কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে ডিলার পয়েন্টের বেড়া ভেঙে প্রায় ২০০ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে গেছেন ক্ষুব্ধ কৃষকেরা। সারের কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ তুলে এ হামলা চালান একদল কৃষক। আজ রোববার দুপুরের দিকে উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের ধলডাঙ্গা বাজার এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতেই এ ঘটনা ঘটে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে লুট হওয়া সারের বস্তার অধিকাংশই উদ্ধার হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ডিলার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিলখুড়ি ইউনিয়নের বিসিআইসির অনুমোদিত সারের ডিলার মেসার্স শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজে সার বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় চারজন পুলিশ সদস্যসহ স্থানীয় বিএনপি নেতারা উপস্থিত ছিলেন। আকস্মিক ক্ষুব্ধ কৃষকেরা ডিলার পয়েন্টের ঘরের টিনের বেড়া ভেঙে প্রায় ২০০ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যান। পরে খবর পেয়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে ক্ষুব্ধ কৃষকদের অনেকে সারের বস্তা ফেরত দিয়ে যান। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত লুট হওয়া সব বস্তা ফেরত পাননি বলে দাবি করেছেন ডিলার।
ডিলার পয়েন্টে সার নিতে গিয়ে খালি হাতে ফেরত যাওয়া কয়েকজন কৃষকের অভিযোগ, কয়েক দিন ধরে সারের জন্য ঘুরছিলেন তাঁরা, কিন্তু পাচ্ছিলেন না। ইউনিয়নের বরাদ্দ সারের অর্ধেক খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেন ডিলার। ফলে, চাহিদামতো তাঁরা সার পান না। শুধু তা-ই নয়, ১ হাজার ৩০০ টাকা দামের সারের বস্তা ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করা হয়।
ফলে, সারের কৃত্রিম এই সংকটের কারণে সার পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে এবং ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করেন ক্ষুব্ধ কৃষকেরা।
মেসার্স শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী তাইফুর রহমান মুকুল বলেন, ‘দুপুরে সার বিতরণের প্রস্তুতি চলছিল। এ সময় কয়েকজন ব্যক্তি এসে আমাকে অবরুদ্ধ করে। ডিলার পয়েন্টের বেড়া ভেঙে প্রায় ২০০ বস্তা ইউরিয়া ও এমওপি (মিউরেট অব পটাশ) সার নিয়ে যায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, পুলিশ প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করতে বেগ পেতে হচ্ছিল।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার বলেন, ১৯৭ বস্তা সার লুটের ঘটনা ঘটেছে। সারসংকট ও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ সঠিক নয়। যে ইউনিয়নে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে সারের কোনো সংকট নেই। লুট হওয়া সার উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
তবে কৃষি কর্মকর্তার দাবির বিপরীত চিত্র উঠে এসেছে উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে। আজ সার লুটের ঘটনার পর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমৃত দেব নাথ। অভিযানে কৃষক ছাড়া খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সার বিক্রি নিয়ে অভিযোগের সত্যতা পান তিনি। এমন অভিযোগে উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের পাগলাহাট এলাকায় এক ডিলারকে পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
ইউএনও বলেন, ‘আমরা অভিযানে বের হয়েছি। কৃষকদের অভিযোগগুলো গুরুত্ব দিয়ে ডিলার পয়েন্ট ও খুচরা বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’
ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিম উদ্দিন বলেন, শিলখুড়ি ইউনিয়নে বিতরণকালে ১৯৭ বস্তা সার লুটের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পর্যাপ্ত পরিমাণে সার পাবে না—এমন আশঙ্কায় সার নিতে আসা ব্যক্তিরা লুটপাট চালিয়ে সারের বস্তা নিয়ে যান। বিকেল পর্যন্ত লুট হওয়া সারের ৫৮ বস্তা ফেরত পাওয়া গেছে। লুট হওয়া সার ফেরত পাওয়া না গেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজশাহীর ডিডিকে সাতক্ষীরায় বদলি
রাজশাহীতে আমনের ভরা মৌসুমে সারের জন্য একের পর এক হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছেন কৃষকেরা। সারের জন্য ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে কৃষকেরা অপেক্ষা করছেন, কিন্তু বিক্রয়কেন্দ্র খোলার লোক নেই। এ অবস্থায় কৃষকেরা এক ডিলারের কাছ থেকে আরেক ডিলারের কাছে ছুটছেন।
এদিকে সার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে খবর প্রকাশের পর গতকাল শনিবার রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনকে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রে বদলি করা হয়েছে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন শরীয়তপুরের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন। অন্যদিকে অবৈধ সার মজুতের ঘটনায় গতকাল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেছে তদন্ত কমিটি।
আজ রোববার সকালে জেলার পবা উপজেলার আলীমগঞ্জ এলাকার বিসিআইসির সার ডিলার আবদুল গাফফারের সার বিক্রয়কেন্দ্র ‘মেসার্স মুনলাইট কৃষি বিতানে’ গিয়ে বন্ধ পান একদল কৃষক। ডিলারকে ফোন দিলে তিনি বলেন, তিনি রাজশাহীর বাইরে আছেন। তাঁর ব্যবস্থাপককে ফোন দিতে বলেন। তাঁকে ফোন দিলে বলেন, তিনি বাজার করতে এসেছেন।
সার নিতে আসা পবার নতুন কসবা গ্রামের কৃষক গোলাম পাঞ্জাতন বলেন, এবার ১১ বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। এখন পর্যন্ত এক ছটাক সারও দিতে পারেননি। এই ডিলারের দোকানে তিন দিন ঘুরে গেছেন, কিন্তু দোকান খোলা পাননি। আজও সার না পেয়ে খালি হাতে ফিরেছেন।
একই বিক্রয়কেন্দ্রে সার নিতে এসেছিলেন গোদাগাড়ীর চাপাল গ্রামের কৃষক আতাউল হোসেন। তিনি চার বিঘা জমিতে কোনো সার দিতে পারেননি। তিনি বলেন, গোদাগাড়ীর রাজাবাড়ি এলাকার ডিলারের কাছ থেকে সার নেন, কিন্তু এবার তিনি সার দিতে পারছেন না। এখানে এসেও পেলেন না। এখন ডিলার নজরুল ইসলামের কাছে যাবেন।
বেলা একটার দিকে ডিলার আবদুল গাফফারকে ফোন করলে তিনি বলেন, এখন তাঁর ব্যবস্থাপক দোকান খুলেছেন। ততক্ষণে যাঁরা সার নিতে এসেছিলেন, সবাই অন্য ডিলারের কাছে ছুটে যান। মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, তাঁরা পাঁচজন কৃষক ডিলার নজরুল ইসলামের কাছ থেকে সাত বস্তা ইউরিয়া সার নিতে পেরেছেন।
গত বৃহস্পতিবার ‘চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না কৃষক, দামও বেশি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর আগের দিন বুধবার এ নিয়ে প্রথম আলোতে একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। এর পর থেকে কর্তৃপক্ষ অভিযান জোরদার করেছে। একই দিনে চারটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়েছে। এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকেই প্রায় ১০ লাখ টাকার সার জব্দ করা হয়।
এ ঘটনায় শুক্রবার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক মো. খালেদুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মিতা সরকার ও তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ। গতকাল কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
এ বিষয়ে কথা বলতে অতিরিক্ত পরিচালক মো. আজিজুর রহমানকে ফোন করলে মিটিংয়ে আছেন বলে জানান। পরে আজ দুপুর পর্যন্ত একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি কেটে দেন। আজ দুপুরে কার্যালয়ে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর কর্মচারীরা জানান, বেলা আড়াইটার দিকে তিনি দুপুরের খাবার খেতে বাসায় যান। বিকেল পৌনে চারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেও তিনি কার্যালয়ে ফেরেননি।
জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি এবং রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তিনি এখনো তদন্ত প্রতিবেদন পাননি। এত সার ওই ব্যবসায়ী কোথা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন—জানতে চাইলে বলেন, বিভিন্ন ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে ওই ব্যবসায়ী সারগুলো সংগ্রহ করেছিলেন। ওই সব ডিলারকে জরিমানা করা হয়েছে। আর তদন্ত প্রতিবেদন পেলে সেই অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, রাজশাহীর জন্য বাড়তি সার চাওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সংকট তৈরি না হয়।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats