ইন্দো–প্যাসিফিক বা ভারত–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে তাদের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও মনোযোগ নিয়ে সংশয় বাড়ছে। একইসঙ্গে দ্রুত সামরিক উত্থানের পথে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। এই অবস্থায় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলো নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়াতে এবং একে অপরের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
গতকাল শনিবার এশিয়ার শীর্ষ প্রতিরক্ষা ফোরাম সংগ্রি–লা ডায়ালগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আঞ্চলিক অংশীদারদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরও বেশি দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নেওয়ার আহ্বান জানান। তবে একই সময়ে তাঁকে এমন উদ্বেগের মুখোমুখি হতে হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়তো অন্যদিকে সরে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সংঘাত এখন ওয়াশিংটনের বাড়তি মনোযোগ দাবি করছে।
ডায়ালগে হেগসেথ বলেন, ‘আমরা একই সময়ে দুটি কাজ করতে পারি।’ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষাপ্রধান, সামরিক কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এতে জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে—ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার ‘অটল।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, কিছু দেশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় সংকল্পকে কম করে মূল্যায়ন করতে পারে।
সম্মেলনের ফাঁকে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষাপ্রধান ও সামরিক কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানান, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর না করে নিজেদের মধ্যে আরও বেশি সহযোগিতা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা এখন জোরদার হচ্ছে। ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্তো তেওদোরো রয়টার্সকে বলেন, ‘এখানে উপস্থিত সব প্রতিরক্ষামন্ত্রীই একমত যে নিজেদের স্বতন্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বাড়ানো জরুরি।’
তেওদোরো বলেন, ‘এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত ভূমিকাকে আরও শক্তিশালী করার একটি প্রচেষ্টা। একই সঙ্গে ম্যানিলা জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং নিউজিল্যান্ডের মতো অংশীদারদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর করছে।’ তিনি বলেন, ‘আরও বেশি পক্ষ যখন প্রতিরোধমূলক পর্যায়ে যুক্ত হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। কারণ একটি অভিন্ন হুমকি রয়েছে।’ নাম উল্লেখ না করলেও ‘হুমকি’টি যে চীন সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই বিশ্লেষকদের মধ্যে।
আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্র হতে চায় জাপান
জাপান নিজেকে এই বিস্তৃত আঞ্চলিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের একটি কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। কোইজুমি বলেন, টোকিও চীনের বাইরে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার জন্য একটি ‘সংযোগস্থল’ হিসেবে কাজ করতে চায়।
গত এপ্রিলে জাপান কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা রপ্তানি নীতির সংস্কার ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে বিদেশে অস্ত্র বিক্রির ওপর থাকা বিভিন্ন বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয় এবং যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্র রপ্তানির পথ উন্মুক্ত হয়। ফোরামে কোইজুমি বলেন, ‘প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সহযোগিতায় জাপান আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। আমাদের লক্ষ্য হলো প্রতিটি দেশের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং যখন প্রয়োজন হবে তখন তা তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।’
’আরও নিবিড়’ অংশীদারত্বের দিকে এগিয়ে যাওয়া
সিঙ্গাপুরের প্রতিরক্ষামন্ত্রী চান চুন সিং বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে নমনীয় অংশীদারত্ব গড়ে তোলা উচিত, যারা সক্ষম ও আগ্রহী দেশগুলোর জোট তৈরি করতে পারে।’ তাঁর ভাষায়, এটি ‘শূন্যতা পূরণ করতে, নতুন ধারণা পরীক্ষা করতে এবং অজানা ও অনাবিষ্কৃত ক্ষেত্রের জন্য নতুন পথ খুঁজে পেতে’ সহায়তা করবে।
কানাডার প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান জেনি ক্যারিগন জানান, তাঁর দেশের সামরিক বাহিনী ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। তারা জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক মহড়ায় সহযোগিতা করছে। পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ার সামরিক সদস্যদের ইংরেজি ভাষা প্রশিক্ষণেও সহায়তা করছে। ক্যারিগন রয়টার্সকে বলেন, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে করার মতো অনেক কাজ রয়েছে। আর এ কারণেই সম্ভবত আমরা সর্বত্র অংশীদারত্ব বৃদ্ধির প্রবণতা দেখছি।’
অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং নতুন সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের বিষয়টি বিবেচনা করছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রিস পেঙ্ক নিশ্চিত করেছেন, পুরোনো হয়ে যাওয়া আনজাক-শ্রেণির ফ্রিগেটের পরিবর্তে জাপানি ও ব্রিটিশ জাহাজ কেনার বিষয়টি ওয়েলিংটন সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।
সাংগ্রি-লা ডায়ালগের ফাঁকে পেঙ্ক সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং ব্রিটেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেন। সেখানে ৫৪ বছর পুরোনো ফাইভ পাওয়ার ডিফেন্স অ্যারেঞ্জমেন্টের (এফপিডিএ) আওতায় ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
এপ্রিলে দায়িত্ব নেওয়া পেঙ্ক বলেন, এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ‘আরও নিবিড় পর্যায়ে’ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা যদি বিদ্যমান সম্পর্কগুলো বজায় রাখার পাশাপাশি অন্যদের সঙ্গেও যোগাযোগের নতুন উপায় খুঁজে পাই, তাহলে একই সময়ে সেটিও করার চেষ্টা করব।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আস্থাশীল মিত্ররা
যদিও আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াচ্ছে, তবু এশিয়ার কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন—মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি কমিয়ে দেয়নি।
ফিলিপাইনের তেওদোরো বলেন, ‘উদাহরণস্বরূপ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা বা অন্য কোনো অঞ্চলে তাদের কার্যক্রমের কারণে আমাদের আস্থা টলে যায়নি।’ অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একেবারেই মৌলিক’ অবস্থান বলে আখ্যা দেন। মার্লেস বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন এবং অস্ট্রেলিয়ার অ্যালবানিজ সরকার উভয়েই মনে করে, আমরা এমন একটি সম্পর্কের রক্ষণাবেক্ষণ করছি, যা আমাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়েও অনেক বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী।’
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats