কেক কাটছেন হাইকমশিনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ, ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং ও পরর�
নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশর হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ বাংলাদেশ-ভারতের বহুমাত্রিক সম্পর্ক, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও প্রয়োজনীয়তা উপর জোর দিয়ে বলেছেন, স্বাধীনতাসংগ্রামে ভারতের সেনাবাহিনী ও ভারতবাসীর অবদান এবং জীবন দানের কথা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রত্যেক বাংলাদেশি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে
বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিবাচক চিত্র আরেকবার ফুটে উঠল গত বৃহস্পতিবার, দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনারের বাসভবনের আঙিনায়। বাংলাদেশের ৫৬তম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত মিলনমেলায় সে দেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ ও ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং—দুজনই দুই দেশের অনন্য ও বহুমাত্রিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
হাইকমিশনার হামিদুল্লাহ যেমন মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা স্মরণ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং তেমন জানান, বহুমুখী সম্পর্ককে গভীরতর করার জন্য নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে ভারত উন্মুখ।
স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ হাইকমিশন ও সংলগ্ন হাইকমিশনারের বাসভবন চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছিল। অতিথিদের বরণ করে হাইকমিশনারের বাসভবনের সবুজ লন পর্যন্ত নিয়ে গেছেন দূতাবাসের কর্মীরা। যাত্রাপথে পাতা ছিল রেড কার্পেট। গাছগাছালি সাজানো হয়েছিল আলোর মালায়।
উৎসব উৎসব এ পরিবেশে আনুষ্ঠানিকতা ছিল সংক্ষিপ্ত। দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর রিয়াজ হামিদুল্লাহ স্বাগত ভাষণে স্বাধীনতাসংগ্রামে ভারতের সেনাবাহিনী ও সাধারণ নাগরিকদের অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন।

নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে আগত ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনীতিক ও কূটনীতিকেরা। ২৬ মার্চ ২০২৬, নয়াদিল্লিছবি: বাংলাদেশ হাইকমিশন
হাইকমিশনার বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ, গণহত্যার মুখোমুখি হয়েও পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো অগণিত মানুষের জীবনদানের কথা এবং ভারতবাসীর অবদান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রত্যেক বাংলাদেশি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করে হাইকমিশনার বলেন, ‘শারীরিক ও মানসিকভাবে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে নানাবিধ সামগ্রী সরবরাহ করে এসব মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থন করেছেন। ১ হাজার ৬৬৮ জন ভারতীয় সেনা আমাদের স্বাধীনতার জন্য আমাদের দেশের মাটিতে প্রাণ হারিয়েছেন। এই আত্মত্যাগ ও অবদান ভোলার নয়।’
জনগণের পক্ষ থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। রিয়াজ হামিদুল্লাহ কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁকেও স্মরণ করেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের অনন্য ও বহুমুখী সম্পর্কের অংশীদারত্বের কথা উল্লেখের সময় হাইকমিশনার হামিদুল্লাহ দুই দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কৃষি, বয়নশিল্প, কারুশিল্প, কবিতা, সংগীত, শিল্পকলার ঐতিহ্য তুলে ধরে সম্পর্কের ধারাবাহিকতার ওপর জোর দেন। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের পাশাপাশি তিনি তুলে ধরেন সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন বোস, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, পণ্ডিত রবিশঙ্করদের ঐতিহ্যশালী অবদান।
এ ধারাবাহিকতা দুই দেশের গভীর মানবিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনকে দৃঢ় করেছে জানিয়ে হাইকমিশনার বলেন, অনেকেরই জানা নেই, রবিশঙ্করের উদ্যোগে যে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ হয়েছিল, তা বিশ্ববাসীর নজর ‘পূর্ব পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধ’ থেকে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে’ ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তাঁর ভাষায়, ‘এই সবকিছুই আমাদের গভীর মানবিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের প্রতিচ্ছবি, যা দীর্ঘস্থায়ী মৌখিক ইতিহাস ও জীবনচর্চায় সমৃদ্ধি লাভ করেছে।’
হামিদুল্লাহ বলেন, এই বহুমাত্রিকতার মধ্যেই সমন্বয়বাদ ও মানসিক ঔদার্য নিহিত। এই ঐতিহ্য এটাই বোঝায় যে বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিক তাঁর ধর্ম ও বিশ্বাস নিয়ে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারেন। উন্নতির সোপানে উঠতে পারেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের উপস্থিতি, দিল্লি হাইকমিশনে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের আগমন ও খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোকবার্তা লেখা, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ও পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির উপস্থিতিরও উল্লেখ করেন হামিদুল্লাহ।
হাইকমিশনার বলেন, এসব সফর দুই দেশেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিবাচকতার ইঙ্গিত বলে অভিহিত হচ্ছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির উল্লেখ করে হামিদুল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতসহ সব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান, বাস্তব পরিস্থিতি ও পারস্পরিক স্বার্থ–সম্পর্কিত অংশীদারত্ব বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন।
বর্তমান বৈশ্বিক জটিলতা ও অনিশ্চয়তায় হাতে হাত মিলিয়ে চলার প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে হাইকমিশনার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লেখা তারেক রহমানের চিঠির উল্লেখ করেন, যাতে মর্যাদা, সাম্য, পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সুফলের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। হামিদুল্লাহর আশা, এ সম্পর্ক ১২ বিলিয়ন ডলারের সীমা পেরিয়ে ২৮-৩০ বিলিয়নে পৌঁছানোর ক্ষমতা রাখে।

অনুষ্ঠানে অতিথিদের আপ্যায়নে ছিল বাংলাদেশের ‘কাচ্চি বিরায়ানি’। ২৬ মার্চ ২০২৬, নয়াদিল্লিছবি: বাংলাদেশ হাইকমিশন
হামিদুল্লাহ তাঁর ভাষণে প্রয়াত জুবিন গার্গকেও স্মরণ করেন। গত বছরের জুলাইয়ে গুয়াহাটিতে জুবিনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের উল্লেখ করে হাইকমিশনার বলেন, জাত, ধর্ম ও সামাজিক বিভেদ অতিক্রম করে নদী, জলাভূমি ও কৃষিব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের ওপর জুবিন জোর দিয়েছিলেন।
সৌহার্দ্য ও সৌভ্রাতৃত্বের বার্তা ফুটে ওঠে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিংয়ের কণ্ঠেও। হাইকমিশনারের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কেক কাটার আগে তিনি বলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারকে ভারতও উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছে। তিনি জানান, বহুমুখী সম্পর্কের প্রসার ঘটাতে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে ভারতও আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছে।
গতকাল বৃহস্পতিবারের মিলনমেলায় অংশ নিয়েছেন ভারতের সাবেক কংগ্রেস নেতা মণিশঙ্কর আয়ার, বিজেপি সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সাংবাদিক, এম জে আকবর, পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল। উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের তিন সাবেক হাইকমিশনার দেব মুখোপাধ্যায়, পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী ও রীভা গাঙ্গুলি দাশ। এ ছাড়া বহু সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক, বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল গোটা অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশের অতি বিখ্যাত ‘কাচ্চি বিরায়ানি’। অতিথিদের রসনাতৃপ্তির ভার নিয়েছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্যাটারিং বিভাগ। হাইকমিশনের উদ্যোগে আজ শুক্রবার দিল্লি প্রেসক্লাবে বিরিয়ানির আয়োজকও তারাই। অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশ থেকে আসা কণ্ঠশিল্পী আয়েশা মৌসুমি ও জাহিদ নীরব।
সান্ধ্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ববিদ ও সমাজবিজ্ঞানী আশিস নন্দী। তিনি বলেন, ‘সম্পর্ক ধীরগতিতে এগোচ্ছে। এভাবেই এগোনো দরকার। নতুন সরকারকে থিতু হওয়ার সময় দিতে হবে। পারস্পরিক আস্থা বাড়াতে হবে। তাড়াহুড়া করা কারও পক্ষেই মঙ্গলের নয়।’
প্রথম আলো থেকে নেয়া।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats