকভরা শোক নিয়েই এই পরিবারগুলো দিন অতিবাহিত করছে। তবুও জীবন থেমে থাকে না। বাবারা আবারও ফিরে যান সেই চাষের জমিতে, যা তারা ছেলের বড় হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে বন্ধক রেখেছিলেন।

মায়েরা আজও সেই ফোন কলের অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকেন, যা আর কোনোদিন আসে না। আর শিশুরা বড় হচ্ছে এই অজানার মধ্যে যে—সুদূর কোনো দেশে তাদের বাবা আদৌ বেঁচে আছেন কি না।

WORLD NEWS বিভাগের অন্যান্য খবর

News Diplomats Icon

Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com

The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.

©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats

Develop by _ DigitalSolutions.Ltd
শিরোনাম ইতালিযাত্রার করুণ কাহিনী: নেই মৃত্যুসংবাদ, না আছে ফেরার আশা শিরোনাম বিয়ের গুঞ্জনে কঙ্গনা বললেন, গোপনে বিয়ে করব না, কথা দিচ্ছি শিরোনাম কার লাভ কার ক্ষতি, কুরবানির আগে পশ্চিমবঙ্গে গরু বিতর্ক শিরোনাম নারায়ণগঞ্জের ‘ডোনাল্ড টাম্প’ ভাইরাল, ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া সঠিক নয় শিরোনাম জঙ্গল সলিমপুরে র‌্যাবের ক্যাম্প বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিল সন্ত্রাসীরা শিরোনাম ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সি নিয়ে কাড়াকাড়ি! বিতর্কের পারদ বাড়ছে