ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র তিনদিন। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র তিনদিন। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে পৌঁছতে পারেন, সেজন্য কেন্দ্র ও আশপাশ এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা যাতে আগেই প্রতিহত করা যায়, সে লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর টহল ও তৎপরতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখা, প্রার্থী ও তাদের এজেন্টদের জন্য ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেন্দ্র দখল, জোরপূর্বক ভোট দেয়া কিংবা সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার দায়িত্বও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরই থাকবে। এছাড়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী তৎপরতা দমন এবং বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সেনাবাহিনীর কার্যকর ও নিরপেক্ষ ভূমিকার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে এবারের নির্বাচনী পরিবেশ কতটা শান্তিপূর্ণ ও আস্থাবান্ধব হবে এবং ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
এর আগে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীও মোতায়েন ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা মোতায়েন থাকলেও সেসব নির্বাচনে কোথাও কোথাও অনিয়মের দৃশ্যমান অভিযোগ উঠলেও সে সময় তাদের ভূমিকা ছিল মূলত নিষ্ক্রিয়। আরো পেছনে গেলে ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়েও বিতর্ক আছে। সেনা-সমর্থিত ১/১১ সরকারের নেতৃত্বে নির্বাচনে সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন সময়। সব মিলিয়ে গত তিন-চারটি নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এবারের নির্বাচনকে অনেক বিশ্লেষক বাহিনীটির জন্য এক ধরনের ‘ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের’ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, নির্বাচনের মাঠে যদি সেনাবাহিনী সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ থেকে ভোটার, প্রার্থী ও এজেন্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, কেন্দ্রভিত্তিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি অনিয়ম-সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়, তাহলে নির্বাচনে অতীতের বিতর্ককে ছাপিয়ে পেশাদারত্বের একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

এরই মধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে সেনাবাহিনী আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সক্রিয় ও প্রভাবশালী ভূমিকা নিতে প্রস্তুত হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও বার বার বলা হচ্ছে সংঘাত এড়িয়ে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আয়োজনে তারা বদ্ধপরিকর। এরই মধ্যে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেফতারে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
সেনা সদর স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে। প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী বল প্রয়োগ করা হবে। সেনা সদরের সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন ৫ ফেব্রুয়ারি গুলিস্তানে জাতীয় স্টেডিয়াম এলাকায় ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার-এর আওতায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর কার্যক্রম বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অবস্থান তুলে ধরেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, ‘সেনাবাহিনীর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে এনগেজমেন্ট বলে দেয়া আছে। আমরা আইনের আওতায় থেকে সে রুলস অব এনগেজমেন্ট অনুসরণ করে আমাদের দায়িত্ব পালন করে থাকি। যদি সত্যি সত্যি কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বল প্রয়োগের প্রয়োজন হয়, তাহলে রুলস অব এনগেজমেন্টে যে ক্রমান্বয়ে বল প্রয়োগের মাত্রা বৃদ্ধির একটা প্রক্রিয়া আছে, সেটা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সেনা সদরের ওই সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। সেখানে তিনি দুটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন। প্রথমত, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অসামরিক প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আশ্বস্ত করা যে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেবে; দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আস্থা তৈরি করা, যাতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেনাপ্রধানের নির্দেশনায় নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী সরকার, অসামরিক প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছে।
একই দিন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় স্টেডিয়ামে স্থাপিত সেনা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি দায়িত্বরত সেনাসদস্যদের দিকনির্দেশনা দেন এবং বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

এর আগে ৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন নিয়ে গাজীপুরে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানরা মতবিনিময় করেন। গাজীপুরে মতবিনিময়কালে সেনাপ্রধান বলেন, ‘দেশ একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কাজ করছে। নির্বাচন না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন, সরকার, প্রশাসন এবং পুলিশসহ সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী ও নৌ বাহিনী সবাই সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছে। আমাদের সবার লক্ষ্য একটাই, আর তা হলো একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা।’
একই দিন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শরীয়তপুর জেলা পরিদর্শন করেন। তিনি জেলা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন। মতবিনিময়কালে সেনাপ্রধান আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও নাগরিকবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
এদিকে আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর করতে আজ থেকে মাঠে নামছেন সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী আগে থেকেই মাঠে আছে। কাল (রোববার) থেকে আরো যুক্ত হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে তারা ভোটের আগে-পরে সাতদিন থাকবে। এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রে বলা হয়েছে, নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপি এবং কোস্টগার্ড মোতায়েন করা হবে এবং স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার-এর আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হবে।

এবার বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৯ লাখ ৭০ হাজারের বেশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ হাজার, নৌ বাহিনীর পাঁচ হাজার, বিমান বাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ড ৩ হাজার ৫৮৫, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩, চৌকিদার-দফাদারের ৪৫ হাজার ৮২০ জন সদস্য মোতায়েন করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী আমলের গত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তাতে এবারের নির্বাচন সেনাবাহিনীর জন্য কেবল দায়িত্ব পালন নয়, বরং পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতা দৃশ্যমানভাবে প্রমাণ করার বড় সুযোগ। যার মধ্য দিয়ে গত কয়েক বছরের বিতর্ক ও আস্থার ঘাটতি কাটিয়ে বাহিনীটি নিজেদের ভূমিকা ও ভাবমূর্তি নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে অনেকে সেনাবাহিনীর ভূমিকার সমালোচনা করেন। প্রধান বিরোধী জোটের বয়কটের মুখে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন সম্পন্ন হয়। বহু কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিল নগণ্য, আবার কোথাও কোথাও সহিংসতার অভিযোগ ওঠে। ওই নির্বাচনের সময় সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া। সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেন, ওই সময় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ছয় মাসের মধ্যে আরেকটি নির্বাচনের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। সাবেক এ সেনাপ্রধান দাবি করেন, তিনি তার দায়িত্ব পালন করেছেন সংবিধান মেনে এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করার বিপক্ষে ছিলেন।
২০১৮ সালের ১৮ জুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬তম সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পান জেনারেল আজিজ আহমেদ। ওই বছরেরই ৩০ ডিসেম্বর সারা দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ব্যাপক কারচুপির অভিযোগের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৫৭টি আসনে জয়লাভ করে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জোটসহ নিবন্ধিত সর্বমোট ৩৯টি দল অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনীও। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় কার্যত তারা ছিলেন নিষ্ক্রিয় ভূমিকায়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভোট শুরুর পরপরই অধিকাংশ কেন্দ্র দখল করে নেয়। বিএনপিসহ অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। হামলার শিকার হয়ে বিএনপিসহ অন্যান্য দলের নেতাকর্মীরা সহযোগিতা চেয়েও সাড়া পাননি।
২০২৪ সালের একতরফা জাতীয় নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল এসএম শফিউদ্দিন আহমেদ। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অংশ না নেয়ায় নির্বাচনটি শুরু থেকেই গ্রহণযোগ্যতা সংকটে পড়ে। সমালোচকদের অভিযোগ, এ একতরফা নির্বাচনের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনী কার্যত তৎকালীন সরকারের অবস্থানকে সহায়তা করেছে এবং মাঠপর্যায়ে নির্বাচনকে ‘স্বাভাবিক’ দেখানোর কাজে ভূমিকা রেখেছে।

এছাড়া ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি অংশ নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে সহায়তা করেছিল বলে পরবর্তী সময়ে উঠে আসে। দীর্ঘ জরুরি অবস্থা, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল অস্বাভাবিক—৮৭ শতাংশেরও বেশি। এত উচ্চ ভোটার উপস্থিতি কীভাবে সম্ভব হলো—এ প্রশ্নই ২০০৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে সন্দেহ ও বিতর্কের একটি প্রধান উৎস হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই তাদের পছন্দের প্রার্থীদের পক্ষে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল—এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। আর সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করা সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ; সমালোচকদের মতে, এ পুনর্নির্ধারণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ভারসাম্য ও সম্ভাব্য ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—এ চারটি জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনপরিসরে এক ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচনকে অনেক বিশ্লেষক বাহিনীটির জন্য এক ধরনের ‘রিহ্যাবিলিটেশন মোমেন্ট’ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, সংশোধিত আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে যদি সেনাবাহিনী এবার সত্যিকার অর্থে কার্যকর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারে, তবে অতীতের বিতর্ক কাটিয়ে জনআস্থার জায়গায় নিজেদের ভাবমূর্তি নতুন করে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ তৈরি হবে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে এক নির্বাচনী জনসভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়, জনগণও চায় এবং আমরা রাজনৈতিক দলগুলোও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। সুতরাং এবার সম্ভাবনা অনেক বেশি এবার একটা সুন্দর নির্বাচন হবে।’
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ওই বছর আরপিও সংশোধন করা হয়। সে সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় প্রথমবারের মতো সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এর ফলে নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনী শুধু সহায়ক শক্তি হিসেবে নয়, বরং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবেও নির্দিষ্ট ক্ষমতা পায়। তবে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার আরপিওতে সশস্ত্র বাহিনীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞা থেকে বাদ দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার আরপিও সংশোধন করে আবারো সশস্ত্র বাহিনীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা, ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ, প্রার্থী ও এজেন্টদের নিরাপত্তা এবং কোনো অনিয়ম বা সহিংসতার আশঙ্কা দেখা দিলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল রাখতে বড় সহায়ক হবে।’ পেশাদারত্ব ও যথাযথ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সেনাবাহিনী গণতান্ত্রিক উত্তরণকে সফল করবে বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
রিপোর্ট : মাহফুজ রাহমান ও নিহাল হাসনাইন, বণিক বার্তা
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats