নোবেল জয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বে সম্ভবত প্রথম একমাত্র ব্যক্তি , যিনি ক্ষমতা ছাড়ার আগে নিজকে নিজে রাষ্ট্রের ‘অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (ভিভিআইপি)’ ঘোষণা করেছেন। এর আগে কোনো প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রধান উপদেষ্টার ক্ষেত্রে এমন নজির নেই। রাষ্ট্রের ব্যয় সংকোচন, অনিয়ম- দুর্নীতি দুর করতে এসে তিনি নিজেই এর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছেন। শুধু তাই নয়, এমন একটি নিজ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অনিয়মান্ত্রিক এবং রাষ্ট্রের জন্য অতি ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গোপনে নেয়া হয় এবং গেজেট ছাপার পরও গোপন রাখা হয়। অধ্যাপক ইউনূস যমুনা ছাড়ার পর তা সরকারের নজরে আনা হয়। প্রধান উপদেষ্টার করিৎকর্মা প্রেস সচিব শফিকুল আলম প্রতিদিন হেন কোনো বিষয় নেই, যা প্রেস কনফারেন্স করে জ্ঞানগর্ভ বর্ণনা দেননি। কিন্তু এ বিষয়টি তিনিও জাতির সামনে তুলে ধরেননি। বিষয়টি নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপদেষ্টারাও। অবশ্য ব্রিগেডিয়ার অব. সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি বলেছেন, ‘সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত আসতো বাহির থেকে’। গোপন এই সিদ্ধান্তের পেছনে মবের ভয় না অন্য গভীর কিছু রয়েছে তা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।
ভিভিআইপি (Very Important Person - VVIP) ঘোষিত ব্যক্তিকে রাষ্ট্র সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও প্রটোকল প্রদান করে। এর মধ্যে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (SSF) এর মাধ্যমে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী, বুলেটপ্রুফ গাড়ি, জরুরি চিকিৎসাসেবা, বিদেশ সফর, ব্যক্তিগত স্টাফ ও বাসস্থান ছাড়াও অন্যান্য বিশেষ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত। তার মানে তিনি আগামী এক বছর প্যারালাল ভাবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মতো সমান মর্যাদা ও সুবিধাদি ভোগ করবেন। রাষ্ট্রের তৃতীয় আরেকজন ‘অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’র জন্য প্রতিমাসে কি পরিমান অর্থ ব্যয় হবে তা সংশ্লিষ্টদের সহজেরই অনুমেয়। আর রাষ্ট্র কেন বছরজুড়ে অপ্রয়োজনে এই অর্থ ব্যয় করবে তা সচেতন নাগরিক হিসাবে যে কারো মনে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
ভিভিআইপি (VVIP) বা ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’হিসেবে ঘোষিত ব্যক্তির সুরক্ষায় রাষ্ট্রকে বিশেষ আইনি ও নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করতে হয়। বাংলাদেশে এই মর্যাদা মূলত রাষ্ট্রপ্রধান (রাষ্ট্রপতি), সরকার প্রধান (প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা) পেয়ে থাকেন। এছাড়া কোনো দেশের সরকার প্রধান কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান বা বিশেষ কোনো আমন্ত্রিত মেহমানকে সরকার সাময়িক সময়ের জন্য গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করে থাকে।
অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির প্রতি রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্বসমূহ:
# নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা: এসএসএফ দ্বারা সার্বক্ষণিক ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
# বিশেষ প্রটোকল ও নিরাপত্তা: রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, সফর ও চলাচলের সময় বিশেষ প্রটোকল এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাসভবন এবং কর্মস্থলে সার্বক্ষণিক কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকে। অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সবকিছুতেই দিতে হয় বিশেষ প্রটোকল।
# চিকিৎসা সহায়তা: ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা। জরুরি ও উচ্চমানের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার বিশেষ ব্যবস্থা থাকে।
# ভিভিআইপি মর্যাদা: রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর সমান বিশেষ মর্যাদা ও সুবিধা প্রদান।
# দেশ-বিদেশ ভ্রমণ: দেশের অভ্যন্তরে বা বিদেশে ভ্রমণের সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের সাথে সমন্বয় করে ব্যাপক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
# গোয়েন্দা তথ্য: নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে এমন যেকোনো তথ্য সংগ্রহ এবং বিনিময়ের দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর।
# বাসস্থান: বাসস্থান থেকে শুরু করে ইউটিলিটি, যাবতীয় রাষ্ট্র বহন করতে হয়।
শুধু সাবেক প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে নয়, একজন নোবেল জয়ী হিসাবে অধ্যাপক ইউনূস নিঃসন্দেহে একজন সম্মানিত ব্যক্তি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তার সঙ্গে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের বিরোধ চরমে হলেও নিরাপত্তা নিয়ে কখনও প্রশ্ন উঠেনি, আদালতে মব সৃষ্টি হয়নি। আর এখন তার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার ক্ষমতাসীন। শুধু তাই নয়, সরকার-বিরোধীদল সবই তার প্রতি অনুগত কিংবা ব্যাপক সখ্যতা রয়েছে। এই অবস্থায় তার এই গোপন উদ্যোগ কি আসেলেই নিরাপত্তার জন্য, নাকি ক্ষমতার স্বাদ ভুলতে না পারা? ১৮ মাস ক্ষমতাসীন থাকার পরও আরো ১২ মাস তিনি এসএসএফ প্রটোকলে দাপিয়ে বেড়াতে চান? এ নিয়েও চললে নানা মহলে আলোচনা। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহম্মেদ, বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমান, বিচারপতি লতিফুর রহমান ও ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ এমন কোনো সুযোগ সুবিধা নেননি কিংবা দাবিও করেননি।
জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের মানুষ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে দেশের দায়িত্ব তার হাতে তুলে দিয়েছিলো। তার সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে রয়েছে নানা হিসাব-নিকেশ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশের স্বার্থ বিরোধী বিতর্কিত চুক্তি, দেশজুড়ে মব জাস্টিস, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, ন্যায় বিচারে অসমতা, বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অতি সখ্যতা, ছাত্রদের দিয়ে রাজনৈতিক দল ও প্রেসার গ্রুপ তৈরী, নিজের ব্যক্তিগত ও প্রতিষ্ঠানের জন্য নানা সুবিধা গ্রহণ, অধিকাংশ অযোগ্যদের দিয়ে এনজিও টাইপ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন, বিদেশীদের এনে সংবিধান সংস্কারসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব প্রদান, জুলাই সনদে প্রধান রাজনৈতিক দলের মতামতকে মুছে ফেলা, পুলিশ হত্যাসহ থানার অস্ত্র ও ঘরবাড়ি লুটপাট ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসকারীদের (গণঅভ্যূত্থান ব্যতিত) দায়মুক্তি, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন থেকে দুরে রাখা, সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করা, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বিকৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের সকল স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্ঠাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তার রাষ্ট্রপরিচালনায় দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে হাজারো বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু বিদায়বেলা গোপনে এমন বছরব্যাপি ব্যয়বহুল সুবিধা নেয়ায় সামাজিক মাধ্যমে এর তীব্র সমালোচনা চলছে। এখন দেখার বিষয়, অধ্যাপক ইউনূসের এমন স্বীয়স্বার্থে সিদ্ধান্তে সরকার কি পদক্ষেপ নেয়।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats