স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ দুবাই আদালত থেকে শর্ত সাপেক্ষে জামিন পেয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন। তাঁর জামিন আদেশ বাতিলের জন্য বাংলাদেশ সরকার দুবাইয়ে ‘ল’ ফার্ম নিয়োগ করেছে।
বাংলাদেশ সময় আজ রোববার বিকেলে রাজশাহী পুলিশ লাইনসে এক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। রাজশাহী রেঞ্জ এবং মেট্রোপলিটন পুলিশের অফিসার ও ফোর্সের সঙ্গে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভা শেষে সাংবাদিকেরা সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমদকে নিয়ে প্রশ্ন করেন। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমি এখন শুনলাম, এটা স্টেজে বসে। সাথে সাথে হোম সেক্রেটারির সাথে কথা বলেছি। হোম সেক্রেটারি দুবাইয়ে আমাদের যে অ্যাম্বাসেডর, তাঁর সাথে কথা বলেছেন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘কয়েক দিন আগেই আমরা ল ফার্ম নিয়োগ করেছি, এই বিষয়টার জন্য শুধুমাত্র। তাকে ইনস্ট্রাকশন (নির্দেশনা) দেওয়া হয়েছে বেইল ক্যানসিলেশনের জন্য সে পার্সিউ করবে। আমি খবর পেয়েছি, তাঁকে অন কন্ডিশন, ইউএই লিভ না করার শর্তে বেইল দিয়েছে। কী শর্ত, আমি সার্টিফায়েড কপিটা জোগাড় করতে বলেছি এবং আমাদের যে ল ফার্ম নিয়োগ হয়েছে, তাদেরকে আমরা ইন্সট্রাকশন দিয়েছি যেন এই বেইল ক্যানসিলেশনের জন্য তারা পার্সিউ করে।’
এখন বাংলাদেশ কী করবে, এমন প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তারা (বেনজীর আহমেদ) আইনানুগভাবে গিয়েছে, আমরা ল ফার্ম নিয়োগ করেছি। আমাদের চেষ্টা আমরা করছি। আমরা আশা করছি, বেইল ক্যানসেল করতে পারব এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে ফেরত নিতে পারব।’
এর আগে আজ সকালে রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৭তম বিসিএস পুলিশ ব্যাচের (প্রথম পর্যায়) সমাপনী কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। প্যারেড গ্রাউন্ডে সমাপনী কুচকাওয়াজের অভিবাদন গ্রহণ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পরে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন।
অনুষ্ঠানে পুলিশ কোনো দল বা গোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনী নয়, মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘পুলিশ দলীয় প্রভাবমুক্ত, আধুনিক, প্রযুক্তিবান্ধব ও মানবিক একটি সংস্থা, যা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলবে।’
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাবের সাবেক ও তৎকালীন সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তাঁদের মধ্যে বেনজীর আহমেদও ছিলেন।
২০২৪ সালে গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস আগে বেনজীর ও তাঁর পরিবারের বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসে। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে দুদক। ওই সময় তিনি দেশ ছাড়েন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার আদেশ দেন আদালত।
এর আগে ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর, তাঁর স্ত্রী জীশান মীর্জা এবং দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা করে দুদক। মামলাগুলোতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়। তাঁর স্ত্রী জীশান মীর্জার বিরুদ্ধে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে।
বেনজীরের জামিন: দুদকও কিছু ‘জানে না’
দুবাইয়ে গ্রেপ্তার বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ কীসের ভিত্তিতে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নেই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে।
কমিশনের মহাপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী বলছেন, বেনজীরকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় দুদকের কোনো গাফিলতি ছিল বলে তারা মনে করেন না।
রোববার দুদকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে শিবলী বলেন, বেনজীরের মুক্তির বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বাইরে কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।

“আপনারা যেমন মিডিয়া, পত্রপত্রিকায় জানছেন, আমরাও জানছি। আইনি যে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সব সংশ্লিষ্ট বিভাগ নিশ্চয় নেবে।”
বেনজীরকে বাংলাদেশে ফেরাতে দুদকের সুপারিশ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেওয়া ব্যবস্থার পরও তিনি মুক্তি পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, সেই প্রশ্ন রাখা হয় দুদকের মহাপরিচালকের সামনে।
উত্তরে তিনি বলেন, “আমার মনে হয় না।”
দুদকের পক্ষ থেকে ‘প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ’ নেওয়া হয়েছে দাবি করে শিবলী বলেন, আন্তঃদেশীয় অনুসন্ধান ও আইনি সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দুদক মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট বা এমএলএআর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরে সেটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশে পাঠানো হয়।
“এখন আইনগত যে বিষয়গুলো আছে, নিশ্চয় সবাই মিলে আমরা খতিয়ে দেখব। আমাদের এখান থেকে যা যা পাঠানোর, যা যা করার, আমরা সবই করেছি, এটুকু বলতে পারি।”
কোন আইনি ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আদালত বেনজীরকে মুক্তি দিয়েছে–এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এটা আসলে বিস্তারিত না জেনে উত্তর দেওয়া ঠিক হবে না।”
বাংলাদেশের অনুরোধে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার বেনজীর সেখানে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বলে রোববার কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে খবর আসে।
সেখানে বলা হয়, গত ২৭ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি আদালত শর্তসাপেক্ষে বেনজীরের জামিন আবেদন মঞ্জুর করে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে ৩০ জুলাই তিনি কারামুক্ত হন।
জামিনের শর্ত হিসেবে বেনজীরের পাসপোর্ট আদালতের হেফাজতে থাকবে এবং আদালতের অনুমতি ছাড়া তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত ত্যাগ করতে পারবেন না।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকায় পুলিশ সদরদপ্তরের ইন্টারপোল শাখা ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো বা এনসিবিও জানায়, বেনজীরের মুক্তির বিষয়ে কোনো তথ্য তারা পায়নি।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেছেন, “জামিন আদেশের সত্যায়িত কপি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে এবং ওই আদেশ বাতিলের জন্য বাংলাদেশ সরকার দুবাইয়ে একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান (ল’ ফার্ম) নিয়োগ করেছে।”
অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে দুদকের তদন্তের মধ্যে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল বেনজীরের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করা হয়। সেই নোটিসের ভিত্তিতে দুবাই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ গত ১২ জুন ই-মেইলে বাংলাদেশ সরকারকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানায়।
এরপর ১৪ জুন সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফেডারেল আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাতে হবে।
দুদক তখন প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ ও অনুবাদ করে প্রত্যর্পণ প্রস্তাব তৈরি করে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এর প্রায় এক মাস পর বেনজীরকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ‘নীতিগত সম্মতি’র পাশাপাশি আরও কিছু তথ্য ও ব্যাখ্যা চেয়ে বাংলাদেশকে চিঠি দেয় দুবাই পুলিশ।
গত ২১ জুলাই দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, দুবাই পুলিশের চিঠির জবাব ও প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করা হচ্ছে। তিনি তখন বলেন, চাওয়া ব্যাখ্যার সঙ্গে বেনজীরের অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলার নথিসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠানো হবে। পাসপোর্টে জালিয়াতি এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন অভিযোগে বেনজীরের বিরুদ্ধে ছয়টি দুর্নীতির মামলা করেছে দুদক। এর মধ্যে একটি মামলার বিচার চলছে, বাকি মামলাগুলো তদন্তাধীন।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats