সংস্কার শেষে চালু হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালা, যেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক বা গৌরবোজ্জ্বল ছবি ঠাঁই না পেলেও নতুন যুক্ত হয়েছে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর আলোচিত ছবি।
শিক্ষার্থী সংসদের মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা রোববার দুপুরে ডাকসু ভবনের নিচতলায় সংস্কার করা এ সংগ্রহশালার উদ্বোধন করেন। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদসহ অন্যরা এসময় উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনের পর সংগ্রহশালা ঘুরে দেখা যায়, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদী হত্যার পূর্বাপর বেশ কিছু স্থিরচিত্র সেখানে স্থান পেয়েছে।
পাকিস্তানের নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি দেখা যায় সংগ্রহশালায়। এর মধ্যে একটি ছবি ১৯৪৮ সালে ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক অনুষ্ঠানের, যেখানে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’
১৯৪০ সালের মার্চ মাসে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি গ্রুপ ছবিতেও জিন্নাহ রয়েছেন। ওই সম্মেলনেই ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসকারী মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের দাবি সংবলিত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছিল।

অপর ছবিটি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে জিন্নাহর ছবি সংবলিত পাকিস্তানের ডন পত্রিকার প্রতিবেদনের পেপার কাটিং।
ডাকসুর সংগ্রহশালায় আরো দেখা গেল আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, এম এ জি আতাউল গণি ওসমানী, নবাব সলিমুল্লাহ, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ছবি।
বঙ্গবন্ধুর কোনো একক বা গুরুত্বপূর্ণ ছবি সংগ্রহশালায় রাখা হয়নি। তবে ১৯৭৪ সালে তার দুই ছেলের বিয়ের ছবি এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত তিনটি পেপার কাটিং রাখা হয়েছে।
ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন কিংবা ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো ছবি সেখানে চোখে পড়েনি।
জানতে চাইলে ফাতিমা তাসনিম জুমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর ফ্যাসিবাদের সব আইকনের ছবি এখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাই এখানে রাখা হয়নি। আর ৭২-৭৫ সালের অংশে তো তার ছবি আছে।
কিন্তু ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল অংশে কেন নেই, এ প্রশ্নে জুমা বলেন, “ইচ্ছা হয়নি, তাই রাখিনি।”
তাহলে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি কেন রাখা হয়েছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আমি জিন্নাহর ছবি রাখিনি, সেই ইভেন্টের ছবি রেখেছি।”
২০২৫ সালে ডাকসু নির্বাচনের আগেও বঙ্গবন্ধুর বেশকিছু ছবি ডাকসুর সংগ্রহশালায় ছিল।
ডাকসু নির্বাচনের আগের দিন ৮ সেপ্টেম্বর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনেও ডাকসু সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধুর একাধিক ছবি সংবলিত চিত্র প্রকাশ হয়েছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডাকসুর এক কর্মচারী বলেন, “২০২৫ সালে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির জয়ী হওয়ার পর সেই ছবিগুলো সেখান থেকে সরিয়ে ফেলেছে।”
সংগ্রহশালায় আরও যা যা
১৯৪৭—১৯৭১
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদ থেকে শুরু করে সেসময়ের আন্দোলনের কিছু দৃশ্য এবং মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ কবিতাসহ ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক পিয়ারু সরদারের ছবি সেখানে রাখা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের কমান্ডার, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের ছবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ কয়েকজনের বুদ্ধিজীবীদের মুখাবয়ব, সাত বীরশ্রেষ্ঠের ছবি স্থান পেয়েছে সংগ্রহশালায়। এসব ছবির নিচের দিকে মুক্তিযুদ্ধে একটি খোদাই চিত্র আছে, যেখানে বঙ্গবন্ধুও আছেন।

১৯৭১—১৯৮১
১৯৭১ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের দুই ছেলের বিয়ের ছবি এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত তিনটি পেপার কাটিং বাঁধাই করে রাখা হয়েছে। ‘বাংলাদেশে কোনো বিরোধীদল নেই’শীর্ষক সংবাদের পেপার কাটিং এবং চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের দুটি ছবি ডাকসুর সংগ্রহশালায় রাখা হয়েছে।
আর প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলের ছবি হিসেবে খাল খননের দৃশ্য; খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের একসঙ্গে একটি স্থিরচিত্র; জিয়াউর রহমানের যুদ্ধের সময়ের দুটি ছবি এবং ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালট পেপারের একটি ছবি সেখানে স্থান পেয়েছে।
স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ১৪টি স্থিরচিত্র সেখানে রাখা হয়েছে।
যার মধ্যে রয়েছে—শহীদ নূর হোসেনের শরীরে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তিপাক’ লেখা সেই আইকনিক ছবি। এছাড়া ডাকসুর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত শহীদদের তালিকা, শহীদ আসাদকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যসহ আরও কয়েকটি ছবি সেখানে রাখা হয়েছে।

২০০৯—২০২৪
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগ আন্দোলন, বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ ও সানি হত্যাকাণ্ড, ২০২০ সালের মোদী বিরোধী আন্দোলন ও সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ছবি সেখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
তবে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়ের বিশেষ কোনো স্থিরচিত্র পাওয়া যায়নি।
ঘৃণার প্রতীক হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার একটি ছবি স্থান পেয়েছে ডাকসু গ্যালারিতে।
সাহিত্যিক যারা আছেন
ডাকসুর সংগ্রহশালায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে হুমায়ুন আহমেদ, কবি জসীমউদ্দিন, আবুল কাশেম ফজলুল হক, মুনীর চৌধুরী, আবুল ফজলসহ বরেণ্য সাহিত্যিকদের ছবি স্থান পেয়েছে।
হাদীও আছেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় স্থান পেয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়া থেকে শুরু করে সিঙ্গাপুর থেকে লাশ আনা, জানাজা এবং কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে দাফনের ছবি।
ডাকসু বোর্ড
ডাকসু বোর্ডে ২০১৯ সালে নির্বাচিত সহ-সভাপতি নুরুল হক নুরের নাম লেখা হলেও সাধারণ সম্পাদকের নাম খালি রাখা হয়েছে। সেই নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে জয় পেয়েছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী।

পটপরিবর্তনের পর তার বিরুদ্ধে ছাত্রত্ব না থেকেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন তার পদ বাতিল করে ওই মেয়াদে ডাকসুর জিএস ঘোষণা করেন রাশেদ খাঁনকে, যিনি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারীর দায়িত্বে রয়েছেন।
কেন সেই ঘর খালি রাখা হয়েছে জানতে চাইলে ডাকসুর বর্তমান জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, “রাব্বানী ও রাশেদ খাঁন—দুজনেরই বিষয়ে বিতর্ক আছে। কারণ রাব্বানীর ছাত্রত্ব বাতিল হয়েছে, ঠিক আছে। কিন্তু সেই ডাকসু কমিটির তো মেয়াদ শেষ।
“এখন কারো নাম ঘোষণা করলে সেই জিএস হয়ে গেছে এমন না। এক্ষেত্রে তাদের দুজনের যেহেতু বিতর্ক আছে, তাই আমরা খালি রেখেছি।”
ডাকসু ভোটের এক প্রার্থী যা বলছেন
সবশেষ ডাকসু নির্বাচনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা নেতৃত্বাধীন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন নূমান আহমাদ চৌধুরী।
মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক পদে ভোট করা নূমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শুনলাম ডাকসু সংগ্রহশালার আধুনিকায়ন করা হয়েছে। নতুন করে সাজানো হয়েছে। তবে একটিবারের জন্যও ওদিকে যাবার আগ্রহ হয়নি।
“কারণ জানি যে সংস্কার কাজ করেছে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সরাসরি যুদ্ধাপরাধের সাথে যুক্ত থাকা সংগঠন ‘পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘ’র (পরিবর্তিত নাম ইসলামী ছাত্রশিবির) প্যানেল।”
তিনি বলেন, “তাদের করা সংস্কার কীরকম হতে পারে, সেটা আগে থেকেই অনুমান করা যায়। লোকমুখে জানতে পারলাম, সেখান থেকে আমাদের মুক্তি সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরিয়ে ফেলে পাকিস্তানের জাতির পিতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি টাঙানো হয়েছে; যেই জিন্নাহ শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের সাথে বেঈমানি করে তার লাহোর প্রস্তাব কাঁটছাট করে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের সাথে জুড়ে দিয়ে এই অঞ্চলের মানুষকে একাত্তরের বিভীষিকার দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন।”

নূমান আহমাদ চৌধুরী বলেন, “ডাকসু মুজিবের ছবি রেখেছে, তবে মুজিবের জীবনের যে অধ্যায়টা বিতর্কিত—সেই সময়ের ছবি রেখেছে। কিন্তু যে মুজিবকে সামনে রেখে পুরো বাঙালি জাতি মুক্তিসংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, সেই মুজিবকে সরিয়ে ফেলেছে।
“ওরা আপামর বাঙালির নেতা শেখ মুজিবকে মুছে দিয়ে শুধু তার বিতর্কিত অধ্যায়টা রাখতে চায়; কারণ তাকে মুছে দিতে পারলে ও বিতর্কিত করতে পারলে বাংলাদেশের জন্মকে ও স্বাধীনতার সংগ্রামকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। ১৯৭১ এ পরাজয়ের জ্বালায় একটু প্রলেপ দেওয়া যায়।”
তিনি বলেন, “একাত্তর পূর্ববর্তী সময়ে পাকিস্তানি শাসকদের এক নম্বর পূর্ববঙ্গীয় শত্রু ছিলেন শেখ মুজিব। তাদের উত্তরসূরিদের ক্ষেত্রেও তাই হওয়াটাই স্বাভাবিক। স্বাধীনতার পর শিবিরের আদি পিতা যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম চেষ্টা করেছিলেন ভেঙে দুই টুকরা হয়ে পাকিস্তানকে পুনরায় জোড়া লাগানোর। গোলাম আযমের উত্তরসূরিরা যে তার সেই পরিকল্পনা থেকে এখনো সরে আসেনি, ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি সরিয়ে ফেলাই তা প্রমাণ করে।”
ডাকসুর সাবেক এক নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এর আগে কখনো জিন্নাহর ছবি ডাকসুতে ছিল না। ইসলামী ছাত্রশিবির ছাত্র সংসদে আসার পর এ ছবি যুক্ত করেছে।”
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats