সিলেটে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান।
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আগামী ১২ তারিখ নতুন ইতিহাস হবে, ইনশা আল্লাহ। হে রাব্বুল আলামিন, ১৩ তারিখ যে সূর্যের উদয় তুমি ঘটাবে, বাংলাদেশে ওই সূর্যের পিঠে তুমি এক নতুন বাংলাদেশ ছড়াইয়া দিয়ো। আমি আপনাদের সাক্ষী রেখে বলছি, আমি জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না, আমি এই দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই।’
শনিবার বিকেলে সিলেটে এক নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতের আমির প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন। নগরের সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জেলা ও মহানগর জামায়াতের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম।
১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে ব্যাপক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘৫৪ হাজার বর্গমাইলের এক ইঞ্চির ওপরও বেইনসাফি করব না। প্রতি ইঞ্চি মাটি তখন আমার কাছে পাওনা বুঝে নেবে। সিলেটবাসীর সংগত যেসব পাওনা, সেগুলো সিলেটবাসী বুঝে নেবেন। দুর্নীতির রুট যখন বন্ধ হবে, চাঁদাবাজি যখন বন্ধ হবে, তখন উন্নয়নও হবে। পাঁচ বছরে দেশের চেহারা পাল্টে যাবে। নতুন যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমাদের যুবসমাজ, মা-বোনেরা দেখেন, সেই বাংলাদেশ সেদিন হাতে ধরা দেবে ইনশা আল্লাহ।’
সিলেটবাসী নিজেদের খনিজ সম্পদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, ‘ক্ষমতায় গেলে বঞ্চনা থাকবে না। সুপেয় পানি আর ড্রেনেজ–ব্যবস্থার উন্নতি করা হবে। প্রবাসীনির্ভর সিলেটে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আছে। কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন। যদি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরই হবে, তাহলে সব এয়ারলাইনসের ক্রাফট এখানে নামবে না কেন? আমরা আপনাদের কথা দিচ্ছি, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামে নয়, কামে পূর্ণাঙ্গ হবে।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিশেষ করে ইউকেতে যেসব বাংলাদেশি প্রবাসী আছেন, তাঁদের প্রায় ৯০ ভাগ সিলেটের বংশোদ্ভূত। ম্যানচেস্টার একটা গুরুত্বপূর্ণ হাব। সেখানে বিমানের নিয়মিত ফ্লাইট আসত-যেত। এখন বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কেন? আমরা তো এগোব। পেছাচ্ছি কেন? আমরা কি চিংড়ি মাছের দৌড় শুরু করেছি? চিংড়ি মাছ দৌড়াতে শুরু করলে শুধু পেছনের দিকে যায়। আমরা তো সিংহের থাবা মেলে সামনে এগোতে চাই। রুট বন্ধ নয়, ওই রুট চালু করা হবে। আবার নতুন নতুন রুট করা হবে।’ এ সময় কোনো প্রবাসী মৃত্যুবরণ করলে তাঁর মরদেহ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে আনার প্রতিশ্রুতিও দেন জামায়াতের আমির।
বিগত ৫৪ বছরে সব আমলে দেশের টাকা লুটপাট হয়েছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘কেউ ফেরেশতা ছিলেন না। কেউ করেছেন কম, কেউ করেছেন বেশি। শুধু ফ্যাসিবাদী সাড়ে ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এই টাকা কার? এই টাকা ১৮ কোটি মানুষের। জনগণের এই টাকা যাঁরা চুরি করেছেন, আল্লাহ–তাআলা আমাদের দায়িত্ব দিলে ওদের শান্তিতে থাকতে দেব না।’
মদ, গাঁজা, সন্ত্রাস, অস্ত্রে এক দল সিলেটকে অস্থির করে রাখে বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। আল্লাহ–তাআলা যদি আমাদের এই দেশের সেবকের দায়িত্ব দেন, বাংলাদেশের এক ইঞ্চি মাটির ওপরে কেউ আর চাঁদাবাজির সাহস করতে পারবে না। কারও ঘুষ নেওয়ার প্রয়োজন হবে না এবং ঘুষ খাওয়ার সাহস হবে না। সম্মানের সঙ্গে সব নাগরিক বসবাস করার নিশ্চয়তা পাবেন। আজকে রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে বেতন-ভাতা-সুবিধা দেওয়া হয়, সম্মানজনকভাবে জীবনযাপনের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটা ইনসাফভিত্তিক নয়, পর্যাপ্ত নয়। আগে তাঁকে সম্মানজনকভাবে বাঁচার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে, এরপরে যদি লোভের বশবর্তী হয়ে কেউ অপরাধ করেন, অবশ্যই তাঁর অপরাধের বিচার হবে।’
বক্তব্যে নদী রক্ষার প্রতিশ্রুতিও দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, ‘সিলেটের নদীগুলো মরে আছে। বাংলাদেশের নদীগুলো মরে আছে। নদীবান্ধব হবে বাংলাদেশ। নদীর হক নদীকে দেওয়া হবে। নদীর পেট ভরিয়ে তোলা হয়েছে, দখল করা হয়েছে, গার্বেজ দিয়ে নষ্ট করা হয়েছে। বন্ধুদেশগুলোতে নদীগুলো যেভাবে জীবন পেয়েছে, বাংলাদেশের নদীগুলোকে সেভাবে জীবন দেওয়া হবে। সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা শুধু বইয়ের পাতায় যেন না থাকে, বাস্তবে যেন পাওয়া যায়—সেই সুরমা, কুশিয়ারা বানানো হবে।’
জামায়াত ক্ষমতায় এলে সুনামগঞ্জের হাওর–বাঁওড় এলাকায় ফসল রক্ষাকারী বাঁধ নির্মাণে কোনো দুর্নীতি থাকবে না বলেও জানান শফিকুর রহমান।
সম্প্রতি নিজের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হওয়া নিয়েও কথা বলেছেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, ‘আমি মা-বোনদের ইজ্জতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছি, সত্য গলায় কথা বলি, এ জন্য ওইটা জুড়েই আমার বিরুদ্ধে মিসাইল মেরে দিছে, চিন্তা করেন। আমার আইডি হ্যাক করে। এরপর চোর ধরা পড়েছে, এরপরও বড় গলায় কথা বলে। তাহলে কী সেটা এখনো রয়ে গেল—চোরের মায়ের বড় গলা?’
উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের যে জায়গা কৃষিপ্রধান, জলজ সম্পদ, সেই এলাকায় একটা কৃষি রাজধানী গড়ে তোলা হবে। মাঝিদের হাতে জাল তুলে দেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে নামের মাঝি কিন্তু কাজে পাজি। মাঝিদের নামের বিলগুলো কারা নেয়, আমরা সব জানি। আগামী দিনে এসব দুর্নীতির রূপ এবং মূল আমরা কেটে দেব। জাল যার জলা তার।’
শুধুই রাজার ছেলের রাজা হওয়ার রাজনীতি পাল্টে দিতে চান উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, সিলেটের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এতিমের মতো পড়ে রয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আছে, কিন্তু এটা কাজ করছে না। দায়িত্ব পেলে এসবের উন্নতি করার প্রতিশ্রুতি দেন শফিকুর রহমান। সিলেটের চা-জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নেও কাজ করবেন বলে তিনি জানান।
জনসভায় অন্যদের মধ্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা রেজাউল করীম জালালী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, সিলেট-৬ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ও সিলেট-১ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান প্রমুখ বক্তব্য দেন।
সভা সঞ্চালনা করেন সিলেট-৪ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মো. জয়নাল আবেদীন ও মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলী। প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সিলেটের ছয়টি ও সুনামগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীদের হাতে প্রতীক তুলে দিয়ে সবার কাছে ভোট চান। এ সময় তিনি গণভোটে হ্যাঁর পক্ষেও ভোট চেয়েছেন।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats