ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর চার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ যুদ্ধের ভার এখন রাশিয়ার ভেতরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইন্টারনেট–বিভ্রাট, অর্থনীতির সংকোচন, যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতি থেমে যাওয়া—সব মিলিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সামনে নতুন চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা ঠেকাতে পরিকল্পিত ইন্টারনেট–বিভ্রাটে অনেক রুশ নাগরিক ক্ষুব্ধ। রুশ অর্থনীতি সংকোচনের মুখে পড়েছে। ২০২৩ সালের পর এই প্রথম ইউক্রেনে ভূখণ্ড হারাচ্ছে রুশ সেনাবাহিনী। এতে ৭৩ বছর বয়সী পুতিনের জনপ্রিয়তাও ধাক্কা খেয়েছে। স্বাধীন জরিপ অনুযায়ী, গত মাসে তাঁর জনসমর্থন ২০২২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, পরিস্থিতি কঠিন হলেও সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা পুতিনের ক্ষমতা নড়বড়ে হয়ে পড়ছে—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার কাঠামো নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা পুতিন এখনো রাশিয়ার রাজনীতির কেন্দ্রেই আছেন।
রুশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কনস্তান্তিন কালাচেভ বলেন, জনসমর্থন কমছে। মানুষের হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই বুঝতে শুরু করেছেন যে পরিস্থিতি পরিকল্পনামতো এগোচ্ছে না।
তবে কালাচেভের ভাষ্য, ‘এখনো সংকটজনক কিছু ঘটছে না।’
ইন্টারনেট–বিভ্রাট নিয়ে রাশিয়ায় ব্যাপক অসন্তোষ থাকা সত্ত্বেও তা এখনো বড় ধরনের বিক্ষোভে রূপ নেয়নি। কারণ, কর্তৃপক্ষ ভিন্নমতের যেকোনো লক্ষণ কঠোরভাবে দমন করছে। অনেক রুশ নাগরিক বিধিনিষেধ এড়াতে ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করছেন।
কালাচেভ বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ চার বছর পেরিয়ে যাওয়ায় অনেক রুশ নাগরিক স্বল্পমেয়াদি বাস্তবতা নিয়েই বাঁচতে শিখে গেছেন। তাঁরা পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছেন।
কালাচেভের ভাষায়, ‘দেশের পরিস্থিতি এমন—জীবন কঠিন, কিন্তু সহনীয়।’
ধীর হয়ে পড়েছে রুশ অগ্রগতি
সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ইউক্রেনে রাশিয়ার অগ্রগতি প্রায় থমকে গেছে।
বিপুলসংখ্যক সেনা হতাহত হওয়া এবং প্রতিবেশী দেশটিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েও ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি মস্কো।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের তথ্য বিশ্লেষণ করে এএফপি জানিয়েছে, ২০২৩ সালের পর গত এপ্রিল মাসেই প্রথম ইউক্রেনে রাশিয়া যতটা ভূখণ্ড দখল করেছে, তার চেয়ে বেশি হারিয়েছে।
গত ৯ মে মস্কোয় বিজয় দিবসের বার্ষিক কুচকাওয়াজও আগের বছরের তুলনায় অনেক ছোট পরিসরে আয়োজন করা হয়। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার আশঙ্কায় প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রথমবার সেখানে কোনো ভারী সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হয়নি।
প্যারিসভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ইনস্টিটিউট মনতেঁনের আবাসিক বিশেষজ্ঞ মিশেল দুকলো এ মাসের শুরুতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, ৯ মের অনুষ্ঠানটির ম্লান আয়োজন ক্রেমলিনের ভেতরের সংকট ও সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন হতে পারে।
মিশেল দুকলোর মতে, সামরিক ব্যয়ে চাঙা হওয়া রুশ অর্থনীতি এখন স্থবির হয়ে পড়ছে। এমনকি অতীতের সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো মন্দার দিকেও যাচ্ছে।
তবে একই সঙ্গে মিশেল দুকলো সতর্কও করেছেন। তিনি বলেছেন, রাশিয়াকে দুর্বল ভেবে ভুল করার সুযোগ নেই। যুদ্ধক্ষেত্র, জ্বালানি অবকাঠামো ও কূটনৈতিক আলোচনা—তিন ক্ষেত্রেই দেশটি এখনো শক্তিশালী অবস্থানে আছে।
অসন্তোষ আছে, বিকল্প নেই
লাটভিয়ার বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাশিয়ার ব্যবসায়ী অভিজাতদের মধ্যেও অসন্তোষ আছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, পুতিনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে—এমন অজ্ঞাত হুমকির কারণে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো তাঁর নিরাপত্তা জোরদার করেছে।
চলতি মাসের শুরুতে রাশিয়ার অর্থনীতি গত তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ত্রৈমাসিক সংকোচনের মুখে পড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের বিপুল ব্যয় সামাল দিতে কর বাড়ানোয়ও অসন্তোষ বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমনকি বর্তমান বয়স্ক নেতৃত্বের বদলে অপেক্ষাকৃত তরুণ কাউকে সামনে আনার আলোচনা চলছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পশ্চিমা গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরেই পুতিনের ঘনিষ্ঠ বলয়ের ভেতর থেকে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী উঠে আসার জল্পনা রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো মুখ সামনে আসেনি।
২০২৩ সালে ভাড়াটে যোদ্ধাদের বাহিনী ভাগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোশিনের প্রকাশ্য বিদ্রোহের পর পুতিন সামরিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ আরও সীমিত করেছেন।
কালাচেভ বলেন, একটি সংকটের জন্য প্রয়োজন দুটি বিষয়—একটি উদ্দীপক ঘটনা ও একজন নেতা। ব্যাপক হতাশা থাকা সত্ত্বেও এখনো তেমন কোনো উদ্দীপক ঘটনা ঘটেনি। আর রাশিয়ায় এমন কোনো ব্যবস্থা নেই, যেখানে অনুমোদনহীন নেতা হঠাৎ উঠে আসতে পারেন।
কালাচেভের ভাষায়, ‘পরিস্থিতিকে নাটকীয় করার মতো কিছু নেই।’
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats