যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আজ সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় বাণিজ্যচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এই চুক্তির পর বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে দেশটির আরোপিত পাল্টা শুল্কহার ১ শতাংশ কমানো হয়েছে। তাতে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কহার ২০ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরি করা পোশাক দেশটিতে রপ্তানি করা হলে তাতে কোনো পাল্টা শুল্ক আরোপ হবে না। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামালে তৈরি পোশাক দেশটিতে রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পাল্টা শুল্ক দিতে হবে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
আজ রাতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার আলোচিত এই বাণিজ্যচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পর এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামীকাল বেলা আড়াইটায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির সার্বিক দিক তুলে ধরা হবে।
এদিকে চুক্তির ফলে সার্বিকভাবে ১ শতাংশ শুল্ক কমা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা কাঁচামালের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে পাল্টা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার বিষয়টিকে বাংলাদেশের জন্য খুবই আনন্দের ও ইতিবাচক বলে মনে করছেন দেশটিতে পোশাক রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ রপ্তানিকারকেরা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের একটি হা–মীম গ্রুপ।
চুক্তি ও তার ফলে প্রাপ্ত সুবিধার বিষয়ে জানতে চাইলে হা–মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, ‘খবরটি আমাদের জন্য খুবই আনন্দের। চুক্তির ফলে যে সুবিধা আমরা পেয়েছি, তা খুবই ইতিবাচক। আশা করছি, এই সুবিধা আমরা ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারব। এমনিতে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তুলা আমদানি করি। এখন সেটি আরও বাড়বে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে কোনো পাল্টা শুল্ক বসবে না। এ জন্য আশা করছি, সুবিধাটি আমরা ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারব। তাতে যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের রপ্তানিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়বে।’
আজ রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে স্বাক্ষর হওয়া বাণিজ্যচুক্তি করতে শুরুতে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমানের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তাঁরা ওয়াশিংটন যাননি। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশ থেকে ভার্চ্যুয়ালি এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকীও অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন।
চুক্তি সই অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের একটি দল ওয়াশিংটন গেছে। অন্য চারজনের মধ্যে রয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দুই যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ শামসুল আরেফীন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কমিশনার রইছ উদ্দিন খান। পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সশরীর উপস্থিতিতে এই চুক্তি হয়।
চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘চুক্তিতে কী কী শর্ত আছে, তা আমরা জানি না। আমি মনে করি, এই ধরনের চুক্তি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে করা মোটেই উচিত হয়নি। আমরা কিছু নতুন সুবিধা পেয়েছি, সেটিকে আমরা অর্জন হিসেবে মনে করতে পারি। কিন্তু তার বদলে কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে বা বাংলাদেশকে কী কী করতে হবে, তা আমরা জানি না। ফলে এই চুক্তিতে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হলো, তা এককথায় বলা মুশকিল। এই চুক্তির দায়ভার এসে পড়বে পরবর্তী সরকারের ওপর। সেই সরকার চুক্তি শর্তগুলো পূরণে কতটুকু প্রস্তুত এবং তাদের এসব বিষয়ে বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে কি না, তা–ও বড় প্রশ্ন। তাই আমি মনে করি, চুক্তির লাভ–লোকসানের হিসাব কষতে হবে চুক্তিতে কী কী শর্ত আছে, তা সার্বিকভাবে পর্যালোচনার ভিত্তিতে।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল দেশটিতে পণ্য রপ্তানিকারক ১০০টি দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন।
শুরুতে বাংলাদেশের জন্য এই হারটি ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে শুল্ক আরোপ তিন মাসের জন্য পিছিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ঠিক তিন মাসের মাথায় ২০২৫ সালের ৭ জুলাই বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্ক ৩৭ থেকে ৩৫ শতাংশে নামানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। আরও দর-কষাকষির পর গত বছরের ২ আগস্ট এ হার কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। গত বছরের ৭ আগস্ট থেকে এই পাল্টা শুল্কহার কার্যকর হয়। পাল্টা শুল্কের বাইরে আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে দেশটিতে ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হতো। পাল্টা শুল্কারোপের পর সব মিলিয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৩৪ শতাংশে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৮০০ কোটি মার্কিন ডলারের। এর মধ্যে ৬০০ কোটি ডলারের রপ্তানি করে বাংলাদেশ। আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ আমদানি করে ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ বাণিজ্যঘাটতি বাংলাদেশের অনুকূলে। এ ঘাটতি কমাতে এরই মধ্যে গম, সয়াবিন তেল, ভুট্টা, তুলাসহ বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য; উড়োজাহাজ ও উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ; তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ইত্যাদি আমদানি শুরু করেছে বাংলাদেশ।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats