ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসি এবং বার্সেলোনার ডান প্রান্তে তার উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত লামিনে ইয়ামাল- দুজনই প্রথমবারের মতো একে অপরের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। আগামী রোববার বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের লড়াইয়ে এই বহুল প্রতীক্ষিত দ্বৈরথ দেখা যাবে।
মেসির বর্তমান বয়স ৩৯ বছর, আর ইয়ামালের মাত্র ১৯। একজন দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলে নিজের আধিপত্য ধরে রেখেছেন, অন্যজন কৈশোরেই ফুটবল বিশ্বের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হয়েছেন।
ফলে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এই দুই প্রজন্মের প্রতিনিধির মুখোমুখি হওয়াকে অনেকেই বিশেষ এক মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন।
১৯ বছর আগেই হয়েছিল প্রথম সাক্ষাৎ
তবে মেসি ও ইয়ামালের প্রথম দেখা এবার নয়। সেটি হয়েছিল ২০০৭ সালে, যখন ২০ বছর বয়সী মেসি সদ্য বার্সেলোনার নিয়মিত খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিলেন। আর ইয়ামালের বয়স ছিল মাত্র পাঁচ মাস।
সেই সময় বার্সেলোনার আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্তের তোলা কয়েকটি ছবি এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। ছবিতে দেখা যায়, মেসি কোলে নিয়ে ছোট্ট ইয়ামালকে আদর করছেন, এমনকি তাকে গোসলও করিয়ে দিচ্ছেন।
২০২৪ সালে স্পেনের হয়ে ইউরো জয়ের সময় ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই সেই ছবিগুলোর একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। ছবির ক্যাপশনে তিনি লিখেছিলেন, দুই কিংবদন্তির সূচনা।
‘অলৌকিক ঘটনা’
বিবিসি স্পোর্টসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ত বলেন, এটি যেন ভাগ্যের এক অলৌকিক পরিহাস। তার ভাষায়, এটি সত্যিই ভাগ্যের এক বিস্ময়কর ঘটনা। এমন কিছু, যা আপনি কল্পনাও করতে পারেন না। যদি কেউ এই গল্প নিয়ে সিনেমা বানাত, তাহলেও সেটিকে অবাস্তব মনে হতো। শিশুকে কীভাবে সামলাতে হবে, বুঝতে পারছিলেন না মেসি
ছবিগুলো তোলা হয়েছিল বার্সেলোনার তৎকালীন মাঠ ক্যাম্প ন্যুর অ্যাওয়ে ড্রেসিংরুমে। ইয়ামালের পরিবার একটি প্রতিযোগিতায় জিতে সেখানে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। কাতালান সংবাদপত্র স্পোর্ট, বার্সেলোনার জার্সি স্পনসর এবং আন্তর্জাতিক শিশু দাতব্য সংস্থা ইউনিসেফ যৌথভাবে এই আয়োজন করেছিল।
লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত পরিবারগুলোর শিশুদের সঙ্গে বার্সেলোনার প্রথম দলের একজন খেলোয়াড়ের ছবি তোলা হতো। ভাগ্যক্রমে ইয়ামালের পরিবারের সঙ্গে জুটি বাঁধেন মেসি।
মনফোর্ত বলেন, ২০২৪ সালে এক বন্ধু আমাকে ফোন করে জানায় যে ছবির শিশুটিই লামিনে ইয়ামাল। তার আগে আমি বিষয়টি জানতামই না।
তিনি আরও বলেন, মেসি খুবই লাজুক ও অন্তর্মুখী মানুষ। ড্রেসিংরুমে এসে হঠাৎ তাকে একটি ছোট্ট শিশুকে নিয়ে ছবি তুলতে বলা হয়েছিল। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি বুঝতেই পারছিলেন না কী করবেন। তবে ইয়ামাল ছিল খুব হাসিখুশি শিশু। তার মা শেইলা আমাদের সাহায্য করেছিলেন। পরিবারটি আর্থিকভাবে খুবই কষ্টে ছিল, কিন্তু তারা অত্যন্ত ভদ্র ও সহযোগিতাপরায়ণ ছিলেন।
১৯ বছরেই ইয়ামালের অর্জন চমকে দেয়ার মতো
১৯ বছর বয়সে মেসির ঝুলিতে ছিল ১১টি সিনিয়র গোল, একটি লা লিগা এবং একটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। অন্যদিকে, সদ্য ১৯ বছরে পা রাখা ইয়ামাল ইতোমধ্যে ৫৬টি গোল করেছেন। জিতেছেন তিনটি লা লিগা, একটি কোপা দেল রে এবং স্পেনের হয়ে ইউরো ২০২৪-এর শিরোপা।
‘ইয়ামাল’ আসলে পদবি নয়
অনেকেই মনে করেন ‘ইয়ামাল’ তার পারিবারিক নাম। বাস্তবে তা নয়। তার পুরো নাম লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই এবানা।
‘লামিনে’ ও ‘ইয়ামাল’- দুটি নামই তার জার্সির পেছনে ব্যবহার করেন তিনি। জন্মের সময় পরিবারের আর্থিক সংকটে পাশে দাঁড়ানো দুই ব্যক্তির সম্মানে তার বাবা এই দুই নাম রাখেন বলে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমগুলোতে জানা গেছে।
‘লামিনে’ আরবি ভাষার একটি প্রচলিত নাম, যার অর্থ ‘সৎ’ বা ‘বিশ্বাসযোগ্য’। আর ‘ইয়ামাল’ নামটি ‘জামাল’- এর একটি রূপ, যার অর্থ ‘সৌন্দর্য’ বা ‘লাবণ্য’।
শৈশব কেটেছে রোকাফোন্দায়
বার্সেলোনা থেকে প্রায় ২০ মাইল উত্তরের মাতারোর শ্রমজীবী এলাকা রোকাফোন্দায় বেড়ে ওঠেন ইয়ামাল। নিজের এলাকার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে তিনি গোল করার পর প্রায়ই আঙুল দিয়ে ৩-০-৪ ইশারা করেন, যা রোকাফোন্দার পোস্টকোডের প্রতীক।
এর আগে এল পাইসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়ামাল বলেছিলেন, আমার মা-বাবা আমার জন্য যা করেছেন, আমি হয়তো নিজের সন্তানের জন্যও তা করতে পারব না। অর্থ না থাকলে সন্তানের ফুটবল খেলা চালিয়ে নেয়া খুব কঠিন। কিন্তু আমার বাবা-মা সবকিছু সম্ভব করেছেন। তাদের এই ঋণ আমি কখনোই শোধ করতে পারব না।
‘আমার হৃদয় যেন দুই ভাগ হয়ে যাচ্ছে’
কাতালান এবং বার্সেলোনা সমর্থক জোয়ান মনফোর্তের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে মেসি ও ইয়ামালের মুখোমুখি হওয়া যেন ১৯ বছর আগে শুরু হওয়া এক অসাধারণ গল্পের পূর্ণতা।
তিনি বলেন, আমার মনে হয়, তাদের গল্পের একটি চক্র এখন সম্পূর্ণ হতে চলেছে। আমি চাই মেসি দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নিজের ক্যারিয়ার শেষ করুন। তিনি সেটির যোগ্য।
তবে একই সঙ্গে তিনি যোগ করেন, অন্যদিকে ইয়ামালের সামনে এখনও অনেক সময় রয়েছে বিশ্বকাপসহ বড় বড় শিরোপা জয়ের। কিন্তু যদি সে এখনই জিতে যায়, তাহলে সেটির মূল্য তার অন্য যেকোনো শিরোপার চেয়েও বেশি হবে।
শেষে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমার জন্য এটি খুব কঠিন। মনে হচ্ছে, আমার হৃদয় যেন দুই টুকরো হয়ে যাচ্ছে।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats