আটক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর ছবি প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প
বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুত দখল করতেই কি ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর ছবি প্রকাশ করছেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সিএনএনের খবরে বলা হয়, কিছুক্ষণ আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে মাদুরোর ছবি প্রকাশ করেন ট্রাম্প। মাদুরোকে মার্কিন জাহাজ ইউএসএস আইয়ো জিমায় দেখা যায়। ছবিতে দেখা যায়, ধূসর রঙের পোশাক পরা মাদুরো হাতে একটি পানির বোতল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
দ্য গার্ডিয়ানের রিপোর্টে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আজ শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলাজুড়ে বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে ভোরের আগেই রাজধানী কারাকাস প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে। এর কিছুক্ষণ পরেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে বন্দী করে ভেনেজুয়েলা থেকে আকাশপথে দেশের বাইরে নিয়ে গেছে।

একটি দেশের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে এভাবে বন্দী করার এই নজিরবিহীন ঘটনাটি মূলত ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের গত কয়েক মাসের তীব্র চাপের ফল। সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন নৌবাহিনী ভেনেজুয়েলা উপকূলে বিশাল নৌবহর মোতায়েন করে। ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের অভিযোগে বিভিন্ন নৌযানে একের পর এক বিমান হামলা চালায়। এ ছাড়া তারা ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজও জব্দ করে। এসব হামলায় কমপক্ষে ১১০ জন নিহত হয়েছেন, যা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হতে পারে।
ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুত দখল করতেই যুক্তরাষ্ট্র এসব করছে। মাদুরোকে বন্দী করার এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের একটি অত্যন্ত গুরুতর ও নাটকীয় মোড়। এখন ভেনেজুয়েলার বর্তমান শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।
আমরা এখানে কীভাবে পৌঁছালাম
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই নিকোলা মাদুরোকে তাঁর প্রধান নিশানা বানান। তিনি মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসী পাঠানোর মতো অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তোলেন। গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিকোলা মাদুরোকে বিশ্বের অন্যতম বড় মাদক পাচারকারী হিসেবে অভিযুক্ত করে তাঁর মাথার দাম ৫ কোটি ডলার ঘোষণা করে।
ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন গোষ্ঠী (যেমন ট্রেন দে আরাগুয়া) সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে এবং সমুদ্রে অভিযান শুরু করে। ট্রাম্প খোলাখুলিভাবেই ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। নভেম্বরের শেষ দিকে তিনি মাদুরোকে ক্ষমতা ছাড়ার চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেন এবং নিরাপদে দেশ ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। মাদুরো সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তিনি ‘দাসের শান্তি’ চান না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে তেল লোভী হিসেবে অভিযুক্ত করেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চাপের মুখেও মাদুরো সরকারকে মাঝেমধ্যে বিভ্রান্ত মনে হয়েছিল। মাদুরো বারবার বলছিলেন, তিনি যুদ্ধ চান না। এমনকি বন্দী হওয়ার দুই দিন আগেও তিনি টিভিতে এক সাক্ষাৎকারে ভেনেজুয়েলার তেল খাতে মার্কিন বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার বিরোধের কারণ কী
১৯৯৯ সালে হুগো চাভেজ প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। সমাজতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চাভেজ আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের বিরোধিতা করে এবং কিউবা ও ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষুব্ধ করেছিলেন। ২০০২ সালে তাঁর বিরুদ্ধে এক অভ্যুত্থান–চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের মদদ ছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থী নেতাদের কাছে ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক আদর্শ দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাভাবিক শত্রুতে পরিণত করেছে। চাভেজ এবং পরবর্তীকালে ২০১৩ সালে মাদুরো ক্ষমতায় আসার পর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিরোধীদের দমনের অভিযোগে সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়। ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরো সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে হুয়ান গুয়াইদোকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মাদুরোর বিরুদ্ধে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে। বিরোধী প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেস বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেলেও মাদুরো দমন-পীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখেন।
ডিসেম্বর মাসের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ‘ট্রাম্প করোলারি’ নামক একটি নীতি প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়—পশ্চিম গোলার্ধের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামরিক ক্ষেত্র অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে এবং খনিজ সম্পদ আহরণে মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যবহার করা যাবে।
মাদুরো কে, ট্রাম্প কেন তাঁকে বন্দী করলেন
মাদুরো ২০১৩ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট। সাবেক এই বাসচালক চাভেজের আমলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পরিচিতি পান। মাদুরোর শাসনকালকে স্বৈরতান্ত্রিক হিসেবে দেখা হয়। জাতিসংঘের মতে, তাঁর আমলে ২০ হাজারের বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্প বারবার মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ডাক দিয়েছেন। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের দেওয়া অনেক অভিযোগেরই যথেষ্ট প্রমাণ নেই। তবু শনিবারের এই দুঃসাহসিক অভিযান সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষ এই অতর্কিত হামলার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
এরপর কী
ভেনেজুয়েলার সামনের দিনগুলো অনিশ্চিত। ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই মার্কিন ‘আগ্রাসন’ প্রতিরোধের শপথ নিয়েছেন এবং একে ‘স্বাধীনতার লড়াই’ বলে অভিহিত করেছেন। মাদুরো বন্দী হলেও দেশটির সেনাবাহিনী এখনো অটুট রয়েছে। এটি কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের শুরু নাকি এককালীন অভিযান, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
বিরোধী নেতারা ট্রাম্পের কাছে সমর্থন চেয়েছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে এভাবে সরিয়ে দেওয়ার ফলে ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ক্ষমতার লড়াইয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats